গ্রেট নিকোবর প্রকল্প: উন্নয়ন বনাম পরিবেশ

“গ্রেট নিকোবর প্রকল্প উন্নয়ন বনাম পরিবেশগত স্থায়িত্ব নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। বিষয়টি সমালোচনামূলকভাবে পরীক্ষা করুন।” (১৫ নম্বর, GS-3 পরিবেশ)

প্রেক্ষাপট:

সম্প্রতি ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল (NGT)-এর একটি বিশেষ বেঞ্চ গ্রেট নিকোবর প্রকল্পকে সবুজ সংকেত দিয়েছে। পরিবেশগত এবং আদিবাসী অধিকার সংক্রান্ত মামলা চলমান থাকা সত্ত্বেও ট্রাইব্যুনাল প্রকল্পটির কৌশলগত গুরুত্বকে” (Strategic Importance) প্রাধান্য দিয়েছে।

গ্রেট নিকোবর প্রকল্পের উৎস:

  • পরিকল্পনা: ২০২১ সালে নীতি আয়োগ (NITI Aayog) কর্তৃক পরিকল্পিত।
  • বাস্তবায়নকারী সংস্থা: আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ সমন্বিত উন্নয়ন নিগম (ANIIDCO)।
  • আকার: প্রায় ১৬৬ বর্গ কিমি এলাকা জুড়ে বিস্তৃত (দ্বীপের মোট ৯১০ বর্গ কিমি এলাকার প্রায় ১৮%)।

প্রকল্পের প্রধান উপাদানসমূহ:

একটি স্বনির্ভর অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম তৈরির জন্য প্রকল্পটি চারটি প্রধান স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে তৈরি:

I. আন্তর্জাতিক কন্টেইনার ট্রান্সশিপমেন্ট টার্মিনাল (ICTT):

  • অবস্থান: দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত গালাথিয়া বে (Galathea Bay)-তে এটি কৌশলগতভাবে স্থাপন করা হচ্ছে।
  • ক্ষমতা: পূর্ণ ক্ষমতায় বছরে ১৬ মিলিয়ন TEUs কন্টেইনার হ্যান্ডেল করার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৮ সালের মধ্যে প্রথম ধাপ (৪ মিলিয়ন TEU) শেষ হওয়ার কথা।
  • সুবিধা: এখানে জলের স্বাভাবিক গভীরতা ২০ মিটারের বেশি, যা ড্রেজিং ছাড়াই বিশাল আকৃতির কন্টেইনার জাহাজ ভেড়াতে সাহায্য করবে।

II. গ্রিনফিল্ড আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর:

  • দ্বিমুখী ব্যবহার: এটি বেসামরিক পর্যটন এবং প্রতিরক্ষা/সামরিক লজিস্টিকস—উভয় কাজেই ব্যবহৃত হবে।
  • ক্ষমতা: প্রতি ঘণ্টায় ,০০০ যাত্রী সামলানোর ক্ষমতা সম্পন্ন। এটি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে দ্রুত মোতায়েনের জন্য আন্দামান ও নিকোবর কমান্ড (ANC)-কে শক্তিশালী করবে।

III. গ্যাস এবং সৌর-ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র:

  • ক্ষমতা: একটি ৪৫০-এমভিএ (MVA) হাইব্রিড বিদ্যুৎ কেন্দ্র।
  • কাজ: টার্মিনাল, বিমানবন্দর এবং নতুন শহরে নিরবচ্ছিন্ন শক্তি সরবরাহ করা। এতে ডিজেলের ব্যবহার কমিয়ে প্রাকৃতিক গ্যাস এবং সৌর শক্তির মিশ্রণ ব্যবহার করা হবে।

IV. গ্রিনফিল্ড স্মার্ট সিটি / জনপদ (Township):

  • ভিশন: ১৬০ বর্গ কিমি এলাকা জুড়ে একটি আধুনিক শহর তৈরি করা যেখানে ৩.৫ লাখ বাসিন্দা থাকতে পারবেন (বর্তমানে লোকসংখ্যা মাত্র ৮,০০০)।
  • অবকাঠামো: এর মধ্যে আবাসিক এলাকা, বিলাসবহুল পর্যটন রিসোর্ট, ক্রুজ শিপ টার্মিনাল এবং শিল্প কেন্দ্র অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

গ্রেট নিকোবর প্রকল্পের গুরুত্ব:

গ্রেট নিকোবরকে বঙ্গোপসাগরে ভারতের অডুবে বিমানবাহী রণতরী” (Unsinkable Aircraft Carrier) বলা হয়।

১. ভূ-কৌশলগত এবং নিরাপত্তা:

  • সামুদ্রিক চোকপয়েন্ট নিয়ন্ত্রণ: এটি মালাক্কা প্রণালী থেকে মাত্র ৯০ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থিত। বিশ্বের প্রায় ৪০% বাণিজ্যের ওপর নজরদারি করার সুযোগ করে দেবে এই অবস্থান।
  • চীনকে মোকাবিলা: চীনের স্ট্রিং অফ পার্লস” (যেমন গোয়াদর, হাম্বানটোটা বন্দর) এবং কোকো দ্বীপে তাদের উপস্থিতির বিরুদ্ধে এটি একটি শক্তিশালী কৌশলগত দুর্গ হিসেবে কাজ করবে।
  • ত্রি-পরিষেবা কমান্ড (ANC): ভারতের একমাত্র সমন্বিত ত্রি-পরিষেবা কমান্ডের কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে আকাশ ও নৌ বাহিনীর দ্রুত মোতায়েন নিশ্চিত করবে।

২. অর্থনৈতিক এবং “ব্লু ইকোনমি”:

  • ট্রান্সশিপমেন্ট সার্বভৌমত্ব: বর্তমানে ভারতের প্রায় ৭৫% কন্টেইনার কলম্বো বা সিঙ্গাপুরে খালাস হয়। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বছরে প্রায় ২০০–২২০ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
  • প্রাকৃতিক সুবিধা: গালাথিয়া বে-র গভীরতা বিশালাকৃতির জাহাজ নোঙরের জন্য আদর্শ।
  • ব্লু ইকোনমি বৃদ্ধি: এটি মেরিটাইম ইন্ডিয়া ভিশন ২০৩০-এর সাথে সংগতিপূর্ণ এবং জাহাজ মেরামত ও জ্বালানি সরবরাহের মতো শিল্প গড়ে তুলবে।
  • পর্যটনের সম্ভাবনা: মালদ্বীপ বা মরিশাসের মতো বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে দ্বীপটিকে গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

৩. কূটনৈতিক এবং আঞ্চলিক নেতৃত্ব:

  • অ্যাক্ট ইস্ট” নীতি: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ASEAN দেশগুলোর সাথে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সেতু হিসেবে কাজ করবে।
  • নিরাপত্তা প্রদানকারী: বঙ্গোপসাগরে বিপর্যয় মোকাবিলা (HADR) এবং জলদস্যু বিরোধী অভিযানে ভারতের সামর্থ্য বাড়বে।

৪. আর্থ-সামাজিক প্রভাব:

  • কর্মসংস্থান: প্রায় ১ লাখ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।
  • অবকাঠামোগত উন্নয়ন: আধুনিক বিমানবন্দর এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্র ভারতের এই প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে।

প্রধান উদ্বেগসমূহ:

১. পরিবেশগত ঝুঁকি:

  • ব্যাপক বন উজাড়: প্রায় ১৩০ বর্গ কিমি গ্রীষ্মমন্ডলীয় রেইনফরেস্ট ধ্বংস করা হবে। সরকারি হিসাবে ৯.৬৪ লাখ গাছ কাটা হবে, যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন এই সংখ্যা ৩০ লাখ ছাড়াতে পারে।

বিপন্ন প্রজাতি:

  • জায়ান্ট লেদারব্যাক টার্টল: গালাথিয়া বে এদের প্রধান প্রজনন ক্ষেত্র; যা এখন বিপদের মুখে।
  • নিকোবর মেগাপোড: এটি একটি বিশেষ ধরনের পাখি যা শুধুমাত্র এই এলাকাতেই পাওয়া যায়।
  • প্রবাল প্রাচীর ও ম্যানগ্রোভ: ড্রেজিংয়ের ফলে পলি জমে প্রায় ২০,০০০ প্রবাল কলোনি ধ্বংস হতে পারে। ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংস হলে সুনামি প্রতিরোধ ক্ষমতা কমবে।

২. আদিবাসী অধিকার ও সামাজিক উদ্বেগ:

  • PVTGs-এর প্রতি হুমকি: এটি শম্পেন (একটি অতি বিপন্ন আদিবাসী গোষ্ঠী) এবং নিকোবরী সম্প্রদায়ের আদি নিবাস।
  • আইন লঙ্ঘন: অভিযোগ উঠেছে যে আদিবাসী পরিষদের অবাধ ও পূর্ব সম্মতি” (FPIC) যথাযথভাবে নেওয়া হয়নি।
  • সাংস্কৃতিক বিলুপ্তি: জনসংখ্যা হঠাৎ ৮,০০০ থেকে ৩.৫ লাখে পৌঁছালে আদিবাসীরা বাইরের রোগের সম্মুখীন হতে পারে এবং তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি হারিয়ে যেতে পারে।

৩. ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি:

  • সিসমিক জোন V: এলাকাটি অত্যন্ত উচ্চ ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত। ২০০৪ সালের সুনামির সময় এই দ্বীপটি স্থায়ীভাবে ১৫ ফুট নিচে তলিয়ে গিয়েছিল

৪. প্রাতিষ্ঠানিক ত্রুটি:

  • অস্পষ্ট ছাড়পত্র: “জাতীয় নিরাপত্তা”-র দোহাই দিয়ে অনেক পরিবেশগত তথ্য গোপন রাখা হয়েছে।
  • ত্রুটিপূর্ণ মূল্যায়ন: পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) মাত্র এক ঋতুর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে বলে সমালোচনা রয়েছে।

ভবিষ্যৎ পথ

  • কার্যকর প্রবাল স্থানান্তর: প্রবালগুলোকে কেবল নামমাত্র এখানে-সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে স্থানান্তর না করে, প্রবাল পুনরুত্পাদনের জন্য আন্তর্জাতিক সেরা পদ্ধতিগুলো (যেমন Biorock প্রযুক্তি) গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া ২০,০০০-এরও বেশি প্রবাল কলোনির বেঁচে থাকার হার যাচাই করতে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে অডিট বা নিরীক্ষা পরিচালনা করতে হবে।
  • প্রকৃতি-ভিত্তিক উপকূলীয় প্রতিরক্ষা: তথাকথিত কংক্রিটের বাঁধের পাশাপাশি গ্রিন-গ্রে” (Green-Gray) অবকাঠামোকে প্রাধান্য দিতে হবে। এর অর্থ হলো সমুদ্রের ঢেউ ও সুনামির ঝুঁকি কমাতে এবং ভূমি ক্ষয় রোধ করতে সমুদ্রের দেওয়াালের সাথে সাথে ম্যানগ্রোভ বন পুনরুদ্ধার এবং কৃত্রিম প্রবাল প্রাচীর ব্যবহার করা।
  • স্বাস্থ্য সুরক্ষা: দ্বীপের জনসংখ্যা বাড়লেও আদিবাসী শম্পেন (Shompen) উপজাতিদের “সীমিত যোগাযোগ” বা বিচ্ছিন্ন থাকার মর্যাদা বজায় রাখতে হবে। বাইরের রোগ যাতে তাদের মধ্যে সংক্রমিত না হয়, সেজন্য একটি কঠোর বায়োসিকিউরিটি প্রোটোকল” তৈরি করতে হবে।
  • স্বাধীন তদারকি কর্তৃপক্ষ: পরিবেশগত ছাড়পত্রের (EC) শর্তগুলো ঠিকমতো মানা হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য একটি বহুমুখী অংশীজন বডি বা কর্তৃপক্ষ গঠন করতে হবে। এই কমিটিতে পরিবেশবিদ, আদিবাসী প্রতিনিধি এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
  • জনসমক্ষে তথ্য প্রকাশ: ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনালের (NGT) সাম্প্রতিক আলোচনা অনুযায়ী, জনমনে বিশ্বাস তৈরির জন্য সরকারের উচিত উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটির (HPC) রিপোর্টের অ-সংবেদনশীল অংশগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া।
  • জলবায়ু-সহনশীল ইঞ্জিনিয়ারিং: গ্রেট নিকোবর অত্যন্ত উচ্চ ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা (সিসমিক জোন V) হওয়ার কারণে, সমস্ত অবকাঠামো অবশ্যই সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক মানের (Eurocode 8 বা সমতুল্য) ভূমিকম্প-প্রতিরোধী নিয়ম মেনে তৈরি করতে হবে। এছাড়া নিয়মিত বিরতিতে বাধ্যতামূলক সিসমিক অডিট” বা ভূমিকম্প সংক্রান্ত পরীক্ষা করতে হবে।

উপসংহার:

কৌশলগত গভীরতার সাথে পরিবেশগত পবিত্রতার সমন্বয় ঘটিয়ে এই প্রকল্পটিকে একটি সবুজ সামুদ্রিক কেন্দ্র” (Green Maritime Hub) হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। টেকসই ইঞ্জিনিয়ারিং এবং আদিবাসী-অন্তর্ভুক্তিমূলক সুশাসনের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে ভারত গ্রেট নিকোবরকে এমন এক ভবিষ্যৎ সীমান্তে (Futuristic Frontier) রূপান্তরিত করতে পারে, যা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের নেতৃত্ব এবং উচ্চ-মূল্যবান জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ—উভয়ের মধ্যে একটি সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখবে।