ভারতের নারী কৃষক

“ভারতের কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থায় নারী কৃষকরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, তবুও নীতি নির্ধারণ এবং জমির মালিকানার ক্ষেত্রে তারা অনেকটা অদৃশ্যই থেকে গেছেন।” ভারতে নারী কৃষকদের প্রতিকূলতাগুলো পরীক্ষা করুন এবং তাদের ক্ষমতায়নের উপায় বাতলে দিন। (১৫ নম্বর, GS-3 কৃষি)

প্রেক্ষাপট

যেহেতু জাতিসংঘ ২০২৬ সালকে আন্তর্জাতিক নারী কৃষক বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছে, তাই এই নারী শ্রমিকদের দক্ষ ও ক্ষমতায়িত উদ্যোক্তায় রূপান্তরিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

কৃষিতে নারীদের বাস্তব চিত্র

  • শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ: গ্রামীণ ভারতের অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় নারীদের ৮০%-এরও বেশি কৃষিকাজে নিযুক্ত।
  • শ্রমের অবদান: বপন, আগাছা পরিষ্কার, ফসল কাটা এবং ফসল কাটার পরবর্তী ব্যবস্থাপনার মতো প্রায় ৭০% কৃষি কাজ নারীরাই করেন।
  • মালিকানার অভাব: কঠোর পরিশ্রম করা সত্ত্বেও, কৃষি শুমারি অনুযায়ী ভারতের মাত্র ১৩.৯% আবাদি জমির মালিকানা নারীদের হাতে রয়েছে।
  • উৎপাদনশীলতার সম্ভাবনা: FAO-এর মতে, পুরুষদের মতো নারীদেরও যদি উৎপাদনশীল সম্পদে সমান সুযোগ দেওয়া হয়, তবে তারা তাদের খামারের ফলন ২০–৩০% পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারেন।
  • FLFPR প্রবণতা: ২০২৫-২৬ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণের হার (FLFPR) বেড়ে ৪২% হয়েছে, যার প্রধান চালিকাশক্তি হলো গ্রামীণ কৃষিখাত।

ভারতে নারী কৃষকদের গুরুত্ব

১. পুষ্টি নিরাপত্তা ও SDG ২ (ক্ষুধামুক্তি)

নারীরা “পুষ্টি-সংবেদনশীল কৃষি” বা Nutrition-Sensitive Agriculture-কে অগ্রাধিকার দেন। বাণিজ্যিক চাষের বদলে নারী-পরিচালিত খামারগুলো বৈচিত্র্যময় খাদ্যশস্য চাষে মনোযোগ দেয়, যা সরাসরি গ্রামীণ পরিবারের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়।

  • উদাহরণ: পোষণ অভিযানের (POSHAN Abhiyaan) অধীনে পুষ্টি-বাগান” (Poshan Vatika) উদ্যোগ, যেখানে নারীরা শিশুদের অপুষ্টি ও রক্তাল্পতা দূর করতে শাকসবজি ও ফলমূল চাষ করেন।

২. জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও দেশীয় জ্ঞান

নারীরা ভারতের প্রধান বীজ রক্ষক”। তারা ঐতিহ্যবাহী বীজ নির্বাচন, সংরক্ষণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণে বিশেষজ্ঞ, যা উচ্চ-ফলনশীল বীজের চেয়ে অনেক বেশি সহনশীল।

  • উদাহরণ: রাহিবাই পোপেরে (ভারতের “বীজ মাতা” বা Seed Mother), যিনি শত শত দেশীয় বীজ সংরক্ষণ এবং ঐতিহ্যবাহী বীজ ব্যাংক তৈরির জন্য পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

৩. “প্রাকৃতিক কৃষিতে” (BPKP) নেতৃত্ব

নারীরা ভারতীয় প্রাকৃতিক কৃষি পদ্ধতির স্বাভাবিক পথপ্রদর্শক। গবাদি পশু পালনে তাদের প্রথাগত ভূমিকার কারণে তারা জিওয়ামৃত এবং ঘনজিওয়ামৃত-এর মতো জৈব সার ব্যবহারে অত্যন্ত দক্ষ।

  • উদাহরণ: অন্ধ্রপ্রদেশে ‘কমিউনিটি-ম্যানেজড ন্যাচারাল ফার্মিং’ (APCNF) মডেলটি সফল হয়েছে মূলত ৬০ লক্ষ নারীর অংশগ্রহণের কারণে, যারা ব্যয়বহুল রাসায়নিক সার ত্যাগ করে প্রাকৃতিক চাষ বেছে নিয়েছেন।

৪. গ্রামীণ কৃষি-পরবর্তী অর্থনীতির স্তম্ভ

নারীরা খামার এবং বাজারের মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করেন। তারা মূল্য সংযোজন” (Value Addition) কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেন, যা ফসলের অপচয় কমায় এবং খামারের আয় বৃদ্ধি করে।

  • উদাহরণ: মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রের নারী-চালিত FPO (কৃষক উৎপাদক সংস্থা), যারা কাঁচা মিলেটকে (Millet) সরাসরি খাওয়ার উপযোগী স্ন্যাকসে রূপান্তরিত করে মুনাফা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

৫. পুরুষদের “শহরমুখী অভিবাসনের” মোকাবিলা

কাজের সন্ধানে গ্রামীণ পুরুষরা শহরে চলে যাওয়ায়, নারীরা খামার ব্যবস্থার মূল পরিচালক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। এর ফলে জাতীয় খাদ্য উৎপাদন স্থিতিশীল থাকছে।

  • উদাহরণ: হিমালয় এবং বিহার অঞ্চলে, যেখানে পুরুষদের পরিযান সবথেকে বেশি, সেখানে নারীরাই জমি লাঙল দেওয়া থেকে ফসল তোলা পর্যন্ত সব দায়িত্ব পালন করে জমিকে পতিত হওয়া থেকে রক্ষা করছেন।

৬. প্রযুক্তিগত অগ্রণী ও ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি

নারীরা কৃষিতে “প্রযুক্তিগত বাধা” ভেঙে দিচ্ছেন এবং প্রমাণ করছেন যে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারে লিঙ্গ কোনও বাধা নয়।

  • উদাহরণ: নমো ড্রোন দিদি প্রকল্প, যেখানে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর (SHG) হাজার হাজার নারীকে ড্রোন চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা কীটনাশক ও সার ছিটানোর কাজে দক্ষ এগ্রি-টেকনিশিয়ান” হয়ে উঠছেন।

নারী কৃষকদের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ

১. জমির মালিকানা ও আইনি অদৃশ্যতা: পুরুষতান্ত্রিক উত্তরাধিকার ব্যবস্থার কারণে জমির মালিকানা মূলত পুরুষদের হাতে থাকে; নারীদের মালিকানায় মাত্র ১৪%-এরও কম আবাদি জমি রয়েছে। এই “কৃষক” স্বীকৃতির অভাবে তারা কঠোর পরিশ্রম করা সত্ত্বেও কেবল কৃষি শ্রমিক” হিসেবেই গণ্য হন।

২. ঋণ ও বীমা সুবিধা থেকে বঞ্চিত: ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলে জমির দলিল বন্ধক রাখা বাধ্যতামূলক (Collateral Barrier)। এর ফলে নারীরা প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ এবং প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনার মতো সরকারি নিরাপত্তা বলয় থেকে বঞ্চিত হন, যা তাদের চড়া সুদে মহাজনদের কাছে যেতে বাধ্য করে।

৩. প্রযুক্তিগত বৈষম্য ও শারীরিক কষ্ট: অধিকাংশ কৃষি যন্ত্রপাতি পুরুষদের শারীরিক গঠন অনুযায়ী তৈরি। নারীবান্ধব ও আরামদায়ক সরঞ্জামের অভাবে তাদের প্রচুর শারীরিক পরিশ্রম করতে হয়, যা দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি করে এবং উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয়।

৪. কাঠামোগত মজুরি বৈষম্য: অসংগঠিত কৃষি খাতে লিঙ্গভিত্তিক মজুরি বৈষম্য প্রবল। PLFS ২০২৫-২৬ এর তথ্য অনুযায়ী, একই পরিশ্রম করা সত্ত্বেও নারীরা পুরুষদের তুলনায় মাত্র ৭০-৮০% মজুরি পান।

৫. ডিজিটাল বিভাজন ও তথ্যের অভাব: স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সীমিত ব্যবহারের কারণে নারীরা আধুনিক চাষাবাদ এবং e-NAM-এর মতো ডিজিটাল বাজার থেকে দূরে থাকেন। কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণ ও সরকারি পরিষেবাগুলোও মূলত পুরুষকেন্দ্রিক হয়ে থাকে।

৬. সময়ের দারিদ্র্য (দ্বিমুখী বোঝা): গ্রামীণ নারীদের “ডাবল ডে” বা দ্বিমুখী পরিশ্রম করতে হয়। তারা কৃষি কাজের পাশাপাশি প্রতিদিন গড়ে ৩৬০ মিনিট ঘরের অবৈতনিক কাজ (রান্না, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা) করেন, যার ফলে তারা নতুন দক্ষতা শেখার বা বাজারে যাওয়ার সময় পান না।

নারী কৃষকদের জন্য প্রধান সরকারি উদ্যোগসমূহ

  1. নমো ড্রোন দিদি: নারী স্বনির্ভর গোষ্ঠীকে ৮০% ড্রোন ভর্তুকি (৮ লক্ষ টাকা পর্যন্ত) প্রদানের মাধ্যমে তাদের আধুনিক “এগ্রি-উদ্যোক্তা” হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।
  2. লখপতি দিদি মিশন: ২০২৯ সালের মধ্যে ৬ কোটি গ্রামীণ নারীকে বার্ষিক অন্তত ১ লক্ষ টাকা আয়ের স্তরে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
  3. কৃষি সখী প্রোগ্রাম (KSCP): নারীদের সার্টিফাইড প্যারা-এক্সটেনশন ওয়ার্কার হিসেবে প্রশিক্ষণ দিয়ে বার্ষিক ৬০,০০০–৮০,০০০ টাকা আয়ের পথ তৈরি করা।
  4. মহিলা কিষাণ সশক্তিকরণ পরিযোজনা (MKSP): প্রায় ৩.৫ কোটি নারীকে জলবায়ু-সহনশীল প্রাকৃতিক চাষাবাদে দক্ষ করে তোলা।
  5. জেম (GeM)-এ ওম্যানিয়া: নারী পরিচালিত ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলোকে সরাসরি সরকারি কেনাকাটার বাজারের সাথে যুক্ত করা, যেখানে ইতিমধ্যে ৮০,০০০ কোটি টাকার ওপর ক্রয়াদেশ নিশ্চিত হয়েছে।
  6. লিঙ্গ ভিত্তিক বাজেট ও বরাদ্দ: কৃষি প্রকল্পগুলোতে (RKVY/MIDH) ৩০% তহবিল নারীদের জন্য নির্দিষ্ট রাখা এবং কৃষি পরিকাঠামো তহবিলের (AIF) মাধ্যমে ৩% সুদে ছাড় প্রদান।

ভবিষ্যৎ পথ

১. নারী কৃষকের স্বীকৃতি: এম.এস. স্বামীনাথনের প্রস্তাবিত ২০১১ সালের নারী কৃষক এনটাইটেলমেন্ট বিল অনুযায়ী, জমির মালিকানা নির্বিশেষে চাষের কাজের ভিত্তিতে নারীদের “কৃষক” হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া।

২. জমির অধিকার শক্তিশালী করা: নারীদের নামে জমি রেজিস্ট্রি করলে স্ট্যাম্প ডিউটি মকুব (যেমন- ইউপি ও হরিয়ানা) এবং স্বামী-স্ত্রীর যৌথ মালিকানা উৎসাহিত করা।

৩. ঋণ ও সম্পদের সহজলভ্যতা: কোনো গ্যারান্টি ছাড়াই প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ দেওয়ার জন্য জয়েন্ট লায়াবিলিটি গ্রুপ (JLG) মডেলকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়া।

৪. নারী-কেন্দ্রিক কৃষি প্রতিষ্ঠান: মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট কমাতে এবং e-NAM প্ল্যাটফর্মে দর কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে নারী-পরিচালিত FPO (কৃষক উৎপাদক সংস্থা) শক্তিশালী করা।

৫. প্রযুক্তি ও পরিষেবা উন্নয়ন: ICAR-এর মতো সংস্থাগুলোর উচিত নারীদের শারীরিক গঠন উপযোগী হালকা ও আধুনিক কৃষি সরঞ্জাম (যেমন- পাওয়ার টিলার, উইডার) তৈরি করা।

৬. পুষ্টি-সংবেদনশীল কৃষি: ভারতের পুষ্টি নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় শ্রী অন্ন (মিলেট) চাষে নারীদের বিশেষ জ্ঞানকে কাজে লাগানো।

উপসংহার

ভূমি অধিকার এবং এগ্রি-টেক (Agri-Tech) এর মাধ্যমে নারী কৃষকদের ক্ষমতায়ন বিকশিত ভারত @২০৪৭ স্বপ্নের জন্য অপরিহার্য। ২০২৬ সালে তাদের নেতৃত্বকে সম্মান জানানোর পাশাপাশি ডিজিটাল ব্যবস্থায় তাদের অন্তর্ভুক্তি একটি জলবায়ু-সহনশীল ও খাদ্য-সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করবে।