নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ

প্রেক্ষাপট

সম্প্রতি ১৯ শতকের অযোধ্যার নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ নতুন করে আলোচনায় এসেছেন। তাঁর প্রপৌত্রের লেখা একটি নতুন জীবনী প্রকাশিত হয়েছে, যা দীর্ঘদিনের প্রচলিত ইতিহাসকে চ্যালেঞ্জ করে। প্রচলিত ইতিহাসে বলা হয় যে ব্রিটিশরা তাঁকে জোরপূর্বক কলকাতায় “নির্বাসিত” করেছিল। তবে এই বইটিতে দাবি করা হয়েছে যে, নবাব নিজের ইচ্ছায় কলকাতায় এসেছিলেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল লণ্ডনে গিয়ে রানী ভিক্টোরিয়ার কাছে তাঁর রাজ্য দখলের বিরুদ্ধে আবেদন জানানো, কিন্তু ব্রিটিশরা শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেয়।

নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য

১. অযোধ্যার দশম এবং শেষ নবাব

  • ওয়াজিদ আলী শাহ ১৮৪৭ সালে সিংহাসনে আরোহণ করেন। সেই সময় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (EIC) অযোধ্যাকে একটি বাফার স্টেট (দুই শক্তিশালী রাজ্যের মধ্যবর্তী রাষ্ট্র) হিসেবে ব্যবহার করত।
  • ব্রিটিশরা তাঁর বিরুদ্ধে “অশাসন বা অব্যবস্থাপনার” অভিযোগ আনলেও, ঐতিহাসিক নথিপত্র অনুযায়ী তিনি হিন্দু ও মুসলিম উভয় আইনের ভিত্তিতে সামরিক ও বিচার ব্যবস্থায় সংস্কার এনেছিলেন।

২. অযোধ্যা দখল (১৮৫৬)

  • অজুহাত: ১৮৫৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি লর্ড ডালহৌসি “স্বত্ববিলোপ নীতি” (Doctrine of Lapse) প্রয়োগ না করে বরং “অশাসন” বা কুশাসনের অজুহাতে অযোধ্যা দখল করেন (কারণ নবাবের নিজস্ব উত্তরাধিকারী ছিল)।
  • যৌক্তিকতা: এই সিদ্ধান্তটি মূলত ব্রিটিশ রেসিডেন্ট কর্নেল স্লিম্যান এবং পরবর্তীতে জেমস উট্রামের একটি পক্ষপাতদুষ্ট রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়েছিল।
  • প্রভাব: অযোধ্যা দখল ছিল ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের অন্যতম প্রধান কারণ, কারণ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধিকাংশ সিপাহী ছিল এই অযোধ্যা অঞ্চলের।

৩. শিল্প ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক

উত্তর ভারতীয় শিল্পকলার পুনর্জাগরণ এবং পরিমার্জনে ওয়াজিদ আলী শাহের অসামান্য অবদান রয়েছে:

  • কথক: তিনি ঠাকুর প্রসাদ এবং দুর্গা প্রসাদের শিষ্য ছিলেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় কথক নাচের লখনউ ঘরানার উদ্ভব হয়, যার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো নজাকত (আভিজাত্য/নমনীয়তা) এবং অভিনয়
  • ঠুমরি: তাঁকে শাস্ত্রীয় সংগীতের হালকা ধরন ঠুমরির পথপ্রদর্শক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি ‘আখতারপিয়া’ ছদ্মনামে অসংখ্য গান রচনা করেছিলেন।
  • থিয়েটার: তিনি সংগীত ও নৃত্যের স্কুল ‘পরীখানা’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং ‘রহস’ (রাসলীলা দ্বারা অনুপ্রাণিত) নামক নৃত্যনাট্যের আয়োজন করতেন।

৪. কলকাতায় উত্তরাধিকার (মেটিয়াব্রুজ)

রাজ্য হারানোর পর তিনি কলকাতার মেটিয়াব্রুজে চলে আসেন। সেখানে তিনি লখনউয়ের সংস্কৃতিকে নতুন করে গড়ে তোলেন:

  • খাবার: বিরিয়ানিতে আলু যোগ করার বিষয়টি মেটিয়াব্রুজে তাঁর দরবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে হয়েছিল বলে মনে করা হয়।
  • শখ: তিনি বাংলায় ঘুড়ি ওড়ানো এবং বিরল পশু-পাখির সংগ্রহশালা (চিড়িয়াখানা) জনপ্রিয় করেছিলেন।

৫. উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম

তিনি উর্দু, ফার্সি এবং ব্রজ ভাষায় একজন দক্ষ লেখক ছিলেন।

  • বানি (Bani): সংগীত ও নৃত্যের ওপর একটি বিস্তারিত গবেষণা গ্রন্থ।
  • হুজন-ই-আখতার (Huzn-i-Akhtar): রাজ্য হারানোর পর তাঁর মানসিক কষ্টের বিবরণ সংবলিত একটি আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ।
  • সাওয়াত-উল-কালুব (Sawat-ul-Qalub): ৪৪,০০০-এর বেশি শ্লোক বা দ্বিপদীর একটি বিশাল সংগ্রহ।
Q: নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ এবং অযোধ্যা দখল প্রসঙ্গে নিচের বিবৃতিগুলো বিবেচনা করুন: 

1. নবাবের কোনো স্বাভাবিক উত্তরাধিকারী না থাকায় লর্ড ডালহৌসি "স্বত্ববিলোপ নীতি" বা "ডকট্রিন অফ ল্যাপস"-এর অধীনে অযোধ্যা দখল করেন।

2. নবাব 'আখতারপিয়া' ছদ্মনামে বেশ কিছু ঠুমরি এবং সংগীত বিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।

3. কথক নাচের লখনউ ঘরানা তাঁর সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা এবং শৈল্পিক নির্দেশনায় উৎকর্ষের শিখরে পৌঁছেছিল।

উপরের বিবৃতিগুলোর মধ্যে কোনটি/কোনগুলো সঠিক?

A) শুধুমাত্র 1 এবং 2
B) শুধুমাত্র 2 এবং 3
C) শুধুমাত্র 3
D) 1, 2 এবং 3

সঠিক উত্তর: B

ব্যাখ্যা:

• বিবৃতি 1 ভুল: অযোধ্যা দখল করা হয়েছিল অশাসনের (কুশাসন) ভিত্তিতে, স্বত্ববিলোপ নীতির ভিত্তিতে নয়। কারণ ওয়াজিদ আলী শাহের একাধিক উত্তরাধিকারী (যেমন বিরজিস কদর) ছিল।
• বিবৃতি 2 সঠিক: নবাব একজন প্রতিভাধর সংগীতজ্ঞ ছিলেন এবং সংগীত রচনার জন্য 'আখতারপিয়া' ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন।
• বিবৃতি 3 সঠিক: তিনি কথক নাচের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ পৃষ্ঠপোষক ছিলেন; তিনি ঠাকুর ও দুর্গা প্রসাদ গুরুর কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং লখনউ ঘরানাকে জনপ্রিয় করেন।

Practice Today’s MCQs