প্রেক্ষাপট
সম্প্রতি, গবেষকরা মিশরের লাক্সর শহরের ভ্যালি অফ দ্য কিংস (রাজাদের উপত্যকা)-এর পাহাড় কেটে তৈরি করা সমাধিগুলোর ভেতরে ভারতীয় ভাষার প্রায় ৩০টি শিলালিপি খুঁজে পেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে তামিল ব্রাহ্মী (তামিলি), প্রাকৃত এবং সংস্কৃত লিপি। এই শিলালিপিগুলো খ্রিষ্টীয় ১ম থেকে ৩য় শতাব্দীর সমসাময়িক। এগুলো রোমান আমলের নীল নদ উপত্যকার হৃৎপিণ্ডে ভারতীয় বণিক এবং পর্যটকদের গভীর উপস্থিতির অকাট্য প্রমাণ দেয়। এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে ভারতীয়দের যাতায়াত কেবল উপকূলীয় বাণিজ্য কেন্দ্রগুলোতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা মিশরের মূল ভূখণ্ডের অনেক ভেতর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
আবিষ্কারের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ
১. ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রেক্ষাপট
- স্থান: শিলালিপিগুলো থিবান নেক্রোপলিস (ভ্যালি অফ দ্য কিংস)-এর ছয়টি পাহাড় কাটা সমাধিতে পাওয়া গেছে, যা একটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট।
- অবস্থানের গুরুত্ব: এর আগে মিশরের অধিকাংশ ভারতীয় শিলালিপি বেরেনিক এবং কুসেইর আল–কাদিম-এর মতো লোহিত সাগরের বন্দর শহরগুলোতে পাওয়া গিয়েছিল। নীল নদ উপত্যকায় এগুলো খুঁজে পাওয়ার অর্থ হলো—ভারতীয় ব্যবসায়ীরা কেবল বন্দরেই থাকতেন না, বরং তারা দর্শনীয় স্থান দেখা বা বাণিজ্যের প্রসারের জন্য মিশরের অনেক ভেতরে ভ্রমণ করতেন।
২. প্রধান শিলালিপি এবং পাঠোদ্ধার
- চিকাই কোররান (Cikai Korran): এই নামটি পাঁচটি ভিন্ন সমাধিতে মোট আটবার পাওয়া গেছে।
- ‘চিকাই‘ (Cikai) শব্দটি সংস্কৃত ‘শিখা‘ (চূড়া বা চুলের গুচ্ছ) শব্দের সাথে যুক্ত।
- ‘কোররান‘ (Korran) একটি স্বতন্ত্র তামিল নাম যা ‘কোররাম‘ (বিজয়) শব্দ থেকে এসেছে, যা প্রায়শই দেবী কোররাভাই-এর সাথে যুক্ত।
- কোপান ভারাতা কান্তান (Kopan Varata Kantan): আরেকটি শিলালিপির অনুবাদ হলো “কোপান এল এবং দেখল“। এটি একই সমাধিতে পাওয়া গ্রীক লিপির লিখনশৈলীর সাথে হুবহু মিলে যায়। এর থেকে বোঝা যায় যে দর্শনার্থীরা শিক্ষিত ছিলেন এবং সম্ভবত বহুভাষী ছিলেন।
- অন্যান্য নাম: শিলালিপিতে চাতান (Catan) এবং কিরান (Kiran)-এর মতো নামেরও উল্লেখ আছে, যা তামিল সঙ্গম সাহিত্যে অত্যন্ত পরিচিত।
৩. ভাষাগত এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব
- দ্বিমুখী বাণিজ্য: এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে বাণিজ্য কেবল রোমানদের ভারতে আসার একটি “একমুখী” প্রচেষ্টা ছিল না; বরং রোমান সাম্রাজ্যে ভারতীয় বণিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সরাসরি উপস্থিতি ছিল।
- লিপির বৈচিত্র্য: ২০টি শিলালিপি তামিল ব্রাহ্মী ভাষায় হলেও বাকিগুলো সংস্কৃত এবং প্রাকৃত ভাষায়। একটি সংস্কৃত শিলালিপিতে জনৈক ক্ষহরাত রাজার (পশ্চিমী ক্ষত্রপ) প্রেরিত দূত (Envoy)-এর উল্লেখ পাওয়া গেছে, যা পশ্চিম ভারত থেকে আসা সরকারি কূটনৈতিক বা বাণিজ্যিক মিশনের দিকে ইঙ্গিত করে।
- সময়কাল: খ্রিষ্টীয় ১ম থেকে ৩য় শতাব্দীর এই সময়কালটি সঙ্গম সাহিত্য এবং রোমান ঐতিহাসিক টলেমি ও প্লিনি দ্য এল্ডার-এর বর্ণনায় উল্লিখিত ভারত-রোমান বাণিজ্যের স্বর্ণযুগের সাথে নিখুঁতভাবে মিলে যায়।
৪. তুলনামূলক সারণী: মিশর এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রাপ্ত ভারতীয় শিলালিপি
| স্থানের নাম | অবস্থান | প্রধান আবিষ্কার | লিপি / ভাষা |
| ভ্যালি অফ দ্য কিংস | নীল নদ উপত্যকা, মিশর | সমাধির দেয়ালে খোদাই করা লিপি (চিকাই কোররান) | তামিল ব্রাহ্মী, প্রাকৃত, সংস্কৃত |
| বেরেনিক | লোহিত সাগর উপকূল, মিশর | মাটির পাত্রের টুকরো যেখানে ‘কোররাপুমান’ নাম আছে | তামিল ব্রাহ্মী |
| কুসেইর আল–কাদিম | লোহিত সাগর উপকূল, মিশর | মাটির আধার যেখানে ‘পানাই ওরি’ (দড়ির জালে রাখা পাত্র) লেখা আছে | তামিল ব্রাহ্মী |
| খোর রোরি (সুমহুরম) | ধোফার, ওমান | মাটির পাত্রের টুকরো যেখানে ‘নানতাই কিরান’ লেখা আছে | তামিল ব্রাহ্মী |
Q: মিশরের ভ্যালি অফ দ্য কিংস-এ সম্প্রতি আবিষ্কৃত তামিল ব্রাহ্মী শিলালিপি সম্পর্কে নিচের বিবৃতিগুলো বিবেচনা করুন:
1. এই শিলালিপিগুলো মিশরের লোহিত সাগরের বন্দর শহরগুলোতে ভারতীয় বণিকদের উপস্থিতির প্রথম প্রমাণ দেয়।
2. শিলালিপিগুলোতে 'চিকাই কোররান' নামটির উল্লেখ আছে, যা সংস্কৃত এবং তামিল উভয় ভাষার প্রভাব প্রদর্শন করে।
3. ক্ষহরাত রাজবংশের একজন দূতের উল্লেখ থাকা সংস্কৃত শিলালিপিটি পশ্চিম ভারত এবং রোমান-মিশরীয় অঞ্চলের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়।
ওপরের কোন বিবৃতিটি/বিবৃতিগুলো সঠিক?
a) কেবল 1 এবং 2
b) কেবল 2 এবং 3
c) কেবল 1 এবং 3
d) 1, 2 এবং 3
সঠিক উত্তর: (b)
সমাধান:
• বিবৃতি 1 ভুল: মিশরে (বেরেনিক এবং কুসেইর আল-কাদিম-এ) ভারতীয়দের উপস্থিতির প্রমাণ ১৯৯০-এর দশক থেকেই জানা ছিল। ভ্যালি অফ দ্য কিংস-এর এই আবিষ্কারটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি উপকূলীয় বন্দর নয়, বরং মিশরের অভ্যন্তরীণ নীল নদ উপত্যকায় অবস্থিত।
• বিবৃতি 2 সঠিক: 'চিকাই' শব্দটি সংস্কৃত 'শিখা' থেকে এসেছে এবং 'কোররান' একটি ধ্রুপদী তামিল নাম, যা ভ্রমণকারী সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাষাগত ঐতিহ্যের মিশ্রণ প্রমাণ করে।
• বিবৃতি 3 সঠিক: গবেষকরা একজন সংস্কৃত শিলালিপি শনাক্ত করেছেন যেখানে ক্ষহরাত রাজার একজন দূত (Envoy)-এর কথা বলা হয়েছে, যা নিশ্চিত করে যে খ্রিষ্টীয় ১ম শতাব্দীতে পশ্চিম ভারতের শাসকদের (ক্ষত্রপ) প্রতিনিধিরা মিশরে যেতেন।