প্রেক্ষাপট:
সাম্প্রতিক সরকারি নীতি ও কৌশলগুলোতে বায়ো-বেজড উৎপাদন (Bio-based manufacturing) বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি ভারতের বায়ো-ইকোনমি বা জৈব-অর্থনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর মূল উদ্দেশ্য হলো জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উৎপন্ন রাসায়নিকের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শিল্পোন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা
১. মূল ধারণা: সংজ্ঞা ও প্রয়োগ
- বায়ো-বেজড কেমিক্যাল: এগুলো এমন সব রাসায়নিক যা মূলত নবায়নযোগ্য জৈব উৎস (যেমন: আখ, ভুট্টা, স্টার্চ বা জৈব বর্জ্য) থেকে তৈরি হয়। এই রাসায়নিকগুলো মূলত গাঁজন (Fermentation) বা জৈবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উৎপন্ন হয় এবং এগুলো সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব।
- উদাহরণ: জৈব অ্যাসিড (ল্যাকটিক অ্যাসিড), বায়ো-অ্যালকোহল, দ্রাবক (Solvents), সারফ্যাক্ট্যান্ট এবং প্লাস্টিক, প্রসাধন সামগ্রী ও ওষুধের মধ্যবর্তী কাঁচামাল।
- এনজাইম (Enzymes): এনজাইম হলো প্রাকৃতিক জৈব অনুঘটক, যা রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
- পরিবেশগত সুবিধা: এনজাইমগুলো সাধারণ বা নিম্ন তাপমাত্রা এবং চাপে কাজ করতে সক্ষম। ফলে প্রথাগত পদ্ধতির তুলনায় এটি শক্তির ব্যবহার (Energy consumption) এবং দূষণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে।
২. ভারতের কৌশলগত অবস্থান ও নীতি
- নীতিগত কাঠামো: ভারত সরকারের বায়োটেকনোলজি বিভাগের BioE3 নীতির আওতায় বায়ো-বেজড কেমিক্যাল এবং এনজাইম উৎপাদনকে ‘অগ্রাধিকার ক্ষেত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
- অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি: এই খাতের প্রসারের লক্ষ্য হলো পেট্রোকেমিক্যাল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো (উদাহরণস্বরূপ: ২০২৩ সালে ভারত প্রায় ৪৭৯.৮ মিলিয়ন ডলার মূল্যের অ্যাসিটিক অ্যাসিড আমদানি করেছে) এবং কৃষিজাত পণ্যের জন্য নতুন বাজার তৈরি করা।
BioE3 নীতি প্রসঙ্গে
- সূচনা: ভারত সরকার (২০২৪-২৫ বাজেটে) দেশের জৈব-অর্থনীতির (Bio-economy) প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে BioE3 নীতি প্রবর্তন করেছে। এর মূল লক্ষ্য হলো জৈব-ভিত্তিক উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা তৈরি এবং পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করা।
- লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য: ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতকে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের জৈব-অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে এই নীতি কাজ করছে। এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), বায়োফাউন্ড্রি এবং বিভিন্ন হাব ব্যবহারের মাধ্যমে জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, প্রিসিশন বায়োথেরাপিউটিকস এবং পরিবেশবান্ধব গ্রিন কেমিক্যালস উৎপাদনে জোয়ার আনবে।
- কৌশলগত ক্ষেত্র: এই নীতিটি ছয়টি প্রধান বিষয়ের ওপর আলোকপাত করে:
- উচ্চ-মূল্যের বায়ো-বেজড কেমিক্যাল এবং এনজাইম।
- স্মার্ট প্রোটিন।
- প্রিসিশন বায়োথেরাপিউটিকস।
- কার্বন ক্যাপচার এবং এর ব্যবহার।
- জলবায়ু-সহনশীল কৃষি।
- ভবিষ্যৎমুখী সামুদ্রিক এবং মহাকাশ গবেষণা।
- প্রভাব ও সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য: এই নীতিটি ২০৭০ সালের মধ্যে ভারতের ‘নেট-জিরো’ কার্বন নিঃসরণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং ‘বিকশিত ভারত @২০৪৭’-এর স্বপ্ন পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
৩. বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: আন্তর্জাতিক কৌশল
| অঞ্চল/দেশ | মূল কৌশল/প্রকল্প | ফোকাস এরিয়া বা প্রধান লক্ষ্য |
| ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) | বায়োইকোনমি স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড অ্যাকশন প্ল্যান | জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা এবং বর্জ্য হ্রাসের সাথে শিল্প রূপান্তরকে সমন্বিত করা। |
| মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (U.S.) | USDA বায়ো-প্রিফার্ড প্রোগ্রাম | প্রাথমিক বাজার তৈরির লক্ষ্যে প্রত্যয়িত বায়ো-বেজড পণ্য ক্রয়ে ফেডারেল সরকারকে অগ্রাধিকার প্রদান। |
| চীন | বায়োইকোনমি ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান | কৌশলগত খাত হিসেবে উচ্চ-মূল্যের বায়ো-বেজড কেমিক্যাল এবং এনজাইম প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার প্রদান। |
| জাপান | METI/NARO প্রজেক্টস | বায়ো-বেজড কেমিক্যাল গবেষণা এবং উৎপাদন প্রস্তুতির (Manufacturing readiness) মধ্যে সমন্বয়। |
৪. উৎপাদন বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ
- ব্যয় সংক্রান্ত অসুবিধা: প্রতিষ্ঠিত পেট্রোকেমিক্যাল বিকল্পের তুলনায় বায়ো-বেজড পণ্যের উচ্চ উৎপাদন খরচ বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা।
- সম্পদের সহজলভ্যতা: বড় আকারের উৎপাদনের জন্য নির্ভরযোগ্য কাঁচামালের (Feedstocks) যোগান এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব।
- বাজারে গ্রহণযোগ্যতা: বর্তমান উৎপাদন ব্যবস্থায় বিদ্যমান কাঁচামাল পরিবর্তন করে বায়ো-বেজড পণ্য গ্রহণ করা এবং পরবর্তী পর্যায়ের (Downstream) উৎপাদকদের মানসিকতা পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ।
Q: ভারতের 'BioE3 নীতি' এবং বায়ো-বেজড কেমিক্যাল সম্পর্কে নিচের বিবৃতিগুলো বিবেচনা করুন:
I. বায়ো-বেজড কেমিক্যাল হলো মূলত পেট্রোকেমিক্যাল কাঁচামাল থেকে এনজাইমেটিক ক্যাটালিস্টের মাধ্যমে তৈরি শিল্প রাসায়নিক।
II. বায়ো-ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের ক্ষেত্রে এনজাইমকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় কারণ এগুলো প্রচলিত রাসায়নিক অনুঘটকের তুলনায় কম তাপমাত্রা ও চাপে কাজ করতে পারে।
III. 'USDA BioPreferred Program' হলো ভারতের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগ, যার লক্ষ্য বায়ো-বেজড ডিটারজেন্টের বিশ্বব্যাপী সংগ্রহ নিশ্চিত করা।
উপরের বিবৃতিগুলোর মধ্যে কোনটি/কোনগুলো সঠিক?
(A) কেবল I
(B) কেবল II
(C) কেবল I এবং III
(D) কেবল II এবং III
উত্তর: (B)
ব্যাখ্যা:
• বিবৃতি I ভুল: এগুলো পেট্রোকেমিক্যাল নয়, বরং জৈব কাঁচামাল (যেমন আখ, ভুট্টা) থেকে আহরণ করা হয়।
• বিবৃতি II সঠিক: এনজাইম হলো প্রাকৃতিক জৈব অনুঘটক। এগুলো শিল্পক্ষেত্রে কম তাপমাত্রা ও চাপে কাজ করতে সাহায্য করে, যা প্রক্রিয়াটিকে সাশ্রয়ী ও কম দূষণকারী করে তোলে।
• বিবৃতি III ভুল: এটি একটি মার্কিন (U.S.) প্রোগ্রাম, ভারতের নেতৃত্বে কোনো আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নয়।




