এই নিবন্ধটি পড়ার পর আপনি UPSC-এর এই বিগত বছরের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন:
ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের পেছনে যে বাধ্যবাধকতাগুলো কাজ করেছিল, তা সমালোচনামূলকভাবে পরীক্ষা করুন। (২৫০ শব্দ, GS-2, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক)
প্রেক্ষাপট:
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি–র বিপুল জয় লাভের পর, ভারত এক বাস্তববাদী পদক্ষেপ বা ‘রিসেট’ শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী মোদীর পক্ষ থেকে তারেক রহমানের সাথে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপনের মূল লক্ষ্য হলো—শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে টানাপোড়েন এবং বাংলাদেশে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মাঝে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে স্থিতিশীল করা।
ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের ঐতিহাসিক পটভূমি:
১. স্বাধীনতার পর্যায় (১৯৭১–১৯৭৫)
- একটি জাতির জন্ম: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভারত প্রায় ১ কোটি মানুষকে আশ্রয় দেয় এবং মুক্তিবাহিনীকে সামরিক সহায়তা প্রদান করে।
- প্রাথমিক কাঠামো: ১৯৭২ সালের বন্ধুত্ব চুক্তি এবং ১৯৭৪ সালের সীমানা চুক্তির (LBA) মাধ্যমে ইন্দিরা গান্ধী ও শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করেন।
- আকস্মিক ছন্দপতন: ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড এই চমৎকার সূচনার অবসান ঘটায়।
২. কৌশলগত দূরত্ব ও সামরিক শাসন (১৯৭৫–১৯৯৬)
- একতরফা নিরপেক্ষতা: জিয়াউর রহমান এবং জেনারেল এরশাদের সামরিক আমল ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে সরে আসে এবং ভারতকে চাপে রাখতে চীন ও পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ হয়।
- নিরাপত্তা সংকট: এই সময়ে ভারত-বিরোধী প্রচার বৃদ্ধি পায় এবং বাংলাদেশের মাটি ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলী বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর (যেমন- ULFA) ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে।
৩. সম্পর্কের ‘সোনালী অধ্যায়’ (১৯৯৬–২০২৪)
- পানি ও নিরাপত্তা: ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি একটি বড় সাফল্য ছিল।
- হাসিনা আমল (২০০৯–২০২৪): এই সময়ে সম্পর্ক শীর্ষে পৌঁছায়।
- ২০১৫ সালের LBA বাস্তবায়ন: ১৬২টি ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের স্থল সীমান্ত সমস্যার সমাধান হয়।
- যোগাযোগের বিপ্লব: ১৯৬৫-পূর্ববর্তী রেল সংযোগগুলো পুনরায় চালু হয় এবং ভারতের জন্য চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়।
- সন্ত্রাসবাদে জিরো টলারেন্স: ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলী বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ঢাকার কঠোর অবস্থান আঞ্চলিক নিরাপত্তার চিত্র বদলে দেয়।
৪. বর্তমান সংকট ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন (২০২৪–২০২৬)
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সম্পর্কের সমীকরণ বদলে গেছে:
- ২০২৬–এর নির্বাচনের ফলাফল: ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমানের বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় নয়াদিল্লি দ্রুত সম্পর্ক স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। প্রধানমন্ত্রী মোদী প্রথম নেতাদের মধ্যে একজন ছিলেন যিনি রহমানকে অভিনন্দন জানান, যা ‘ব্যক্তি–কেন্দ্রিক’ কূটনীতি থেকে ‘রাষ্ট্র–কেন্দ্রিক’ কূটনীতিতে উত্তরণের সংকেত দেয়।
- প্রত্যর্পণ সমস্যা: ভারতের জন্য বড় অস্বস্তি হলো শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান। ঢাকার নতুন প্রশাসন জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ঘটনার জন্য তাঁর প্রত্যর্পণ এবং বিচার করা তাদের অন্যতম অগ্রাধিকার।
- নতুন শক্তির উত্থান: ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (NCP) এবং সীমান্ত এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর প্রভাব বৃদ্ধি উগ্রবাদ ও ‘ভারত–বিদ্বেষ’ নিয়ে নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
ভারত–বাংলাদেশ সহযোগিতার ক্ষেত্রসমূহ:
১. কানেক্টিভিটি: উত্তর–পূর্ব ভারতের ‘প্রবেশদ্বার’
- রেল সংযোগ: ১৯৬৫ সালের আগের ৮টি রেল সংযোগের মধ্যে ৬টি পুনরায় চালু করা হয়েছে। আখাউড়া–আগরতলা এবং হলদিবাড়ি–চিলাহাটি রুট ভারতের ‘চিকেন’স নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডোরের ওপর চাপ কমাবে।
- বন্দর সুবিধা: ২০২৩ সালের চুক্তি অনুযায়ী ভারত এখন উত্তর-পূর্ব ভারতে পণ্য পরিবহনের জন্য চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করতে পারছে, যা যাতায়াতের সময় ৬০% কমিয়ে দিয়েছে।
- অভ্যন্তরীণ জলপথ: গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদী ব্যবস্থার মাধ্যমে পণ্য পরিবহনের জন্য PIWTT চুক্তি কার্যকর রয়েছে।
২. অর্থনৈতিক সহযোগিতা: CEPA-র লক্ষ্য
- বাণিজ্যের পরিমাণ: দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার (প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার)।
- CEPA ২০২৬: ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ CEPA (Comprehensive Economic Partnership Agreement) চুক্তি চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উত্তরণ করবে, তখন SAFTA-র আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাবে—এই অভাব মেটাতে CEPA খুবই জরুরি।
- সীমান্ত হাট: এই স্থানীয় বাজারগুলো সীমান্ত অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে এবং চোরাচালান কমায়।
৩. জ্বালানি ও ডিজিটাল অংশীদারিত্ব
- মৈত্রী থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট: ভারতের NTPC এবং বাংলাদেশের BPDB-র যৌথ উদ্যোগে নির্মিত এই ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্রটি ২০২৬-এর শুরুতে পূর্ণ ক্ষমতায় চালু হয়েছে।
- জৈব জ্বালানি পাইপলাইন: শিলিগুড়ি থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত মৈত্রী পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশকে ডিজেল সরবরাহ করছে।
- মহাকাশ ও প্রযুক্তি: মৈত্রী স্যাটেলাইট এবং ভারতের UPI (ডিজিটাল পেমেন্ট) ব্যবস্থার সাথে বাংলাদেশের সমন্বয় এই নতুন যুগের বৈশিষ্ট্য।
৪. নিরাপত্তা ও পানি ব্যবস্থাপনা
- সীমান্ত নিরাপত্তা: অনুপ্রবেশ ও গবাদি পশু পাচার রোধে ৪,০৯৬ কিমি সীমান্ত জুড়ে ‘স্মার্ট ফেন্সিং’ এবং AI-চালিত নজরদারি চালু করা হচ্ছে।
- পানি বণ্টন: গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হবে; এটি নবায়ন করা এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনায় ভারত একটি কারিগরি দল পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে।
ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের সমস্যাসমূহ
১. ‘হাসিনা ফ্যাক্টর’ এবং প্রত্যর্পণ (Extradition)
- উভয়সংকট: ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপির বিজয়ের পর, ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনাকে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ বিচারের জন্য প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে।
- ভারতের অবস্থান: নয়াদিল্লি বর্তমানে একটি আইনি ও কূটনৈতিক উভয়সংকটে রয়েছে। ভারতকে একদিকে প্রত্যর্পণ চুক্তির বাধ্যবাধকতা রক্ষা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে ‘রাজনৈতিক অপরাধ’ সংক্রান্ত ছাড় এবং পুরনো মিত্রদের ক্ষেত্রে ভুল দৃষ্টান্ত স্থাপনের ঝুঁকি বিবেচনা করতে হচ্ছে।
২. পানি কূটনীতি: ২০২৬–এর সময়সীমা
- গঙ্গা পানি চুক্তি: ৩০ বছর মেয়াদী এই ঐতিহাসিক চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। চুক্তিটি নবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ বাংলাদেশের রিপোর্ট অনুযায়ী শুষ্ক মৌসুমে তারা গ্যারান্টিযুক্ত পানির হিস্যার মাত্র ৬৫% পেয়ে থাকে।
- তিস্তা অচলাবস্থা: পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণে এই চুক্তি এখনও স্থবির। এরই মধ্যে বাংলাদেশের সীমান্তে চীনের ১ বিলিয়ন ডলারের তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প ভারতের জন্য একটি বড় কৌশলগত উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৩. সীমান্ত সংঘাত ও ‘জিরো কিলিং’
- বিএসএফ–এর গুলি: ৪,০৯৬ কিলোমিটার সীমান্তে বিএসএফ-এর গুলিতে মৃত্যুর ঘটনা ঢাকার জন্য একটি অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ইস্যু। নতুন বিএনপি সরকার অভ্যন্তরীণ ভারত-বিদ্বেষ প্রশমিত করতে ‘মানবিক সীমান্ত’ এবং ‘শ্যুট-অন-সাইট’ (দেখামাত্র গুলি) নীতি বন্ধের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
- অবৈধ অভিবাসন: ভারতে এটি একটি প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে, বিশেষ করে ২০২৬ সালের মে মাসে অনুষ্ঠেয় আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে।
৪. চীন–পাকিস্তান কৌশলগত ঝোঁক
- প্রতিরক্ষা পরিবর্তন: বাংলাদেশ বর্তমানে JF-17 যুদ্ধবিমান (চীন-পাকিস্তান যৌথ উদ্যোগ) সংগ্রহের চেষ্টা করছে এবং ২০২৪ সালের নভেম্বরে করাচি ও চট্টগ্রামের মধ্যে সরাসরি নৌ-যোগাযোগ স্থাপন করেছে।
- অবকাঠামো: চীন এখনও বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার ($১৮ বিলিয়নের বেশি), এবং বর্তমান কূটনৈতিক শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে তারা তাদের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ কার্যক্রম আরও গভীর করছে।
৫. সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও পরিচয় ভিত্তিক রাজনীতি
- সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা: বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে ভারত তার উদ্বেগ বজায় রেখেছে। ঢাকা ভারতের এই সোচ্চার অবস্থানকে ‘অভ্যন্তরীণ হস্তক্ষেপ’ হিসেবে দেখছে, যার ফলে কূটনৈতিক শীতলতা বিরাজ করছে।
উত্তরণের উপায়
- বাস্তববাদী সম্পর্ক (Pragmatic De-hyphenation): দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কোনও নির্দিষ্ট নেতার ভাগ্যের সাথে না জুড়ে প্রতিষ্ঠান–কেন্দ্রিক করতে হবে। ২০২৬-এর বিএনপি সরকারের সাথে সমানভাবে কাজ করার পাশাপাশি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুটিকে একটি ‘বিশুদ্ধ আইনি ও বিচারিক’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।
- পানি ব্যবস্থাপনা ২.০: ২০২৬-এর গঙ্গা চুক্তি নবায়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। তিস্তা নদীর ক্ষেত্রে শুধু পানি বণ্টন নয়, বরং পুরো অববাহিকা ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা এবং যৌথ নদী ড্রেজিং-এর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
- অর্থনৈতিক সুরক্ষা (CEPA): বাংলাদেশ এলডিসি (LDC) থেকে উত্তরণ করার সাথে সাথে বাণিজ্য ধরে রাখতে CEPA (Comprehensive Economic Partnership Agreement) দ্রুত কার্যকর করতে হবে। ইউপিআই (UPI) এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করলে সাধারণ মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক বন্ধন মজবুত হবে।
- নিরাপত্তা ও ‘স্মার্ট সীমান্ত’: সীমান্ত হত্যা কমিয়ে আনতে মারণাস্ত্রের বদলে ‘স্মার্ট ফেন্সিং’ এবং এআই (AI) নজরদারি বাড়াতে হবে। একই সাথে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনে জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রাখতে হবে।
- প্রতিযোগিতামূলক অংশীদারিত্ব: চীনকে ঠেকাতে কেবল চাপ না দিয়ে, ভারতের পক্ষ থেকে প্রদত্ত ঋণ (Lines of Credit) আরও দ্রুত এবং স্বচ্ছভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
উপসংহার
ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ (Neighborhood First) নীতির সাফল্য নির্ভর করে একটি স্থিতিশীল এবং দল–নিরপেক্ষ অংশীদারিত্বের ওপর। CEPA ২০২৬ এবং ‘স্মার্ট সীমান্ত’ গড়ে তোলার মাধ্যমে নয়াদিল্লি বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতাকে কাটিয়ে একটি শক্তিশালী ও সংযুক্ত বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল নিশ্চিত করতে পারে।




