প্রেক্ষাপট
সম্প্রতি কিম্বার্লে প্রসেস (KP) পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে (Plenary) নির্বাচনের মাধ্যমে ২০২৬ সালের জন্য ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে কিম্বার্লে প্রসেসের সভাপতিত্ব গ্রহণ করেছে। এটি নিয়ে তৃতীয়বারের মতো ভারতকে এই বিশ্বব্যাপী উদ্যোগের নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হলো (এর আগে ২০০৮ এবং ২০১৯ সালে ভারত এই দায়িত্ব পালন করেছিল)।
কিম্বার্লে প্রসেস (KP) সম্পর্কে
কিম্বার্লে প্রসেস হলো একটি বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থা যা মূলধারার অপরিশোধিত হীরার বাজারে “সংঘাত হীরা” (Conflict Diamonds) বা রক্ত হীরা প্রবেশ রোধ করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
১. সংঘাত হীরা (Conflict Diamonds) সম্পর্কে ধারণা
- সংজ্ঞা: সংঘাত হীরা, যা “ব্লাড ডায়মন্ড” বা রক্ত হীরা নামেও পরিচিত, হলো এমন অপরিশোধিত হীরা যা বিদ্রোহী গোষ্ঠী বা তাদের সহযোগীরা বৈধ সরকারকে উৎখাত করার উদ্দেশ্যে সশস্ত্র সংঘাতের অর্থায়নে ব্যবহার করে।
- রাষ্ট্রসংঘের যোগসূত্র: এই সংজ্ঞাটি কঠোরভাবে রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের (UNSC) প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
- ব্যাপ্তির সীমাবদ্ধতা: বর্তমানে কিম্বার্লে প্রসেসের আওতা শুধুমাত্র সেই হীরাগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ যা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলি সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে; এটি রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘন বা পরিবেশগত ক্ষতির সাথে যুক্ত হীরাকে আনুষ্ঠানিকভাবে কভার করে না (যা বর্তমানে একটি আন্তর্জাতিক বিতর্কের বিষয়)।
২. কিম্বার্লে প্রসেস সার্টিফিকেশন স্কিম (KPCS)
- শুরু: এটি দক্ষিণ আফ্রিকায় কিম্বার্লে প্রসেস মিটিং এবং “ইন্টারলাকেন ঘোষণা”-র পর ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
- মূল উদ্দেশ্য: এটি কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা নয়, বরং একটি স্বেচ্ছামূলক শংসাপত্র ব্যবস্থা যা অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর জাতীয় আইনের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়।
- মূল প্রয়োজনীয়তা:
- ছেঁড়াবেড়া করা যায় না এমন কন্টেইনার: অপরিশোধিত হীরার প্রতিটি চালান অবশ্যই এমন কন্টেইনারে পরিবহন করতে হবে যা খোলা বা পরিবর্তন করা যায় না (Tamper-proof)।
- বৈধ শংসাপত্র: প্রতিটি চালানের সাথে সরকার কর্তৃক যাচাইকৃত একটি কিম্বার্লে প্রসেস সার্টিফিকেট থাকতে হবে।
- সীমাবদ্ধ বাণিজ্য: অংশগ্রহণকারী দেশগুলো শুধুমাত্র কিম্বার্লে প্রসেসের অন্যান্য সদস্যদের সাথেই অপরিশোধিত হীরা বাণিজ্য করতে পারে।
৩. ত্রিপক্ষীয় কাঠামো
কিম্বার্লে প্রসেস অনন্য কারণ এটি একটি ত্রিপক্ষীয় জোট হিসেবে কাজ করে যার মধ্যে রয়েছে:
- সরকারসমূহ: বর্তমানে ৬০ জন অংশগ্রহণকারী রয়েছে (যা ৮৬টি দেশের প্রতিনিধিত্ব করে, কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি অংশগ্রহণকারী হিসেবে গণ্য হয়)।
- হীরা শিল্প: যার প্রতিনিধিত্ব করে ওয়ার্ল্ড ডায়মন্ড কাউন্সিল (WDC)।
- সুশীল সমাজ: বিভিন্ন এনজিও (NGO) যেমন ‘কিম্বার্লে প্রসেস সিভিল সোসাইটি কোয়ালিশন’ এর প্রতিনিধিত্ব করে।
৪. পরিচালনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ
- সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত (Consensus-Based): কিম্বার্লে প্রসেসের সমস্ত সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়া হয়, যার অর্থ হলো যে কোনো একজন অংশগ্রহণকারী সদস্য চাইলে যে কোনো প্রস্তাবে ভেটো দিতে পারেন (বাতিল করতে পারেন)। এর ফলে বড় উৎপাদকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে প্রায়ই অচলাবস্থা তৈরি হয়।
- আবর্তনশীল সভাপতি: সভাপতির পদটি প্রতি বছর আবর্তিত হয়; সাধারণত বর্তমান বছরের সহ-সভাপতি পরবর্তী বছর সভাপতি হন।
৫. কিম্বার্লে প্রসেস এবং ভারত
- প্রতিষ্ঠাতা সদস্য: ভারত কিম্বার্লে প্রসেস সার্টিফিকেশন স্কিমের (KPCS) একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।
- নোডাল সংস্থা: বাণিজ্য বিভাগ (Department of Commerce) হলো প্রধান বিভাগ এবং জেম অ্যান্ড জুয়েলারি এক্সপোর্ট প্রমোশন কাউন্সিল (GJEPC) হলো শংসাপত্র প্রদানের জন্য মনোনীত কর্তৃপক্ষ।
- কৌশলগত গুরুত্ব: ভারত বিশ্বের প্রায় ৯০% অপরিশোধিত হীরা প্রক্রিয়াজাতকরণ (কাটিং এবং পলিশিং) করে, যা প্রধানত সুরাট এবং মুম্বাইয়ে হয়।
- ২০২৬ সালের সভাপতির লক্ষ্য: ভারত ডিজিটাল ট্র্যাকিং (ব্লকচেইন), নিয়মকানুন পালন জোরদার করা এবং আফ্রিকার হীরা উৎপাদনকারী দেশগুলোর (গ্লোবাল সাউথ) স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্ব দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
প্রশ্ন:
কিম্বার্লে প্রসেস (KP) এর প্রসঙ্গে নিচের বিবৃতিগুলো বিবেচনা করুন:
1. এটি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) অধীনে স্বাক্ষরিত একটি আইনত বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক চুক্তি।
2. কিম্বার্লে প্রসেসের সিদ্ধান্তগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের পরিবর্তে সর্বসম্মত পদ্ধতির মাধ্যমে নেওয়া হয়।
3. কিম্বার্লে প্রসেসের বর্তমান আওতায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য সরকার কর্তৃক ব্যবহৃত হরাগুলো অন্তর্ভুক্ত নয়।
4. ভারত হলো কিম্বার্লে প্রসেস সার্টিফিকেশন স্কিমের স্থায়ী সচিবালয় (Permanent Secretariat) আয়োজক দেশ।
উপরের কয়টি বিবৃতি সঠিক?
a) মাত্র একটি
b) মাত্র দুটি
c) মাত্র তিনটি
d) চারটিই সঠিক
সঠিক উত্তর: খ (মাত্র দুটি)
ব্যাখ্যা:
• বিবৃতি 1 ভুল: এটি কোনো আইনত বাধ্যতামূলক চুক্তি নয়; এটি একটি স্বেচ্ছামূলক শংসাপত্র ব্যবস্থা যা অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর নিজস্ব আইনের মাধ্যমে চলে। এটি WTO নয়, বরং রাষ্ট্রসংঘের প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
• বিবৃতি 2 সঠিক: সিদ্ধান্তগুলো প্রকৃতপক্ষে সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়া হয়, যা একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য তবে এর ফলে কাজে দেরি হতে পারে।
• বিবৃতি 3 সঠিক: কিম্বার্লে প্রসেসে "সংঘাত হীরা"-র সংজ্ঞা খুব সংকীর্ণ; এটি বিশেষভাবে বিদ্রোহী গোষ্ঠী কর্তৃক বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হীরাকে বোঝায়। এটি বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালিত মানবাধিকার লঙ্ঘনকে অন্তর্ভুক্ত করে না।
• বিবৃতি 4 ভুল: ভারতে কিম্বার্লে প্রসেসের কোনো স্থায়ী সচিবালয় নেই। ২০২২ সালে সদস্যরা বতসোয়ানার গ্যাবোরোনে (Gaborone) একটি স্থায়ী সচিবালয় স্থাপনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন।