প্রেক্ষাপট
সম্প্রতি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মালয়েশিয়ায় দুই দিনের (৭-৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) একটি উচ্চ-পর্যায়ের রাষ্ট্রীয় সফর শেষ করেছেন, যা ছিল এ বছরের তাঁর প্রথম বিদেশ সফর। এই সফর চলাকালীন, ভারত ও মালয়েশিয়া তাদের Comprehensive Strategic Partnership (CSP) বা ‘বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ (যা ২০২৪ সালের আগস্টে উন্নীত করা হয়েছিল) পুনর্নিশ্চিত করেছে। সেমিকন্ডাক্টর, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত ১১টি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই সফরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল দুই দেশের মধ্যে নিজস্ব মুদ্রায় (ভারতীয় রুপি এবং মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত) বাণিজ্য পরিচালনার সিদ্ধান্ত এবং সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ ব্যবস্থার সুরক্ষায় একটি কাঠামো তৈরি করা।
১. রাজনৈতিক ও কৌশলগত কাঠামো
- বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারিত্ব (CSP): ২০২৪ সালে এটিকে “বর্ধিত কৌশলগত অংশীদারিত্ব” থেকে উন্নীত করা হয়, যার মূল লক্ষ্য উচ্চ-প্রযুক্তি খাত এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা।
- আসিয়ান (ASEAN)-এর কেন্দ্রীয়তা: মালয়েশিয়া আসিয়ানের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং ২০২৫ সালে তারা আসিয়ান সভাপতিত্ব করবে। ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি’ (Act East Policy)-র জন্য মালয়েশিয়া একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
- বৈশ্বিক মঞ্চ: উভয় দেশ জাতিসংঘ (UN), পূর্ব এশিয়া সম্মেলন (EAS) এবং ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনে (IORA) একে অপরকে সহযোগিতা করে। উল্লেখযোগ্যভাবে, মালয়েশিয়া সংস্কারকৃত নিরাপত্তা পরিষদে (UNSC) ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ লাভের দাবিকে সমর্থন জানিয়েছে।
২. অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক
- বাণিজ্যের পরিমাণ: আসিয়ান দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়া ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। ২০২৪-২৫ সালে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৯.৮৬ বিলিয়ন ডলার।
- বাণিজ্য চুক্তি: দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক MICECA এবং AITIGA চুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বাণিজ্যের ঘাটতি কমাতে বর্তমানে AITIGA চুক্তিটি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
- নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন: মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে উভয় দেশ ভারতীয় রুপি (INR) এবং রিঙ্গিত (Ringgit)-এ বাণিজ্য পরিচালনার ব্যবস্থা চালু করেছে।
- পাম অয়েল: ভারত বিশ্বের বৃহত্তম ভোজ্য তেল আমদানিকারক দেশ এবং ইন্দোনেশিয়ার পাশাপাশি মালয়েশিয়া হলো ভারতের পাম অয়েল আমদানির প্রধান উৎস।
৩. প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সহযোগিতা
- সেমিকন্ডাক্টর: মালয়েশিয়া বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানিকারক। নতুন সমঝোতা স্মারকটি (MoU) গবেষণা, উন্নয়ন এবং অ্যাসেম্বলিংয়ের ওপর জোর দিয়েছে, যেখানে টাটা ইলেকট্রনিক্স-এর মতো বড় ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে।
- ডিজিটাল পেমেন্ট: স্বল্প খরচে আন্তঃদেশীয় টাকা লেনদেনের সুবিধার্থে ভারতের UPI এবং মালয়েশিয়ার PayNet-কে যুক্ত করার বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
- জ্বালানি: পেট্রোনাস (PETRONAS) এবং জেনটারি (Gentari)-এর মতো কোম্পানিগুলো গ্রিন হাইড্রোজেন এবং গ্রিন অ্যামোনিয়া তৈরির ক্ষেত্রে যৌথভাবে কাজ করছে।
৪. প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা
- সামরিক মহড়া:
- হরিমৌ শক্তি (Harimau Shakti): এটি একটি দ্বিপাক্ষিক যৌথ থলবাহিনী মহড়া (৫ম সংস্করণ ডিসেম্বর ২০২৫-এ রাজস্থানে অনুষ্ঠিত হয়েছে)।
- সমুদ্র লক্ষ্মণ (Samudra Laksamana): এটি একটি দ্বিপাক্ষিক নৌবাহিনী মহড়া।
- কৌশলগত মঞ্চ: উভয় দেশ ADMM-Plus-এর মাধ্যমে এবং ২০২৪-২০২৭ মেয়াদের জন্য ‘সন্ত্রাসবাদ দমন ওয়ার্কিং গ্রুপ’-এর সহ-সভাপতি হিসেবে কাজ করছে।
- প্রতিরক্ষা শিল্প: মালয়েশিয়ার Su-30 যুদ্ধবিমান বহরের রক্ষণাবেক্ষণ ও আয়ু বাড়ানোর জন্য ভারত সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে।
৫. সাংস্কৃতিক এবং প্রবাসী সম্পর্ক
- জীবন্ত সেতুবন্ধন: মালয়েশিয়ায় বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভারতীয় প্রবাসী (প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ, যাদের অধিকাংশই তামিল বংশোদ্ভূত) বসবাস করেন।
- প্রাতিষ্ঠানিক যোগসূত্র: মালায়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘তিরুভল্লুভার চেয়ার‘ স্থাপন এবং সাবাহ-তে (Sabah) একটি নতুন ভারতীয় কনস্যুলেট জেনারেল খোলার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
৬. মালয়েশিয়া: মানচিত্রের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট
- এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, বিষুবরেখার কাছে অবস্থিত।
- এটি দুটি অংশে বিভক্ত: পেনিনসুলার (উপদ্বীপ) মালয়েশিয়া এবং পূর্ব মালয়েশিয়া (বোর্নিও দ্বীপে), যা দক্ষিণ চীন সাগর দ্বারা বিচ্ছিন্ন।
- এর পশ্চিমে মালাক্কা প্রণালী অবস্থিত, যা বিশ্বের একটি অন্যতম প্রধান সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ।
- প্রতিবেশী দেশসমূহ:
- থাইল্যান্ড (উত্তরে, স্থলপথ)
- সিঙ্গাপুর (দক্ষিণে, প্রণালীর ওপারে)
- ইন্দোনেশিয়া (সামুদ্রিক এবং বোর্নিওতে স্থল সীমান্ত)
- ব্রুনাই (বোর্নিওতে মালয়েশিয়া দ্বারা বেষ্টিত)
- ফিলিপাইন (উত্তর-পূর্বে, সামুদ্রিক)
- আশেপাশের সাগর: দক্ষিণ চীন সাগর, সুলু সাগর এবং সেলেবেস সাগর।
- সর্বোচ্চ শৃঙ্গ: মাউন্ট কিনাবালু।
রাজধানী: কুয়ালালামপুর। প্রশাসনিক রাজধানী: পুত্রজায়া।
প্রশ্ন: ভারত-মালয়েশিয়া দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রেক্ষিতে নিচের বিবৃতিগুলো বিবেচনা করুন:
1. মালয়েশিয়া বর্তমানে আসিয়ানের সমস্ত সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার।
2. দুই দেশ তাদের নিজস্ব মুদ্রায় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য পরিচালনার জন্য একটি কাঠামো তৈরি করতে সম্মত হয়েছে।
3. ‘হরিমৌ শক্তি মহড়া’ (Exercise Harimau Shakti) হলো দুই দেশের মধ্যে প্রতি বছর পরিচালিত একটি দ্বিপাক্ষিক নৌ মহড়া।
ওপরের বিবৃতিগুলোর মধ্যে কোনটি/কোনগুলো সঠিক?
a) কেবল 1 এবং 2
b) কেবল 2
c) কেবল 2 এবং 3
d) 1, 2 এবং 3
সমাধান: খ
ব্যাখ্যা:
• বিবৃতি 1 ভুল: আসিয়ানে মালয়েশিয়া ভারতের ৩য় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার; সিঙ্গাপুর এবং ইন্দোনেশিয়া সাধারণত বাণিজ্যের পরিমাণে শীর্ষে থাকে।
• বিবৃতি 2 সঠিক: ২০২৪-২০২৬ সালে উভয় দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় রুপি এবং মালয়েশিয়ান রিঙ্গিতে বাণিজ্য পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
• বিবৃতি 3 ভুল: ‘হরিমৌ শক্তি মহড়া’ একটি দ্বিপাক্ষিক সেনাবাহিনী বা থলবাহিনী মহড়া, নৌ মহড়া নয়। নৌ মহড়াটির নাম হলো ‘সমুদ্র লক্ষ্মণ’।