এই নিবন্ধটি পড়ার পর আপনি এই UPSC PYQ-এর উত্তর দিতে পারবেন:
ভারতের ১৪তম অর্থ কমিশনের সুপারিশগুলো রাজ্যগুলোকে তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতিতে কীভাবে সাহায্য করেছে? (১৫০ শব্দ, GS-2, রাষ্ট্রব্যবস্থা)
প্রেক্ষিত
১৬তম অর্থ কমিশন (FC) ১৭ নভেম্বর, ২০২৫ তারিখে রাষ্ট্রপতির কাছে তাদের রিপোর্ট পেশ করেছে। এটি ২০২৬–৩১ সময়কালের জন্য ভারতের আর্থিক ফেডারেলিজম বা আর্থিক যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
অর্থ কমিশন (FC) সম্পর্কে কিছু তথ্য
অর্থ কমিশন হলো একটি সাংবিধানিক সংস্থা, যা ভারতের কেন্দ্র ও রাজ্যগুলোর মধ্যে আর্থিক ভারসাম্যের চাকা হিসেবে কাজ করে।
- ধারা ২৮০: সংবিধানের ২৮০ নম্বর ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রতি ৫ বছর অন্তর একটি অর্থ কমিশন গঠন করেন।
- গঠন:চেয়ারম্যান: ড. অরবিন্দ পানাগাড়িয়া।
- পূর্ণকালীন সদস্য: শ্রী অজয় নারায়ণ ঝা, শ্রীমতী অ্যানি জর্জ ম্যাথিউ এবং ড. মনোজ পান্ডা।
- অস্থায়ী সদস্য: ড. সৌম্য কান্তি ঘোষ।
- প্রধান কাজসমূহ:
- উচ্চ হারে রাজস্ব বণ্টন (Vertical Devolution): কেন্দ্রের সংগৃহীত করের অংশ কেন্দ্র ও রাজ্যগুলোর মধ্যে ভাগ করা।
- আনুভূমিক বিভাজন (Horizontal Devolution): রাজ্যগুলোর নিজেদের মধ্যে ওই করের অংশ বরাদ্দ করা।
- সহায়ক অনুদান (Grants-in-aid): ভারতের সঞ্চিত তহবিল (ধারা ২৭৫) থেকে রাজ্যগুলোকে অনুদান দেওয়ার নীতি নির্ধারণ।
- স্থানীয় সংস্থা: পঞ্চায়েত ও পুরসভাগুলোর জন্য রাজ্যের সঞ্চিত তহবিল বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা।
১৬তম অর্থ কমিশনের মূল সুপারিশসমূহ (২০২৬–৩১)
১. উচ্চ হারে রাজস্ব বণ্টন (কেন্দ্র থেকে রাজ্য)
দক্ষিণের রাজ্যগুলোর পক্ষ থেকে করের অংশ ৪৫–৫০% করার জোরালো দাবি থাকা সত্ত্বেও, ১৬তম অর্থ কমিশন বর্তমানে যা আছে তা-ই বজায় রেখেছে।
- ৪১% অংশ বহাল: কেন্দ্রীয় করের নিট আয়ের মধ্যে রাজ্যগুলোর অংশ ৪১% রাখা হয়েছে।
- ‘সেস‘ (Cess) নিয়ে উদ্বেগ: কমিশন লক্ষ্য করেছে যে, কেন্দ্রের সেস এবং সারচার্জের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে রাজ্যগুলোর প্রাপ্য করের ভাণ্ডার ছোট হয়ে যাচ্ছে (কারণ সেস রাজ্যগুলোর সাথে ভাগ করা হয় না)।
২. আনুভূমিক বিভাজন (রাজ্যগুলোর মধ্যে বরাদ্দ)
রাজ্যগুলোর মধ্যে ৪১% অর্থ ভাগ করার সূত্রটি অর্থনৈতিক উৎপাদন এবং পরিবেশ সংরক্ষণের ওপর ভিত্তি করে নতুনভাবে সাজানো হয়েছে।
| মাপকাঠি (Criterion) | ওজন (Weight %) | গুরুত্ব (Significance) |
| আয়ের দূরত্ব (Income Distance) | ৪২.৫% | কম আয়ের রাজ্যগুলোর জন্য সমতা নিশ্চিত করা। |
| জনসংখ্যা (২০১১) | ১৭.৫% | পরিষেবা প্রদানের প্রয়োজনীয়তার প্রতিফলন। |
| জনসংখ্যাগত কর্মদক্ষতা | ১০.০% | ১৯৭১–২০১১ সালের মধ্যে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ পরিমাপ করা। |
| আয়তন | ১০.০% | ভৌগোলিকভাবে বড় বা দুর্গম রাজ্যে পরিষেবা দেওয়ার খরচ বিবেচনা করা। |
| বন ও পরিবেশ | ১০.০% | পরিবেশ রক্ষার জন্য এখন “মুক্ত বন” (Open Forests) এলাকাকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। |
| জিডিপিতে অবদান | ১০.০% | নতুন মাপকাঠি। এটি “কর প্রচেষ্টা” মাপকাঠির পরিবর্তে আনা হয়েছে। যে রাজ্যগুলো জাতীয় অর্থনীতিতে বেশি অবদান রাখছে, তাদের পুরস্কৃত করা। |
দ্রষ্টব্য: ১৫তম অর্থ কমিশনের “কর ও আর্থিক প্রচেষ্টা” মাপকাঠিটি এখন জিডিপিতে অবদান মাপকাঠির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
৩. সহায়ক অনুদান (মোট ৯.৪৭ লক্ষ কোটি টাকা)
১৬তম অর্থ কমিশনের একটি বড় পরিবর্তন হলো রাজস্ব ঘাটতি অনুদান (Revenue Deficit Grants), নির্দিষ্ট ক্ষেত্র-ভিত্তিক অনুদান এবং নির্দিষ্ট রাজ্য-ভিত্তিক অনুদানগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন অর্থ মূলত দুটি স্তম্ভে দেওয়া হবে:
ক. স্থানীয় সংস্থার অনুদান (৭.৯১ লক্ষ কোটি টাকা)
- গ্রাম ও শহরের অনুপাত: গ্রামীণ (RLB) এবং শহর এলাকার (ULB) স্থানীয় সংস্থার জন্য ৬০:৪০ অনুপাতে বরাদ্দ করা হয়েছে।
- কর্মদক্ষতা ভিত্তিক: ৮০% অর্থ দেওয়া হবে মৌলিক অনুদান হিসেবে এবং ২০% দেওয়া হবে কর্মদক্ষতার ওপর ভিত্তি করে।
- শর্তাবলী: অনুদান তখনই দেওয়া হবে যদি রাজ্যগুলো:
- সময়মতো রাজ্য অর্থ কমিশন (SFC) গঠন করে।
- স্থানীয় সংস্থাগুলোর নিরীক্ষিত হিসেব (audited accounts) জনসমক্ষে প্রকাশ করে।
- নগরায়ণ প্রিমিয়াম: যে সব রাজ্য শহর সংলগ্ন গ্রামগুলোকে সফলভাবে বড় শহরের সাথে যুক্ত করবে, তাদের জন্য ১০,০০০ কোটি টাকার এককালীন অনুদান দেওয়া হবে।
খ. দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা (২.০৪ লক্ষ কোটি টাকা)
- SDRF এবং SDMF: অর্থ বরাদ্দকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে—সাড়া প্রদান (SDRF) এবং প্রশমন (SDMF), যাতে দুর্যোগ প্রতিরোধের ওপর বেশি জোর দেওয়া যায়।
- ব্যয় ভাগাভাগি: সাধারণ রাজ্যগুলোর জন্য ৭৫:২৫ এবং উত্তর-পূর্ব ও হিমালয় সংলগ্ন রাজ্যগুলোর জন্য ৯০:১০ অনুপাত বজায় রাখা হয়েছে।
৪. আর্থিক রোডম্যাপ এবং সংস্কার
দীর্ঘমেয়াদী ঋণের বোঝা কমাতে কমিশন কঠোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
- আর্থিক ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা: * কেন্দ্র: ২০৩০–৩১ সালের মধ্যে আর্থিক ঘাটতি জিডিপির ৩.৫%-এ নামিয়ে আনা।
- রাজ্য: রাজ্যের জিএসডিপি-র (GSDP) ৩%-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা।
- অফ–বাজেট ঋণ: বাজেটের বাইরে ঋণ নেওয়ার ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা সুপারিশ করা হয়েছে; সমস্ত দায়বদ্ধতা স্বচ্ছভাবে বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
- বিদ্যুৎ খাত: বিদ্যুৎ বণ্টনকারী সংস্থাগুলোর (DISCOMs) বিপুল ঋণ কমাতে রাজ্যগুলোকে সেগুলো বেসরকারিকরণের দিকে উৎসাহিত করা হয়েছে।
- ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ: রাজ্যগুলোকে “শর্তহীন নগদ সহায়তা” পুনর্বিবেচনা করতে এবং কল্যাণমূলক প্রকল্পের ক্ষেত্রে কঠোর বর্জনীয় নীতি (exclusion criteria) কার্যকর করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
৫. সরকারি উদ্যোগ (PSE) সংস্কার
- প্রস্থান নীতি: ৩০৮টি অকেজো রাজ্য পিএসই (PSE) বন্ধ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
- কর্মদক্ষতা পর্যালোচনা: যে সব রাজ্য পিএসই টানা ৪ বছরের মধ্যে ৩ বছর লোকসান করছে, সেগুলো বেসরকারিকরণ বা বন্ধের বিষয়ে রাজ্য মন্ত্রিসভাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
১৬তম অর্থ কমিশনের তাৎপর্য
- উৎপাদনশীলতার পুরস্কার: স্রেফ সাহায্যের পরিবর্তে অর্থনৈতিক দক্ষতা এবং জাতীয় বৃদ্ধিতে অবদানকে গুরুত্ব দিতে “জিডিপিতে অবদান“ (১০% ওজন) যুক্ত করা হয়েছে।
- কঠোর আর্থিক নিয়ন্ত্রণ: বাজেটের বাইরের ঋণ নিষিদ্ধ করা এবং রাজস্ব ঘাটতি অনুদান বন্ধ করার ফলে রাজ্যগুলো নিজস্বভাবে স্বনির্ভর হতে বাধ্য হবে।
- তৃতীয় স্তরের স্বায়ত্তশাসন: ২০% অনুদান কর্মদক্ষতা এবং জিআইএস (GIS) ভিত্তিক কর সংস্কারের সাথে যুক্ত করার ফলে স্থানীয় সংস্থাগুলো অনুদান-নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব আয় বাড়াতে সক্ষম হবে।
- ভারসাম্যপূর্ণ ফেডারেলিজম: জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং মুক্ত বনভূমি রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার ফলে পরিবেশবান্ধব এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল রাজ্যগুলো আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে না।
- ২০৪৭–এর ভিকশিত ভারত: ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে কেন্দ্রের ঘাটতি ৩.৫%-এ নামানোর লক্ষ্যমাত্রা ভারতকে একটি উচ্চ-আয়ের অর্থনীতিতে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক স্থিতিশীলতা দেবে।
১৬তম অর্থ কমিশন নিয়ে উদ্বেগসমূহ
১. ‘সেস এবং সারচার্জ‘ সমস্যা
- সেস এবং সারচার্জ রাজ্যগুলোর সাথে ভাগ করা হয় না। কেন্দ্রের মোট কর আয়ে এদের অংশ ২০১৩ সালের ৫% থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ সালে ১১–১২% হয়েছে। এর ফলে রাজ্যগুলো কাগজে-কলমে ৪১% প্রাপ্য হলেও বাস্তবে প্রায় ৩১–৩২% অর্থ পায়।
২. রাজস্ব ঘাটতি অনুদান (RDG) বন্ধ করা
- হিমাচল প্রদেশ বা উত্তরাখণ্ডের মতো পাহাড়ি রাজ্যগুলো মনে করে যে, তাদের ভৌগোলিক পরিস্থিতির কারণে রাজস্ব ঘাটতি এড়ানো অসম্ভব। এই “নিরাপত্তা কবচ” সরিয়ে নেওয়ায় তাদের আর্থিক সংকটে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
৩. দক্ষতা বনাম সমতা (দক্ষিণ বনাম উত্তর বিতর্ক)
- জিডিপিতে অবদান যুক্ত করায় এবং “আয়ের দূরত্ব”-এর গুরুত্ব কমানোয় ধনী রাজ্যগুলো লাভবান হতে পারে। কিন্তু বিহার বা উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলোর প্রাপ্য অংশে টান পড়তে পারে। আবার দক্ষিণের রাজ্যগুলো মনে করে, ২০১১ সালের জনসংখ্যা ব্যবহার করায় তাদের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সাফল্যকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।
৪. রাজ্যের আর্থিক স্বায়ত্তশাসন হ্রাস
- স্থানীয় সংস্থাগুলোর অনুদানের বড় অংশ নির্দিষ্ট কাজের (যেমন স্যানিটেশন বা জল) জন্য “আবদ্ধ” (tied) রাখা হয়েছে। এছাড়া বিদ্যুৎ সংস্থা বেসরকারিকরণের মতো শর্তগুলোকে রাজ্যগুলোর অভ্যন্তরীণ নীতিতে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আর্থিক ফেডারেলিজম শক্তিশালী করার পদক্ষেপ
- সেস এবং সারচার্জ সীমিত করা: একটি সাংবিধানিক সংশোধনী বা আইনি সীমার (যেমন মোট করের ১০%) মাধ্যমে সেস ও সারচার্জের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনা দরকার।
- রাজ্যের রাজস্ব স্বায়ত্তশাসন বৃদ্ধি: জিএসটি কাঠামোর মধ্যে রাজ্যগুলোকে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যে সামান্য কর পরিবর্তনের ক্ষমতা দেওয়া উচিত।
- তৃতীয় স্তরের শক্তিশালীকরণ: রাজ্য অর্থ কমিশন (SFC) সময়মতো গঠন করা এবং সরাসরি স্থানীয় সংস্থার অ্যাকাউন্টে অর্থ পাঠানো নিশ্চিত করা।
- ব্যয় যৌক্তিকীকরণ: কেন্দ্রীয়ভাবে স্পনসর করা স্কিমগুলোকে (CSS) রাজ্যগুলোর চাহিদা অনুযায়ী সাজানোর স্বাধীনতা দেওয়া।
- প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন: সংবিধানের ২৬৩ ধারা অনুযায়ী আন্তঃরাজ্য কাউন্সিলকে (ISC) সক্রিয় করা, যা আর্থিক বিরোধ নিষ্পত্তির রাজনৈতিক মঞ্চ হিসেবে কাজ করবে।
উপসংহার
১৬তম অর্থ কমিশন ভারতকে “অধিকার-ভিত্তিক” সহায়তা থেকে “কর্মদক্ষতা–ভিত্তিক“ ফেডারেলিজমের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। জিডিপি অবদান এবং আর্থিক স্বচ্ছতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এটি একটি “বিকশিত ভারত”এর ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করেছে, যা আঞ্চলিক সমতা এবং ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতামূলক দক্ষতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখবে।