শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ: নিষেধাজ্ঞার বাইরে একটি স্বাস্থ্যকর ডিজিটাল পরিবেশের দিকে

Q. ভারতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শিশু সুরক্ষা ও ডিজিটাল অধিকারের মধ্যে বিদ্যমান টানাপোড়েন আলোচনা করুন। কীভাবে রাষ্ট্র একটি অধিকারভিত্তিক ও শিশু-কেন্দ্রিক ডিজিটাল শাসন কাঠামো নিশ্চিত করতে পারে? (২৫০ শব্দ, GS–১, সমাজ)

প্রেক্ষাপট

  • সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদে তিন বোনের মর্মান্তিক আত্মহত্যার ঘটনা কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। প্রাথমিক তদন্তে স্ক্রিন আসক্তি (অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার) এবং পারিবারিক কলহের বিষয়গুলি উঠে এসেছে, যার ফলে বিশ্বজুড়ে প্রচলিত বিভিন্ন উদাহরণের মতো ভারতেও সোশ্যাল মিডিয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার দাবি উঠছে।
  1. যাইহোক, এই ধরনের কঠোর বা একতরফা নীতি অনিচ্ছাকৃতভাবে নাবালকদের ডিজিটাল অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারে এবং প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকে তাদের কাঠামোগত দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তি দিয়ে দিতে পারে। তাই এখন সময় এসেছে একটি সুস্থ মিডিয়া বাস্তুতন্ত্র বা পরিবেশের দিকে নজর দেওয়ার।

সোশ্যাল মিডিয়ার দ্বিমুখী প্রভাব

      I.  শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ার সুফল

বৈধ উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও, একটি ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সমাজে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো  শিশুদের বিকাশ এবং সামাজিকীকরণের ক্ষেত্রে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা প্রদান করে:

  • তথ্য প্রাপ্তি এবং শিক্ষা: এটি গতানুগতিক শিক্ষার বাইরেও বিভিন্ন শিক্ষামূলক কন্টেন্ট, নতুন দক্ষতা অর্জনের উপায় এবং সম্মিলিতভাবে শেখার সুযোগ তৈরি করে দেয়।
  • সৃজনশীল প্রকাশ: এটি শিল্পকলা, সাহিত্য, সংগীত এবং উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা প্রকাশের একটি পথ খুলে দেয়, যা শিশুদের কল্পনাশক্তি, আত্মবিশ্বাস এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
  • সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং সহায়তা: এটি প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলোর জন্য (যেমন- LGBTQIA+ তরুণ-তরুণী, প্রতিবন্ধী শিশু এবং প্রত্যন্ত বা সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের শিশু) একটি লাইফলাইন হিসেবে কাজ করে। এটি এমন এক সহমর্মী নেটওয়ার্ক তৈরি করে যা অফলাইনে হয়তো পাওয়া সম্ভব হয় না।
  • ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধি: অল্প বয়স থেকে এই মাধ্যমগুলোর সাথে যুক্ত থাকলে শিশুদের মিডিয়া সাক্ষরতা, যোগাযোগের দক্ষতা এবং প্রয়োজনীয় ডিজিটাল দক্ষতা তৈরি হয়, যা ভবিষ্যতে তাদের কর্মসংস্থানের জন্য অপরিহার্য।
  • নাগরিক এবং সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণ: এটি শিশুদের বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড, সচেতনতামূলক অভিযান এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ে অংশ নিতে উৎসাহিত করে, যা তাদের একজন সচেতন ডিজিটাল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে।
  • সামাজিক গতিশীলতা এবং লিঙ্গ সাম্য: সোশ্যাল মিডিয়া তথ্য ও সুযোগের পরিধি বাড়িয়ে দেয়, যা বিশেষ করে মেয়েদের জন্য খুব উপকারী।
    • তথ্য: ভারতের ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে (NSS) অনুযায়ী, ভারতে মাত্র ৩৩.৩% নারী ইন্টারনেট ব্যবহার করেছেন, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৫৭.১%

II. শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজনীয়তা

শিশুদের গঠনমূলক বয়সে স্বাস্থ্য, আচরণ এবং নিরাপত্তার ওপর সোশ্যাল মিডিয়ার বহুমুখী প্রভাবের কারণে এটি নিষিদ্ধ বা সীমিত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

  • জ্ঞানীয় কার্যকারিতার ওপর প্রভাব: অতিরিক্ত সময় স্ক্রিনে ব্যয় করার ফলে মনোযোগের অভাব, একাগ্রতা হ্রাস এবং তথ্য মনে রাখার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেয়, যা সরাসরি শিক্ষাগত পারফরম্যান্সের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
  • মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি: দীর্ঘসময় ধরে আসক্তিমূলক ব্যবহারের ফলে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, হীনম্মন্যতা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা হ্রাস পায়। এছাড়া ADHD-এর মতো মনোযোগজনিত ব্যাধিও বৃদ্ধি পায়।
  • শারীরিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি: আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপিত কন্টেন্ট দীর্ঘক্ষণ দেখার ফলে শারীরিক পরিশ্রমহীন জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাসে অনিয়ম এবং নিজের শরীর সম্পর্কে অবাস্তব ধারণা তৈরি হয়। এটি ঘুমের ব্যাঘাত, স্থূলতা এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যার জন্ম দেয়।
  • সামাজিক বিকাশে বাধা: ভার্চুয়াল কথোপকথনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা সরাসরি কথা বলার প্রবণতা কমিয়ে দেয়, যার ফলে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং আবেগীয় ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়।
  • অনলাইন নিরাপত্তা ও শিশুসুরক্ষার ঝুঁকি: শিশুরা ক্রমশ সাইবার বুলিং (অনলাইনে হেনস্থা), যৌন শোষণ এবং বয়স-অনুপযোগী বা ক্ষতিকর কন্টেন্টের শিকার হওয়ার ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
  • বিপজ্জনক ভাইরাল ট্রেন্ডের প্রভাব: অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ঝুঁকিপূর্ণ চ্যালেঞ্জসমূহ (যেমন দম আটকে রাখা বা অপরাধমূলক প্রবণতা) শিশুদের শারীরিক ক্ষতি এবং আইনি সমস্যার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
  • অপর্যাপ্ত অভিভাবকীয় তত্ত্বাবধান: শহুরে এবং কর্মজীবী বাবা-মায়ের পরিবারে শিশুদের ওপর নজরদারি সীমিত হওয়ায় অনিয়ন্ত্রিত স্ক্রিন টাইম বৃদ্ধি পেয়েছে, যা শৈশবকে ডিভাইস-নির্ভর করে তুলছে।
  • অ্যালগরিদম-চালিত আসক্তি: সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমগুলো এমনভাবে তৈরি যা ব্যবহারকারীকে বেশিক্ষণ আটকে রাখে। এটি শিশুদের পক্ষে ফোন থেকে দূরে থাকা কঠিন করে তোলে এবং আসক্তি বাড়ায়।

শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ

স্ট্যানলি কোহেনের ‘মোরাল প্যানিক’ ধারণা অনুযায়ী, এ ধরনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে “অশুভ শক্তি” হিসেবে চিহ্নিত করে নিয়ন্ত্রণের একটি মিথ্যা আশ্বাস তৈরি করে। এটি মূলত শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণের কাঠামোগত অভাব থেকে নজর ঘুরিয়ে দেয়। এর চ্যালেঞ্জগুলো বিভিন্ন দিক থেকে প্রকাশ পায়:

  • বয়স যাচাইকরণ এবং গোপনীয়তা সংক্রান্ত উদ্বেগ: নির্ভরযোগ্য বয়স যাচাইকরণ ব্যবস্থা না থাকায় শিশুরা VPN বা অন্য উপায়ে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যায়। সরকারি পরিচয়পত্র বা বায়োমেট্রিক যাচাইকরণের মতো পদক্ষেপগুলো ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
  • অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা: ঢালাও নিষেধাজ্ঞা জারি করলে গেম বা যোগাযোগের প্ল্যাটফর্মগুলোও (যেমন PUBG বা Instagram) এর আওতায় চলে আসতে পারে, যা সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য অপ্রয়োজনীয় বাধা সৃষ্টি করবে।
  • অনিরাপদ অনলাইন প্ল্যাটফর্মে চলে যাওয়া: যেহেতু নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা কঠিন, তাই শিশুরা আরও অনিয়ন্ত্রিত এবং এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্ম বা ‘ডার্ক ওয়েব’-এ চলে যেতে পারে, যা তাদের ক্ষতির ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
  • অধিকার-সংক্রান্ত উদ্বেগ এবং বঞ্চনা: নিষেধাজ্ঞা জারি করলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং তথ্য পাওয়ার অধিকার ক্ষুণ্ণ হতে পারে। এটি বিশেষ করে প্রান্তিক গোষ্ঠী বা LGBTQIA+ তরুণদের ওপর প্রভাব ফেলে যারা অনলাইনের সহায়তামূলক নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল।
  • ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনে বাধা: অ্যাক্সেস সীমিত করলে সৃজনশীলতা, শিক্ষামূলক সহযোগিতা এবং আগ্রহ-ভিত্তিক শিক্ষা বাধাগ্রস্ত হয়, যা ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় ডিজিটাল দক্ষতা তৈরির প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দেয়।

ভারতে ঢালাও নিষেধাজ্ঞা কেন কার্যকর হবে না

বিদেশের অনুকরণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা ভারতের অনন্য সামাজিক ও প্রযুক্তিগত প্রেক্ষাপটকে উপেক্ষা করে, যা গণতান্ত্রিক ঘাটতি এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতির কারণ হতে পারে।

  • প্রযুক্তিগত ছিদ্র: ভারতের বিশাল ডিজিটাল জনসংখ্যার কারণে এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা অবাস্তব।
  • প্রেক্ষাপটের বৈচিত্র্য: সব ক্ষেত্রে একই নীতি প্রয়োগ করলে ভারতের শ্রেণি, জাতি, লিঙ্গ এবং আঞ্চলিক বৈচিত্র্য উপেক্ষিত হয়।
  • গণতান্ত্রিক ঘাটতি: শিশুদের সাথে পরামর্শ না করেই প্রায়শই নীতি নির্ধারণ করা হয়, যা তাদের নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে (agency) অবজ্ঞা করে।
  • প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা: নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর কাছে নিয়ম মানার বিষয়টি কার্যকরভাবে তদারকি করার মতো প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাব রয়েছে।
  • রাষ্ট্রের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের ঝুঁকি: সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের সাথে পরিচয়পত্র যাচাইকরণ যুক্ত করলে তা নাগরিক স্বাধীনতাকে সংকুচিত করতে পারে।

অনলাইন প্ল্যাটফর্মে শিশুদের সুরক্ষায় ভারতের উদ্যোগ

ভারত প্রতিরোধ, সম্মতি এবং প্রয়োগের ওপর জোর দিয়ে একটি বহুমুখী কাঠামো তৈরি করেছে।

  • ডিজিটাল পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন অ্যাক্ট, ২০২৩: ১৮ বছরের কম বয়সীদের তথ্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য অভিভাবকদের যাচাইযোগ্য সম্মতি বাধ্যতামূলক করে।
  • আইটি (IT) আইন ২০০০, ধারা ৬৭বি: শিশুদের যৌন নির্যাতনমূলক কন্টেন্ট (CSAM) প্রকাশ, প্রচার বা দেখার জন্য কঠোর শাস্তির বিধান দেয়।
  • শিশুদের জন্য জাতীয় কর্মপরিকল্পনা, ২০১৬: যৌন অপরাধকে অগ্রাধিকার দিয়ে অপরাধ প্রতিরোধের লক্ষ্য নির্ধারণ করে।
  • পকসো (POCSO) আইন, ২০১২: ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের শোষণ থেকে রক্ষা করে এবং শিশু-কেন্দ্রিক বিচার ব্যবস্থা নিশ্চিত করে।
  • NCPCR-এর কার্যপদ্ধতি: দ্রুত প্রতিকারের জন্য ‘ন্যাশনাল কমিশন ফর প্রোটেকশন অফ চাইল্ড রাইটস’ অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থা পরিচালনা করে।
  • UNCRC (১৯৯০) অনুসমর্থন: অনলাইনে এবং অফলাইনে শিশুদের অধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সুরক্ষাকে উৎসাহিত করে।

শিশুদের সুরক্ষায় বিশ্বজুড়ে নেওয়া পদক্ষেপ

  • অস্ট্রেলিয়া: ১৬ বছরের কম বয়সীদের ১০টি প্রধান সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে (ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, ইউটিউব, স্ন্যাপচ্যাট, এক্স ইত্যাদি) অ্যাকাউন্ট খোলা নিষিদ্ধ করে আইন পাস করেছে। বয়স যাচাইকরণ এবং ৫০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার পর্যন্ত জরিমানার মাধ্যমে এটি কার্যকর করা হচ্ছে।
  • জার্মানি এবং ফ্রান্স: অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য অভিভাবকদের সম্মতির বয়সসীমা বাড়িয়েছে।
  • মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র: ‘কিডস অনলাইন সেফটি অ্যাক্ট’ গোপনীয়তা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়ে শিশুদের সুরক্ষা প্রদান করে।
  • যুক্তরাজ্য: ‘অনলাইন সেফটি অ্যাক্ট, ২০২৩’ ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য কঠোর মানদণ্ড এবং উপযুক্ত বয়সসীমা নির্ধারণ করেছে।
  • নেদারল্যান্ডস এবং দক্ষিণ কোরিয়া: শ্রেণিকক্ষে মোবাইল ফোনের ব্যবহার নিষিদ্ধ বা সীমিত করেছে।

ভবিষ্যতের পথনির্দেশ

  • শিশু-কেন্দ্রিক ডিজিটাল শাসন কাঠামো: রাষ্ট্র, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত প্রচেষ্টায় বয়স-উপযোগী ডিজাইন, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা (Privacy-by-default) এবং অ্যালগরিদমের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের ‘Age-Appropriate Design Code’ থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে।
  • অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ: চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮-এর পরিধি বাড়ানো, সাইবার নোডাল অফিসারদের প্রশিক্ষণ এবং অনলাইন নির্যাতনের দ্রুত অভিযোগ জানাতে ‘POCSO e-Box’-এর মতো ডিজিটাল প্যানিক বোতামের ব্যবহার আরও জনপ্রিয় করতে হবে।
  • ডিজিটাল দক্ষতা ও শিক্ষার প্রসার: স্কুল পর্যায় থেকে ডিজিটাল সাক্ষরতা, অনলাইনে দায়িত্বশীল আচরণ এবং আত্ম-নিয়ন্ত্রণের শিক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। স্ক্রিন আসক্তি কাটাতে কেরালার ‘ডিজিটাল ডি-অ্যাডিকশন (D-DAD)’ কেন্দ্রের মতো মডেল সারা দেশে অনুসরণ করা যেতে পারে।
  • সচেতনতামূলক অভিযান: ‘নিপুণ ভারত’ (NIPUN Bharat) এবং ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’র মতো সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে অভিভাবক ও শিক্ষকদের অনলাইন ঝুঁকি শনাক্ত ও তা মোকাবিলা করার জন্য সচেতন করতে হবে।
  • অভিভাবকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও নিয়ন্ত্রণ: শিশু ও অভিভাবকের যৌথ অ্যাকাউন্ট পরিচালনা এবং ‘গুগল ফ্যামিলি লিঙ্ক’-এর মতো অ্যাপের মাধ্যমে স্ক্রিন-টাইম নিয়ন্ত্রণ ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে উৎসাহ দিতে হবে।
  • প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর দায়বদ্ধতা: প্ল্যাটফর্মগুলোকে ব্যবহারকারীর সুরক্ষায় বিশেষ আইনি বাধ্যবাধকতার (Duty of care) আওতায় আনতে হবে। আইটি মন্ত্রকের (MeitY) বাইরে একটি স্বতন্ত্র নিয়ন্ত্রক সংস্থার মাধ্যমে তদারকি বাড়াতে হবে (যেমনটা বর্তমানে মেটা-র ১৩+ বয়সসীমা নীতিতে রয়েছে)।

উপসংহার

নিষেধাজ্ঞা কেবল নিয়ন্ত্রণের একটি ভ্রান্ত আশ্বাস দেয়, যা সোশ্যাল মিডিয়ার দ্বিমুখী সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করে ডিজিটাল অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করে। প্রকৃত সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, স্থানীয় পর্যায়ে গবেষণা, তরুণদের অন্তর্ভুক্ত করে নীতি নির্ধারণ এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করা—যাতে প্রযুক্তি-নির্ভর বিশ্বে শিশুদের সহনশীলতা বৃদ্ধি পায়। এই ভারসাম্যপূর্ণ বাস্তুতন্ত্র ভারতের সংবিধানের সেই আদর্শের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, যা স্বাধীনতা বিসর্জন না দিয়েই তরুণ সমাজকে শক্তিশালী করতে চায়।