আদিবাসী নারীদের উত্তরাধিকার অধিকারের পুনর্মূল্যায়ন

রূপান্তরমূলক সাংবিধানিকতা (Transformative Constitutionalism) মৌলিক অধিকারের সাথে প্রথাগত রীতিনীতির সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করে। আদিবাসী নারীদের উত্তরাধিকার অধিকারের প্রেক্ষিতে এই উক্তিটি বিশ্লেষণ করুন। (২৫০ শব্দ, ১৫ নম্বর, GS-2, সামাজিক ন্যায়বিচার)

প্রেক্ষাপট

  • আদিবাসী সম্প্রদায়ের নারীদের উত্তরাধিকার অধিকারের বিষয়টি এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে। অধিকাংশ আদিবাসী প্রথাগত আইন নারীদের সম্পত্তির ওপর নিরঙ্কুশ অধিকার প্রদান করে না।
  • তাছাড়া, হিন্দু উত্তরাধিকার আইন, ১৯৫৬, যা কন্যাদের পৈতৃক সম্পত্তিতে সমান অধিকার দেয়, সেটি তফসিলি উপজাতিদের (Scheduled Tribes) ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এর ফলে আদিবাসী নারীরা এই আইনের সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হন।
  • তবে সাম্প্রতিককালে, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বিভিন্ন মামলায় দ্বিধা বিভক্ত অবস্থান নিয়েছে। কখনও ‘হিন্দুকরণ’ (Hinduisation)-এর ভিত্তিতে অধিকার দেওয়া হয়েছে, আবার কখনও সংবিধিবদ্ধ ছাড়ের (Statutory Exemptions) দোহাই দিয়ে অধিকার অস্বীকার করা হয়েছে।

প্রেক্ষাপট: হিন্দু উত্তরাধিকার আইন ও আদিবাসী বঞ্চনা

আদিবাসী নারীদের আইনি লড়াইয়ের প্রধান বাধা হলো হিন্দু উত্তরাধিকার আইন (HSA), ১৯৫৬-এর গঠনগত সীমাবদ্ধতা:

  • ধারা ২(১)-এর পরিধি: এই ধারা অনুযায়ী হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও শিখ ধর্মাবলম্বীরা এই আইনের আওতাভুক্ত। অতীতে আদালত অনেক সময় আদিবাসীদের ‘হিন্দু রীতিনীতি’ পালনের ভিত্তিতে এই আইনের অধীনে নিয়ে আসত, যাকে ‘হিন্দুকরণ’ বলা হয়।
  • ধারা ২(২)-এর বাধা: এটি একটি বিশেষ ধারা যা স্পষ্ট করে দেয় যে, ধারা ২(১)-এ যা-ই থাকুক না কেন, তফসিলি উপজাতিদের (ST) ওপর এই আইন কার্যকর হবে না (যদি না কেন্দ্র সরকার বিশেষ বিজ্ঞপ্তি জারি করে)।
  • ২০০৫ সালের সংশোধনীর প্রভাব: ২০০৫ সালে পৈতৃক সম্পত্তিতে কন্যাদের সমানাধিকার দেওয়া হলেও ধারা ২(২)-এর কারণে আদিবাসী নারীরা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত থেকে যান।
  • বৈষম্যমূলক পরিস্থিতি: এর ফলে একই অঞ্চলের একজন অ-আদিবাসী নারী আইনি সুরক্ষা পেলেও, একজন আদিবাসী নারী কেবল প্রথাগত আইনের ওপর নির্ভরশীল থাকেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই প্রথাগত আইন পুরুষতান্ত্রিক, যা জমি কেবল পুরুষ বংশধরদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চায়।

‘হিন্দু’র সংজ্ঞা ও ‘হিন্দুকরণ’-এর সমালোচনা

‘হিন্দু’ শব্দের কোনো নির্দিষ্ট বা কঠোর সংজ্ঞা না থাকায় আদিবাসীদের আইনি অবস্থান জটিল হয়ে পড়েছে:

  • আদালতের ব্যাখ্যা: ১৯৬৬ সালের একটি ঐতিহাসিক মামলায় সুপ্রিম কোর্ট হিন্দু ধর্মকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মের বদলে ‘জীবনযাপনের পদ্ধতি’ (Way of life) হিসেবে বর্ণনা করেছে।
  • পরিচয়ের সংকট: কোনো আদিবাসী ব্যক্তি যদি দীর্ঘকাল ধরে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ত্যাগ করে হিন্দু রীতিনীতি পালন করেন, তবেই তাকে হিন্দু হিসেবে গণ্য করা হয়।
  • আদিবাসীদের ওপর প্রভাব: এর ফলে আদিবাসী নারীদের সামনে একটি কঠিন শর্ত দাঁড়িয়ে যায়—হয় অর্থনৈতিক অধিকারের জন্য নিজের জাতিগত পরিচয় ত্যাগ করে ‘হিন্দু’ হতে হবে, অথবা নিজের পরিচয় বজায় রেখে ভূমিহীন থাকতে হবে।

বিচারবিভাগীয় হস্তক্ষেপ: দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন

সাম্প্রতিক রায়গুলোতে ‘রূপান্তরমূলক সাংবিধানিকতা’ (Transformative Constitutionalism)-এর মাধ্যমে আদিবাসী প্রথাগত আইনের সীমাবদ্ধতা দূর করার চেষ্টা করা হয়েছে।

  • সাম্যের নীতি (রাম চরণ বনাম সুখরাম, ২০২৫): আদালত স্বীকার করেছে যে, পৈতৃক সম্পত্তি থেকে কন্যাদের বঞ্চিত করা ধারা ১৪ (সাম্যের অধিকার) এবং ধারা ১৫(১) (বৈষম্যহীনতা)-এর পরিপন্থী। কোনো নির্দিষ্ট আইন না থাকলে ‘ন্যায়বিচার, সাম্য এবং শুদ্ধ বিবেক’-এর ভিত্তিতে নারীদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
  • আদালতের এক্তিয়ার পুনর্নির্ধারণ (নওয়াং বনাম বাহাদুর, ২০২৫): সুপ্রিম কোর্ট হিমাচল প্রদেশ হাইকোর্টের একটি রায় বাতিল করে স্পষ্ট জানায় যে, আদিবাসীদের ওপর জোর করে হিন্দু উত্তরাধিকার আইন (HSA) চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আদালতের নেই; এই দায়িত্ব কেবল সংসদের (Parliament)
  • নিজস্ব সত্তার সুরক্ষা: আদালত নিশ্চিত করেছে যে, কেন্দ্র সরকার নতুন কোনো নিয়ম জারি না করা পর্যন্ত আদিবাসীদের উত্তরাধিকার তাদের নিজস্ব প্রথাগত রীতিনীতি অনুসারেই চলবে। এর ফলে ‘হিন্দুকরণ’-এর মাধ্যমে অধিকার পাওয়ার অনিশ্চিত প্রথাটির অবসান ঘটেছে।

এর কৌশলগত গুরুত্ব: কেন এটি জরুরি?

আদিবাসী উত্তরাধিকার আইনের এই পুনর্মূল্যায়ন কেবল আইনি বিষয় নয়, এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী:

  • অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন: সম্পত্তির অধিকার থাকলে আদিবাসী নারীরা ঋণের জন্য বন্ধক রাখার সুযোগ পাবেন, যা তাঁদের উদ্যোক্তা হওয়া এবং আর্থিক স্বনির্ভরতায় সাহায্য করবে। এটি দারিদ্র্য বিমোচনে একটি সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করবে।
  • সামাজিক ন্যায়বিচার: এই আইনি সংস্কার আদিবাসী নারীদের “দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক” হিসেবে গণ্য হওয়ার গ্লানি থেকে মুক্তি দেবে এবং সংবিধান প্রদত্ত প্রকৃত সাম্য (Substantive Equality) নিশ্চিত করবে।
  • স্বকীয়তা বজায় রেখে উন্নয়ন: আদিবাসীদের ওপর জোর করে হিন্দু আইন না চাপিয়ে বরং তাদের জন্য পৃথক আইন তৈরির দাবি জানানো হয়েছে। এর ফলে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও পরিচয় অক্ষুণ্ণ রেখেই আধুনিকীকরণ সম্ভব হবে।

বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ: সংস্কারের পথে বাধা

বিচারবিভাগীয় তৎপরতা সত্ত্বেও আদিবাসী নারীদের উত্তরাধিকার নিশ্চিত করার পথে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে:

  • ভূমি বিচ্ছিন্ন হওয়ার ভয় (Land Alienation): পঞ্চম ও ষষ্ঠ তফসিলভুক্ত এলাকায় অনেক সম্প্রদায় আশঙ্কা করে যে, ভিন্ন জাতে বিয়ের মাধ্যমে জমি অ-আদিবাসীদের হাতে চলে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ছোটনাগপুর প্রথা (CNTSP Act, 1908) অনুযায়ী জমি কেবল পুরুষ বংশধরদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়।
  • অলিখিত আইন ও অনিশ্চয়তা: অলিখিত প্রথাগত আইন অনেক সময় পুরুষতান্ত্রিক প্রভাবশালীদের দ্বারা অপব্যাখ্যার শিকার হয়। যেমন, নাগাল্যান্ডের ধারা ৩৭১এ অনুযায়ী প্রতিটি গ্রামের ভিন্ন ভিন্ন প্রথা থাকতে পারে, যা প্রমাণ করা নারীদের জন্য অত্যন্ত কঠিন।
  • পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা: জমিকে কেবল ‘পুরুষের সম্পত্তি’ হিসেবে দেখার প্রবণতা এতটাই প্রবল যে, অনেক সময় আদালত থেকে অধিকার পেলেও সামাজিক চাপে নারীরা তা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। এটি সংবিধানের ধারা ২১ (মর্যাদার সাথে বাঁচার অধিকার)-এর পরিপন্থী।
  • আইনি শূন্যতা (Legal Limbo): ২০২৫ সালের রায়গুলোতে আদালত সাম্যের কথা বললেও সরাসরি হিন্দু উত্তরাধিকার আইন (HSA) আদিবাসীদের ওপর প্রয়োগ করতে নিষেধ করেছে। ফলে সংসদ নতুন আইন না করা পর্যন্ত আদিবাসী নারীরা এক ধরণের আইনি শূন্যতার মধ্যে রয়েছেন।
  • বাস্তবায়নের বৈষম্য: শিক্ষা ও সচেতনতার অভাবে গোণ্ড (Gond) বা ওরাওঁ (Oraon) সম্প্রদায়ের মতো এলাকাগুলোতে PESA বা গ্রামসভার মাধ্যমেও নারীদের অধিকার সঠিকভবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না।

উত্তরণের পথ: বৈষম্য দূর করার উপায়

সাংবিধানিক নৈতিকতা এবং আদিবাসী স্বায়ত্তশাসনের মধ্যে সমন্বয় আনতে একটি বহুমুখী কৌশল প্রয়োজন:

  • মিজোরাম মডেল অনুসরণ: ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা বা ছত্তিশগড়ের মতো রাজ্যগুলো মিজোরামের মতো নিজস্ব উত্তরাধিকার আইন তৈরি করতে পারে। যেখানে কন্যাদের অংশ দেওয়া হয়, আবার জমি যাতে অ-আদিবাসীদের হাতে না যায় তার সুরক্ষাকবচও থাকে।
  • সংসদীয় হস্তক্ষেপ: যেহেতু আদালত সরাসরি আইন প্রয়োগ করতে পারে না, তাই সংসদের উচিত ‘আদিবাসী উত্তরাধিকার আইন’ (Tribal Succession Act) প্রণয়ন করা। এটি ২০০৫ সালের হিন্দু আইনের সাম্য বজায় রাখবে কিন্তু আদিবাসীদের ভূমি মালিকানার ধরণকে (যেমন- FRA, 2006) শ্রদ্ধা জানাবে।
  • প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি বৃদ্ধি: জাতীয় তফসিলি উপজাতি কমিশন (NCST) এবং আদিবাসী উপদেষ্টা পরিষদগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। গ্রামীণ এলাকায় দ্রুত ন্যায়বিচারের জন্য ‘ফাস্ট-ট্র্যাক ট্রাইবাল কোর্ট’ তৈরি করা প্রয়োজন।
  • নীতিগত সমন্বয়: বন অধিকার আইন (FRA) এবং PESA-র অধীনে জমি বণ্টনের সময় বাধ্যতামূলকভাবে ‘জেন্ডার অডিট’ বা লিঙ্গভিত্তিক নিরীক্ষা করতে হবে যাতে নারীদের নাম নথিপত্রে থাকে।

উপসংহার

আদিবাসী নারীদের উত্তরাধিকার অধিকারের পুনর্মূল্যায়ন হলো প্রকৃত সাম্য (Substantive Equality) অর্জনের একটি ধাপ। আদিবাসীদের জোর করে ‘হিন্দু’ হিসেবে চিহ্নিত না করে বরং সংবিধানের ধারা ১৪ ও ১৫-কে তাদের প্রথাগত জীবনের সাথে যুক্ত করাই মূল লক্ষ্য। প্রকৃত ক্ষমতায়ন তখনই আসবে, যখন একজন আদিবাসী নারীকে তার পৈতৃক অধিকার পাওয়ার জন্য নিজের জাতিগত পরিচয় বিসর্জন দিতে হবে না

Latest Articles