ফেডারেলিজম বা যুক্ত রাষ্ট্রীয়ব্যবস্থা

“কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকার সম্প্রতি কী কী পরিবর্তন এনেছে? কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে বিশ্বাস স্থাপন এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য কী কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?” (২০২৪ – ১৫ নম্বর, GS-2 Polity)

প্রেক্ষাপট

জাস্টিস কুরিয়ান জোসেফ কমিটি দাবি করেছে যে, ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কেন্দ্র সরকারের হাতে ক্ষমতার অত্যধিক কেন্দ্রীকরণ ঘটছে। গণপরিষদের বিতর্ক এবং পূর্ববর্তী কেন্দ্র-রাজ্য কমিশনগুলোর উদ্ধৃতি দিয়ে এই কমিটি সংবিধান সংশোধন, রাজ্যপাল পদের অপব্যবহার, জিএসটি-পরবর্তী আর্থিক ভারসাম্যহীনতা, জম্মু ও কাশ্মীরের পুনর্গঠন এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ওপর ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের মতো কাঠামোগত উদ্বেগগুলো তুলে ধরেছে।

যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্য

যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা বা ফেডারেলিজম হলো এমন একটি দ্বৈত শাসনব্যবস্থা, যেখানে সংবিধান অনুযায়ী ক্ষমতা কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ এবং আঞ্চলিক রাজ্যগুলোর মধ্যে ভাগ করা থাকে। এটি রাজ্যগুলোর স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি একটি অভিন্ন কাঠামোর মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখে।

  1. দ্বৈত শাসনব্যবস্থা: সরকার দুটি স্তরে থাকে—কেন্দ্র এবং রাজ্য। প্রতিটি স্তর সংবিধান থেকে সরাসরি ক্ষমতা লাভ করে এবং নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কাজ করে।
  2. লিখিত এবং সর্বোচ্চ সংবিধান: সংবিধানই হলো দেশের সর্বোচ্চ আইন। কোনও পক্ষই যাতে অন্যের ওপর হস্তক্ষেপ করতে না পারে, তার জন্য সংবিধান স্পষ্টভাবে ক্ষমতার কাঠামো নির্ধারণ করে দেয়।
  3. ক্ষমতার বিভাজন: সংবিধানের সপ্তম তফশিল (Seventh Schedule) অনুযায়ী ক্ষমতা তিনটি তালিকায় বিভক্ত:
    1. কেন্দ্রীয় তালিকা: জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন বিষয় (যেমন—প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি)।
    1. রাজ্য তালিকা: আঞ্চলিক গুরুত্বসম্পন্ন বিষয় (যেমন—পুলিশ, কৃষি)।
    1. যুগ্ম তালিকা: যেখানে কেন্দ্র ও রাজ্য উভয়ই আইন করতে পারে (যেমন—শিক্ষা, বন)।
  4. স্বাধীন বিচার বিভাগ: সুপ্রিম কোর্ট এখানে “আম্পায়ার” হিসেবে কাজ করে। এটি কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যকার বিরোধ নিষ্পত্তি করে এবং সংবিধানের ব্যাখ্যা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রীয় ভারসাম্য রক্ষা করে।
  5. সংবিধানের অনমনীয়তা: যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে প্রভাবিত করে এমন বিষয়গুলো (যেমন—ধারা ৩৬৮) কেন্দ্র একতরফাভাবে পরিবর্তন করতে পারে না। এর জন্য সংসদে বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং অন্তত অর্ধেক রাজ্য বিধানসভার সমর্থন প্রয়োজন।
  6. দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা: সংসদে দুটি কক্ষ থাকে। রাজ্যসভা (উচ্চকক্ষ) জাতীয় স্তরে রাজ্যগুলোর স্বার্থ রক্ষা করে।

যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রকারভেদ

. কাঠামোগত মডেল:

  • সংহতিমূলক ফেডারেল ব্যবস্থা: একটি বড় দেশ যখন বৈচিত্র্য ও ঐক্য বজায় রাখতে নিজের ক্ষমতা রাজ্যগুলোর মধ্যে ভাগ করে দেয়।
    • উদাহরণ: ভারত, স্পেন, বেলজিয়াম।
  • সমবেত ফেডারেল ব্যবস্থা: স্বাধীন রাষ্ট্রগুলো যখন নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক শক্তি বাড়াতে স্বেচ্ছায় একটি বড় ইউনিয়ন গঠন করে।
    • উদাহরণ: আমেরিকা (USA), অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড।

. কার্যনির্বাহী শৈলী:

  • দ্বৈত যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা (Dual Federalism): কেন্দ্র ও রাজ্য একে অপরের কাজে হস্তক্ষেপ না করে নিজ নিজ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ক্ষমতা ভোগ করে।
  • সহযোগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা (Cooperative Federalism): কেন্দ্র ও রাজ্য সাধারণ লক্ষ্য অর্জনে একসাথে কাজ করে।
    • উদাহরণ: GST কাউন্সিল এবং NITI Aayog
  • প্রতিযোগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা (Competitive Federalism): বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং সুশাসনের উন্নতির জন্য রাজ্যগুলো একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতায় নামে।
    • উদাহরণ: SDG India Index বা ইজ অফ ডুইং বিজনেস র‍্যাঙ্কিং।
  • আর্থিক যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা (Fiscal Federalism): কেন্দ্র থেকে রাজ্যগুলোতে আর্থিক সম্পদ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া।
    • উদাহরণ: ধারা ২৮০ (অর্থ কমিশন)

. বিশেষ বিভাগ:

  • অপ্রতিসম যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা: সব রাজ্যের ক্ষমতা সমান নয়। ঐতিহাসিক বা সাংস্কৃতিক কারণে কিছু রাজ্যকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়। (যেমন—ধারা ৩৭১ থেকে ৩৭১জে)।
  • আধাযুক্তরাষ্ট্রীয় (Quasi-Federalism): কাঠামোগতভাবে ফেডারেল হলেও চরিত্রে এককেন্দ্রিক। পণ্ডিত কে.সি. হোয়ার (K.C. Wheare) ভারতকে এই নামে অভিহিত করেছেন।

ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রকৃতি

ভারতীয় সংবিধানে কোথাও ফেডারেশনশব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। ধারা ভারতকে রাজ্যসমূহের ইউনিয়ন” (Union of States) হিসেবে বর্ণনা করেছে।

১. আধাযুক্তরাষ্ট্রীয়” (Quasi-Federal) তকমা: ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রকৃতিকে সবচেয়ে ভালো ব্যাখ্যা করা হয় “Sui Generis” (অনন্য) হিসেবে। প্রখ্যাত পণ্ডিত কে.সি. হোয়ার (K.C. Wheare) ভারতকে আধাযুক্তরাষ্ট্রীয় বলেছেন, কারণ এটি এমন একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় রাষ্ট্র যেখানে কিছু এককেন্দ্রিক (Unitary) বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।

২. এককেন্দ্রিক ঝোঁক (শক্তিশালী কেন্দ্র): আমেরিকার মতো দেশগুলোর তুলনায় ভারতের কেন্দ্রের হাতে অনেক বেশি ক্ষমতা রয়েছে:

  • ধারা : সংসদ চাইলে রাজ্যগুলোর সম্মতি ছাড়াই তাদের সীমানা বা নাম পরিবর্তন করতে পারে।
  • অবশিষ্ট ক্ষমতা: এগুলো কেন্দ্রের হাতে ন্যস্ত থাকে (রাজ্যগুলোর হাতে নয়)।
  • জরুরি অবস্থা: জরুরি অবস্থার সময় যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো সম্পূর্ণ এককেন্দ্রিক রূপ নিতে পারে (ধারা ৩৫২, ৩৫৬, ৩৬০) ।
  • একক নাগরিকত্ব: ভারতে কেবল ভারতীয় নাগরিকত্বই আছে; আলাদা কোনও “রাজ্য নাগরিকত্ব” নেই।
  • সমন্বিত বিচার বিভাগ সর্বভারতীয় পরিষেবা: আইএএস (IAS)/আইপিএস (IPS) অফিসাররা কেন্দ্রের দ্বারা নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও রাজ্যগুলোতে কাজ করেন।

৩. যুক্তরাষ্ট্রীয় শক্তি (মৌলিক কাঠামো): কেন্দ্রের ক্ষমতা বেশি থাকলেও রাজ্যগুলো নিছক প্রশাসনিক এজেন্ট নয়:

  • এস.আর. বোম্মাই মামলা (১৯৯৪): সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল যে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ
  • স্বাধীন ক্ষমতা: সপ্তম তফশিলের রাজ্য তালিকা-র বিষয়গুলোতে রাজ্যগুলোর সর্বোচ্চ আইনি ক্ষমতা রয়েছে।
  • আর্থিক স্বায়ত্তশাসন: ধারা ২৮০ (অর্থ কমিশন) এবং ২৭৯এ (GST কাউন্সিল) রাজ্যগুলোর জন্য রাজস্বের একটি বাধ্যতামূলক অংশ নিশ্চিত করে।

ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়

প্রথম পর্যায়: একক দলের আধিপত্য (১৯৫০১৯৬৭)

  • কংগ্রেস ব্যবস্থা“: কেন্দ্র এবং প্রায় সব রাজ্যে একই দল ক্ষমতায় থাকায় এটি ছিল একটি কেন্দ্রীভূত এবং ঐক্যমত্য-ভিত্তিক ব্যবস্থা।
  • পরিকল্পনা কমিশন: কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মাধ্যমে রাজ্যের স্বায়ত্তশাসন কিছুটা হ্রাস পেয়েছিল।
  • প্রকৃতি: সহযোগিতামূলক কিন্তু কেন্দ্রের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

দ্বিতীয় পর্যায়: সংঘাতময় যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা (১৯৬৭১৯৮৯)

  • আঞ্চলিকতাবাদের উত্থান: বিভিন্ন রাজ্যে বিরোধী দলগুলোর ক্ষমতা দখল (যেমনতামিলনাড়ুতে ডিএমকে, পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট)।
  • ধারা ৩৫৬এর অপব্যবহার: কেন্দ্র প্রায়ই রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে রাজ্য সরকারকে বরখাস্ত করতে শুরু করে।
  • মূল উন্নয়ন: সংঘাত বৃদ্ধির ফলে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক পর্যালোচনার জন্য সরকারিয়া কমিশন (১৯৮৩) গঠন করা হয়।

তৃতীয় পর্যায়: বহুদলীয় / জোট সরকারের যুগ (১৯৮৯২০১৪)

  • আঞ্চলিক গুরুত্ব: জাতীয় সরকারগুলো টিকে থাকার জন্য আঞ্চলিক দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, ফলে ক্ষমতার ভারসাম্য রাজ্যগুলোর দিকে ঝুঁকে যায়।
  • এস.আর. বোম্মাই রায় (১৯৯৪): সুপ্রিম কোর্ট ধারা ৩৫৬-এর যথেচ্ছ ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
  • অর্থনৈতিক উদারীকরণ: রাজ্যগুলো স্বাধীনভাবে বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য প্রতিযোগিতা শুরু করে।

চতুর্থ পর্যায়: প্রভাবশালী দল এবং সহযোগিতামূলকপ্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা (২০১৪বর্তমান)

  • কাঠামোগত পরিবর্তন: পরিকল্পনা কমিশনের বদলে নীতি আয়োগ  গঠন (সহযোগিতামূলক ফেডারেলিজম)।
  • এক দেশ, এক কর: GST কার্যকর হওয়া এবং একটি সাংবিধানিক সংস্থা (GST কাউন্সিল) গঠন করা, যেখানে কেন্দ্র ও রাজ্য যৌথভাবে ভোট দেয়।
  • সংঘাতের বিন্দু: রাজ্যপালের ভূমিকা, কেন্দ্রীয় সংস্থা (ED/CBI)-র ব্যবহার এবং সেস সারচার্জ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক।

ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জসমূহ

) আর্থিক চ্যালেঞ্জ সংকুচিত তহবিল

  • সেস (Cess) এবং সারচার্জ: এগুলো বিভাজ্য তহবিলের অংশ নয়, অর্থাৎ রাজ্যগুলোর সাথে এগুলো ভাগ করা হয় না। ২০২৫-২৬ সালে এগুলো কেন্দ্রের মোট রাজস্বের প্রায় ১৮২০%
  • অর্থ কমিশন নিয়ে উত্তেজনা: দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোর দাবি, “আয় দূরত্ব” (Income Distance)-র মাপকাঠি তাদের অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সাফল্যের জন্য তাদেরই শাস্তি দিচ্ছে।
  • GST স্বায়ত্তশাসন: অধিকাংশ পরোক্ষ কর বসানোর ক্ষমতা হারিয়ে রাজ্যগুলো এখন কেন্দ্রের আর্থিক হস্তান্তরের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল।

) রাজ্যপালের কার্যালয়

  • সাংবিধানিক অচলাবস্থা: তামিলনাড়ু ও কেরালার মতো রাজ্যগুলোতে রাজ্যপালরা বিলে সই না করে অনির্দিষ্টকাল ফেলে রাখছেন (পকেট ভেটো)।
  • রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব: বিরোধী দল শাসিত রাজ্যগুলোতে রাজ্যপালকে প্রায়ই “কেন্দ্রের এজেন্ট” হিসেবে দেখা হচ্ছে।

) রাজ্যের বিষয়ে কেন্দ্রের হস্তক্ষেপ

  • যুগ্ম তালিকার বিস্তার: শিক্ষা ও কৃষির মতো বিষয়ে রাজ্যগুলোর সঙ্গে খুব একটা আলোচনা না করেই কেন্দ্র বেশি মাত্রায় আইন প্রণয়ন করছে।
  • কেন্দ্রীয় সংস্থা: ED, CBI, এবং NIA-কে “অস্ত্র” হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ তুলে অনেক রাজ্য (যেমনপশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু) সিবিআই-এর জন্য দেওয়া সাধারণ সম্মতি” (General Consent) প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

) প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়

  • নীতি আয়োগ: সাবেক পরিকল্পনা কমিশনের মতো নীতি আয়োগের হাতে রাজ্যগুলোকে মূলধনী অনুদান দেওয়ার আর্থিক ক্ষমতা নেই।
  • আন্তঃরাজ্য কাউন্সিল (ধারা ২৬৩): এই সাংবিধানিক বিরোধ নিষ্পত্তি সংস্থাটি খুব কমই বৈঠকে বসে, ফলে আলোচনার পথ রুদ্ধ হচ্ছে।

) নতুন উদীয়মান দ্বন্দ্ব (২০২৫২৬ প্রেক্ষাপট)

  • এক দেশ, এক নির্বাচন: আশঙ্কা করা হচ্ছে যে এতে জাতীয় ইস্যুগুলোর ভিড়ে আঞ্চলিক সমস্যাগুলো হারিয়ে যাবে এবং রাজ্য বিধানসভার নির্দিষ্ট মেয়াদ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
  • ডিলিমিটেশন বা সীমানা নির্ধারণের ভয়: জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল হওয়া রাজ্যগুলো (বিশেষ করে দক্ষিণ ভারত) ভয় পাচ্ছে যে পরবর্তী আদমশুমারির পর লোকসভায় তাদের আসন সংখ্যা কমে যেতে পারে।

ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পদক্ষেপ

. রাজ্যপালের কার্যালয় বা পদের সংস্কার

  • সময়সীমাবদ্ধ সিদ্ধান্ত: রাজ্য বিধানসভায় পাস হওয়া বিলগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য রাজ্যপালদের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা (যেমন৬ মাস) বেঁধে দেওয়ার যে সুপারিশ পুঞ্চি কমিশন করেছিল, তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
  • নিরপেক্ষ নিয়োগ: সরকারিয়া কমিশনের পরামর্শ অনুযায়ী নিশ্চিত করতে হবে যে, রাজ্যপাল যেন সংশ্লিষ্ট রাজ্যের বাইরের কোনও বিশিষ্ট ব্যক্তি হন এবং সাম্প্রতিক অতীতে সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থাকেন।

. আর্থিক যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সমাধান

  • সেস এবং সারচার্জ ভাগ করা: সংবিধান সংশোধন করে সেস (Cess) এবং সারচার্জ (Surcharge)-এর একটি অংশ রাজ্যগুলোর জন্য নির্ধারিত বিভাজ্য তহবিলের (Divisible Pool) অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
  • অনুদানের স্বায়ত্তশাসন: সাবেক পরিকল্পনা কমিশনের অভাব পূরণ করতে নীতি আয়োগ বা অনুরূপ কোনও সংস্থাকে রাজ্যগুলোকে সংবিধিবদ্ধ মূলধনী অনুদান দেওয়ার ক্ষমতা প্রদান করতে হবে।

. প্রাতিষ্ঠানিক পুনরুজ্জীবন

  • সক্রিয় আন্তঃরাজ্য কাউন্সিল (ধারা ২৬৩): যুগ্ম তালিকার অন্তর্ভুক্ত কোনো বিষয়ে বড় ধরনের নীতি পরিবর্তন বা বিল নিয়ে আলোচনার জন্য আন্তঃরাজ্য কাউন্সিলকে (Inter-State Council) একটি বাধ্যতামূলক ও স্থায়ী মঞ্চে পরিণত করতে হবে।
  • আঞ্চলিক কাউন্সিল (Zonal Councils): নির্দিষ্ট আঞ্চলিক সমস্যা এবং সীমানা বিরোধগুলো বড় আকার ধারণ করার আগেই সেগুলো সমাধানের জন্য নিয়মিত আঞ্চলিক কাউন্সিল-এর বৈঠক আয়োজন করতে হবে।

. পরামর্শমূলক আইন প্রণয়ন

  • যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রভাব মূল্যায়ন (Federal Impact Assessment): শিক্ষা বা কৃষির মতো যুগ্ম তালিকার বিষয়গুলোতে আইন প্রণয়নের আগে কেন্দ্রের উচিত রাজ্যগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করে একটি ফেডারেল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট পরিচালনা করা।
  • গণতান্ত্রিক সীমানা নির্ধারণ (Democratic Delimitation): ২০২৬ সালের সীমানা নির্ধারণ (Delimitation) প্রক্রিয়া নিয়ে দক্ষিণ ভারতের সফল রাজ্যগুলোর উদ্বেগ নিরসন করতে হবে, যাতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল হওয়ার কারণে তারা রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

উপসংহার

ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে অবশ্যই “আদেশ ও নিয়ন্ত্রণ” পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে একটি সহযোগিতামূলকপ্রতিযোগিতামূলক (Collaborative-competitive) মডেলে রূপান্তরিত হতে হবে। আন্তঃরাজ্য কাউন্সিলের মতো সাংবিধানিক সংস্থাগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করে এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে ভারত আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষা ও জাতীয় অখণ্ডতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে। এটি একটি স্থিতিস্থাপক, বিকেন্দ্রীকৃত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বিকশিত ভারত (Viksit Bharat) গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।