প্রেক্ষাপট
সম্প্রতি, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশ একটি যুগান্তকারী পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (Agreement on Reciprocal Trade) চূড়ান্ত করেছে। এই চুক্তিটি ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য কাঠামোর আদলেই করা হয়েছে। এটি দক্ষিণ এশিয়ায় ওয়াশিংটনের বাণিজ্য নীতিতে একটি বড় পরিবর্তন নির্দেশ করে, যা বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতামূলক শুল্ক সুবিধা (Tariff Advantages) প্রদানের মাধ্যমে ভারতের রপ্তানি বাজারের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তি (২০২৬)-এর প্রধান দিকগুলো
১. শুল্ক কাঠামো এবং পারস্পরিক হার
- সাধারণ হ্রাস: যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্ক কমিয়ে ১৯% করেছে (যা আগে ছিল ২০% এবং মূল হার ছিল ৩৭%)।
- ভারতের সাথে তুলনা: ভারত সাম্প্রতিক চুক্তিতে ১৮% সাধারণ শুল্ক হার পেলেও, বাংলাদেশের এই চুক্তিতে এমন কিছু বিশেষ সুবিধা বা “কার্ভ-আউটস” রয়েছে যা নির্দিষ্ট কিছু খাতে বাংলাদেশকে আরও বেশি সুবিধা দিতে পারে।
২. তৈরি পোশাকের জন্য “শূন্য-শুল্ক” ধারা
- কাঁচামাল ভিত্তিক সুবিধা: বাংলাদেশ যদি যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তুলা বা কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে তৈরি পোশাক (RMG) প্রস্তুত করে, তবে নির্দিষ্ট পরিমাণ পোশাকের জন্য যুক্তরাষ্ট্র শুল্কমুক্ত সুবিধা (Zero-duty access) প্রদান করবে।
- কৌশলগত পরিবর্তন: এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে তাদের কাঁচামাল আমদানির উৎস ভারত (যা ঐতিহ্যগতভাবে সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী) থেকে সরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে নিয়ে আসা।
৩. মার্কিন পণ্যের জন্য বাজার সুবিধা
- কৃষি খাতের অঙ্গীকার: বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের কৃষি পণ্য ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার মধ্যে গম, সয়া, ভুট্টা এবং বিশেষ করে তুলা অন্তর্ভুক্ত।
- জ্বালানি নিরাপত্তা: এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ আগামী ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের জ্বালানি পণ্য সংগ্রহ করবে।
- শিল্পজাত পণ্য: বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের রাসায়নিক, চিকিৎসা সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি এবং অটোমোবাইলের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা প্রদান করবে এবং মার্কিন এফডিএ (US FDA) মানদণ্ড ও মোটরযানের নিরাপত্তা নির্গমন মানকে স্বীকৃতি দেবে।
৪. নিয়ন্ত্রণমূলক এবং শ্রম সংস্কার
- শ্রমিক অধিকার: বাংলাদেশ শ্রম আইন আধুনিকীকরণ, সংগঠনের স্বাধীনতা বৃদ্ধি এবং জোরপূর্বক শ্রম নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে একটি ১১-দফার এজেন্ডা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে। এর উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যতে আবার জিএসপি (GSP) সুবিধা ফিরে পাওয়া।
- ডিজিটাল বাণিজ্য: এই চুক্তিটি আন্তঃসীমান্ত তথ্য বা ডেটা আদান-প্রদান নিশ্চিত করে এবং ইলেকট্রনিক লেনদেনের ওপর শুল্ক না বসানোর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে।
৫. ভারতের ওপর প্রভাব
- পোশাক খাতে প্রতিযোগিতা: ভারতের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা একটি “কাঠামোগত অসুবিধার” সম্মুখীন হতে পারেন, কারণ মার্কিন বাজারে ভারত ও বাংলাদেশের পণ্যের মধ্যে শুল্ক ব্যবধান এখন প্রায় নেই বললেই চলে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে।
- তুলা রপ্তানি: ২০২৪ সালে ভারত বাংলাদেশে প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ডলারের সুতা রপ্তানি করেছিল। বাংলাদেশ এখন শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের তুলার দিকে ঝুঁকে পড়ায় ভারতের তুলার চাহিদা কমে যেতে পারে।
- ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য: এই চুক্তিটি ভারত, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রচেষ্টাকে তুলে ধরে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে।
Q: যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (২০২৬) প্রসঙ্গে নিচের বিবৃতিগুলো বিবেচনা করুন:
1. এই চুক্তিটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সমস্ত টেক্সটাইল রপ্তানির জন্য সর্বজনীন শূন্য-শুল্ক সুবিধা প্রদান করে।
2. বাংলাদেশ ১৫ বছর মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের জ্বালানি পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
3. চুক্তির অধীনে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে বাংলাদেশি উৎপাদকদের অবশ্যই মার্কিন বংশোদ্ভূত কাঁচামাল যেমন তুলা ব্যবহার করতে হবে।
উপরের বিবৃতিগুলোর মধ্যে কোনটি সঠিক?
A) শুধুমাত্র 1 এবং 2
B) শুধুমাত্র 2 এবং 3
C) শুধুমাত্র 1 এবং 3
D) 1, 2 এবং 3
সমাধান: B
• বিবৃতি 1 ভুল: শূন্য-শুল্ক সুবিধাটি সবার জন্য বা সব পণ্যের জন্য নয়; এটি একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের (কোটা) জন্য এবং এতে মার্কিন কাঁচামাল ব্যবহারের শর্ত রয়েছে।
• বিবৃতি 2 সঠিক: চুক্তিতে স্পষ্টভাবে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি সংগ্রহের প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
• বিবৃতি 3 সঠিক: এই চুক্তিতে এমন একটি "পারস্পরিক" প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে যেখানে পোশাকের শুল্কমুক্ত সুবিধা সরাসরি উৎপাদনের সময় ব্যবহৃত মার্কিন কাঁচামালের (তুলা/তন্তু) পরিমাণের সাথে যুক্ত।