প্রেক্ষাপট
সম্প্রতি, পরিবেশ বিজ্ঞানীরা একটি ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত সংকটের বিষয়ে সতর্ক করেছেন: আর্কটিক বা সুমেরু অঞ্চল বিশ্ব গড় উষ্ণতার তুলনায় প্রায় চারগুণ দ্রুত হারে উষ্ণ হচ্ছে—এই ঘটনাটি ‘আর্কটিক অ্যামপ্লিফিকেশন‘ (Arctic Amplification) নামে পরিচিত। এই উষ্ণায়নের ফলে এই অঞ্চলটি এখন আগ্রাসী বিদেশি উদ্ভিদ (Invasive plant species) প্রজাতির বসবাসের জন্য ক্রমশ উপযোগী হয়ে উঠছে।
মূল ধারণাসমূহ
১. আর্কটিক অ্যামপ্লিফিকেশন এবং ‘থার্মাল নিশ‘
- সংজ্ঞা: ‘অ্যালবেডো–ফিডব্যাক লুপ‘-এর (সাদা বরফ গলে গিয়ে অন্ধকার মহাসাগর বা স্থলভাগ উন্মুক্ত হওয়া, যা বেশি তাপ শোষণ করে) কারণে বিশ্ব গড়ের তুলনায় সুমেরু অঞ্চল উল্লেখযোগ্যভাবে দ্রুত হারে উষ্ণ হওয়ার ঘটনাকেই আর্কটিক অ্যামপ্লিফিকেশন বলা হয়।
- থার্মাল নিশের বিস্তার: উষ্ণ তাপমাত্রা নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের প্রজাতিগুলোকে (যেমন—কাউ পার্সনিপ, স্টিকি র্যাগওয়ার্ট) এমন সব এলাকায় বেঁচে থাকতে এবং বংশবৃদ্ধি করতে সাহায্য করছে, যেখানে আগে অতিরিক্ত ঠান্ডার কারণে এদের বীজ অঙ্কুরিত হতে পারত না।
২. আগ্রাসনের পথ (মানুষের ভূমিকা)
- জাহাজ চলাচল: সামুদ্রিক বরফ গলে যাওয়ায় উত্তর সাগর পথ (NSR) এবং উত্তর–পশ্চিম পথ উন্মুক্ত হয়েছে। জাহাজের ব্যালাস্ট ওয়াটার (ভারসাম্য রক্ষার জল) এবং জাহাজের তলায় আটকে থাকা উদ্ভিদ সামুদ্রিক ও উপকূলীয় আগ্রাসী প্রজাতির বিস্তারের প্রধান মাধ্যম।
- পর্যটন ও গবেষণা: আর্কটিকের ‘হটস্পট’ যেমন—স্বালবার্ড (নরওয়ে) এবং পশ্চিম আলাস্কা পরিদর্শনে আসা পর্যটক ও গবেষকদের পোশাক, হাইকিং বুট এবং যন্ত্রপাতির সাথে লেগে এই বীজগুলো সেখানে পৌঁছে যাচ্ছে।
- নির্মাণ কাজ: তেল ও গ্যাস উত্তোলনের জন্য পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজে অনেক সময় আমদানিকৃত মাটি বা যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়, যা প্রায়ই অ–দেশীয় বীজে দূষিত থাকে।
৩. ‘স্লিপার স্পিসিস‘ (Sleeper Species) বা সুপ্ত প্রজাতি
- এগুলো এমন কিছু বিদেশি প্রজাতি যা বছরের পর বছর ধরে আর্কটিক অঞ্চলে খুব অল্প সংখ্যায় সুপ্ত অবস্থায় ছিল।
- উস্কানি: যখনই তাপমাত্রা একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করে, এই প্রজাতিগুলো “জেগে ওঠে“ এবং অত্যন্ত দ্রুত ও আগ্রাসীভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, যা স্থানীয় উদ্ভিদকুলকে ধ্বংস করে দেয়।
৪. পরিবেশগত প্রভাব: আগ্রাসী উদ্ভিদ–আগুন–পারমাফ্রস্ট সংযোগ
- অগ্নিপ্রবাহের পরিবর্তন: আগ্রাসী ঘাসগুলো (যেমন—স্মুথ ব্রোম) স্থানীয় তুন্দ্রা উদ্ভিদের তুলনায় অনেক বেশি দাহ্য এবং ঘন ঝোপ তৈরি করে।
- পারমাফ্রস্টের ওপর প্রভাব: ঘনঘন দাবানল মাটির প্রাকৃতিক নিরোধক স্তরটিকে নষ্ট করে দেয়। এটি পারমাফ্রস্ট বা চিরতুষারাবৃত ভূমিকে উন্মুক্ত করে দেয়, যার ফলে বরফ দ্রুত গলতে শুরু করে এবং মাটির নিচে জমা থাকা মিথেন ও কার্বন ডাই অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে নির্গত হয়।
আন্তর্জাতিক শাসন ও কাঠামো
- আরিয়াস (ARIAS – Arctic Invasive Alien Species) কৌশল: জৈবিক আগ্রাসন প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ এবং মোকাবিলা করার জন্য আর্কটিক কাউন্সিল (কার্যনির্বাহী গোষ্ঠী: CAFF এবং PAME) কর্তৃক গৃহীত একটি বিশেষ কর্মপরিকল্পনা।
- কুনমিং–মন্ট্রিল গ্লোবাল বায়োডাইভারসিটি ফ্রেমওয়ার্ক (লক্ষ্য ৬): ২০৩০ সালের মধ্যে আগ্রাসী বিদেশি প্রজাতির প্রবেশ ও বিস্তারের হার অন্তত ৫০% হ্রাস করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
- ভারতের ভূমিকা: আর্কটিক কাউন্সিলের একজন পর্যবেক্ষক (Observer) হিসেবে ভারতের আর্কটিক নীতি (২০২২) “পরিবেশ সুরক্ষা” এবং জলবায়ু-প্ররোচিত জৈবিক পরিবর্তনগুলো পর্যবেক্ষণের ওপর জোর দেয়, যা বিশ্বজুড়ে আবহাওয়াকে (ভারতের মৌসুমি বায়ুসহ) প্রভাবিত করে।
Q. "আর্কটিক অ্যামপ্লিফিকেশন" এবং এর পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে নিচের বিবৃতিগুলো বিবেচনা করুন:
1. আর্কটিক অ্যামপ্লিফিকেশন মূলত সামুদ্রিক বরফ গলে যাওয়ার কারণে গ্রহের অ্যালবেডো প্রভাব হ্রাসের ফলে ঘটে।
2. "স্লিপার স্পিসিস" বলতে সেইসব স্থানীয় আর্কটিক উদ্ভিদকে বোঝায় যারা জলীয় বাষ্পের ক্ষতি রোধ করতে চরম উষ্ণতার সময় গভীর সুপ্ত অবস্থায় চলে যায়।
3. আর্কটিকে নির্দিষ্ট কিছু আগ্রাসী ঘাসের উপস্থিতি তুন্দ্রা অঞ্চলের দাবানলের সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়ে পারমাফ্রস্ট গলন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
4. ভারত আর্কটিক কাউন্সিলের একজন স্থায়ী সদস্য এবং ওই অঞ্চলের পরিবেশগত নীতির ওপর ভারতের ভেটো (Veto) ক্ষমতা রয়েছে।
a) কেবল 1 এবং 2
b) কেবল 2 এবং 4
c) কেবল 1 এবং 3
d) কেবল 1, 3 এবং 4
উত্তর: (c)
সমাধান:
• বিবৃতি 1 সঠিক: আর্কটিক অ্যামপ্লিফিকেশন একটি ফিডব্যাক প্রক্রিয়া যেখানে প্রতিফলিত বরফ (উচ্চ অ্যালবেডো) কমে গিয়ে অন্ধকার জল/স্থলভাগ (নিম্ন অ্যালবেডো) উন্মুক্ত হয়, যার ফলে তাপ শোষণ বেশি হয় এবং উষ্ণায়ন দ্রুততর হয়।
• বিবৃতি 2 ভুল: "স্লিপার স্পিসিস" হলো অ-দেশীয় বা বিদেশি প্রজাতি যারা পরিবেশে খুব কম সংখ্যায় থাকে যতক্ষণ না উষ্ণায়নের মতো পরিবেশগত পরিবর্তন তাদের আগ্রাসী বিস্তারে সাহায্য করে। এরা স্থানীয় উদ্ভিদ নয়।
• বিবৃতি 3 সঠিক: আগ্রাসী উদ্ভিদ তুন্দ্রার আগুনের উৎস হিসেবে কাজ করতে পারে। বেশি দাহ্য ঘাস দাবানল সৃষ্টি করে যা মাটির সুরক্ষা স্তর নষ্ট করে দেয়, ফলে নিচের পারমাফ্রস্ট দ্রুত গলে যায়।
• বিবৃতি 4 ভুল: ভারত একজন পর্যবেক্ষক, সদস্য নয়। শুধুমাত্র আর্কটিক সার্কেলে ভূখণ্ড থাকা ৮টি দেশ এর সদস্য। পর্যবেক্ষকদের ভোটাধিকার বা ভেটো ক্ষমতা নেই।