ভারতে শৈশব স্থূলতার ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা

ক্রমবর্ধমান শৈশব স্থূলতা খাদ্য ব্যবস্থা, নগরায়ন এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত গভীর কাঠামোগত সমস্যাগুলিকে প্রতিফলিত করে। সমালোচনামূলকভাবে পরীক্ষা করুন। (১৫ নম্বর, জিএস-২, সামাজিক ন্যায়বিচার)

প্রাসঙ্গিকতা

  • ওয়ার্ল্ড ওবেসিটি ফেডারেশন (World Obesity Federation) সম্প্রতি ‘ওয়ার্ল্ড ওবেসিটি অ্যাটলাস ২০২৬’ প্রকাশ করেছে, যা বিশ্বজুড়ে এবং বিশেষ করে ভারতে শৈশব স্থূলতার দ্রুত বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরেছে।
  • ‘ওয়ার্ল্ড ওবেসিটি অ্যাটলাস ২০২৬’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্চ বডি মাস ইনডেক্স (BMI) সম্পন্ন শিশুদের সংখ্যার বিচারে চীনের পরেই ভারত বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে।
  • বর্তমানে লক্ষ লক্ষ শিশু এই সমস্যায় আক্রান্ত এবং ২০৪০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। শৈশব স্থূলতা একটি প্রধান জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে অসংক্রামক ব্যাধি (NCDs), অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা এবং জনতাত্ত্বিক লভ্যাংশের (Demographic Dividend) ওপর।

শৈশব স্থূলতা অনুধাবন

ক. স্থূলতার সংজ্ঞা (Definition of Obesity)

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, স্থূলতা হলো একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং পুনরাবৃত্তিমূলক রোগ, যা অস্বাভাবিক বা অতিরিক্ত চর্বি জমার দ্বারা চিহ্নিত হয় এবং যা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।

খ. পরিমাপ: বডি মাস ইনডেক্স (BMI)

  • BMI = ওজন (কেজি) / উচ্চতা² (মিটার²)
  • এটি প্রাপ্তবয়স্ক এবং শিশু উভয়ের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ওজন (Overweight) এবং স্থূলতা (Obesity) শ্রেণীবদ্ধ করতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

গ. শিশুদের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) বৃদ্ধির মানদণ্ড (৫–১৯ বছর)

  • অতিরিক্ত ওজন (Overweight): BMI যখন WHO নির্ধারিত মধ্যক (Median) থেকে ১ স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশনের বেশি হয়।
  • স্থূলতা (Obesity): BMI যখন WHO নির্ধারিত মধ্যক থেকে ২ স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশনের বেশি হয়।
  • সারসংক্ষেপ: শৈশব স্থূলতা বলতে শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমা হওয়াকে বোঝায়, যা স্বাস্থ্যের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে।

ওয়ার্ল্ড ওবেসিটি অ্যাটলাস ২০২৬: প্রধান তথ্যসমূহ

ক. বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট প্রাদুর্ভাব: ৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে স্থূলতার হার ১৯৭৫ সালের ৪% থেকে বেড়ে ২০২২ সালে প্রায় ২০%-এ দাঁড়িয়েছে।

  • আক্রান্ত অঞ্চল: স্থূলতায় আক্রান্ত শিশুদের অধিকাংশ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলিতে বসবাস করে।
  • শীর্ষ দেশসমূহ: মাত্র দশটি দেশেই উচ্চ BMI সম্পন্ন ২০০ মিলিয়নেরও বেশি শিশু রয়েছে, যার নেতৃত্বে রয়েছে চীন, ভারত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
  • দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব: শৈশব স্থূলতা প্রায়শই প্রাপ্তবয়স্ক বয়স পর্যন্ত বজায় থাকে, যা ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং নির্দিষ্ট কিছু ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক ব্যাধির (NCDs) ঝুঁকি বাড়ায়।

খ. ভারতীয় প্রেক্ষাপট

ভারত বর্তমানে একটি দ্রুত পুষ্টিগত পরিবর্তনের (Nutritional Transition) মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে পুষ্টিহীনতা এবং স্থূলতা—এই দ্বিমুখী পুষ্টিজনিত সংকটের (Double Burden of Malnutrition) সৃষ্টি হয়েছে।

১. বর্তমান পরিসংখ্যান (২০২৫)

  • ৫–৯ বছর বয়সী ১৪.৯ মিলিয়ন শিশু অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্ত।
  • ১০–১৯ বছর বয়সী ২৬.৪ মিলিয়ন কিশোর-কিশোরী অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্ত।
  • সর্বমোট ৪১ মিলিয়ন শিশুর BMI উচ্চ মাত্রায় রয়েছে।

২. স্বাস্থ্য নির্দেশক

  • ৮.৩৯ মিলিয়ন শিশুর BMI-জনিত কারণে লিভারের সমস্যা বা মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ (MASLD) দেখা দিয়েছে।
  • ২.৯৮ মিলিয়ন শিশু উচ্চ BMI-সংক্রান্ত উচ্চরক্তচাপে (Hypertension) ভুগছে।

৩. ২০৪০ সালের পূর্বাভাস

  • ২০ মিলিয়ন শিশুর স্থূলতায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
  • ৫৬ মিলিয়ন শিশু অতিরিক্ত ওজন সম্পন্ন হতে পারে।
  • ১২০ মিলিয়ন স্কুলগামী শিশুর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী রোগের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে:
    • উচ্চরক্তচাপ (Hypertension)
    • হৃদরোগ (Cardiovascular diseases)
    • ডায়াবেটিস (Diabetes)

শিশু পুষ্টিতে বৈশ্বিক পরিবর্তন: শৈশব স্থূলতার ক্রমবর্ধমান প্রবণতা

ইউনিসেফ (UNICEF)-এর ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে শিশুদের পুষ্টির ধরণ এক বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রথমবারের মতো, স্থূলতায় (Obesity) আক্রান্ত শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের অনুপাত কম ওজনের (Underweight) শিশুদের ছাড়িয়ে গেছে।

ক. ভারতে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার ক্রমবর্ধমান প্রাদুর্ভাব (NFHS-3 থেকে NFHS-5)

জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষার (National Family Health Survey) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫-০৬ (NFHS-3) থেকে ২০১৯-২১ (NFHS-5)-এর মধ্যে বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার হার ক্রমাগত বেড়েছে:

  • পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু: প্রাদুর্ভাব ১.৫% থেকে বেড়ে ৩.৪% হয়েছে।
  • কিশোরী মেয়ে: ২.৪% থেকে বেড়ে ৫.৪% হয়েছে।
  • কিশোর ছেলে: ১.৭% থেকে বেড়ে ৬.৬% হয়েছে।
  • প্রাপ্তবয়স্ক নারী: প্রাদুর্ভাব প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ১২.৬% থেকে ২৪.০% হয়েছে।
  • প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ: ৯.৩% থেকে বেড়ে ২২.৯% হয়েছে।

খ. ইউনিসেফ (UNICEF) প্রতিবেদনের প্রধান তথ্যসমূহ

  • ৫-১৯ বছর বয়সী শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে স্থূলতার হার (৯.৪%) বর্তমানে কম ওজনের হারের (৯.২%) চেয়ে কিছুটা বেশি, যা অপুষ্টির ধরণের পরিবর্তনকে প্রতিফলিত করে।
  • ২০০০ সাল থেকে, এই বয়সী শিশুদের মধ্যে স্থূলতা তিনগুণ বেড়েছে (৩% থেকে ৯.৪%), যেখানে কম ওজনের হার ১৩% থেকে কমে ৯.২% হয়েছে।
  • বিশ্বব্যাপী, ৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ৫% শিশু এবং ৫-১৯ বছর বয়সী ২০% শিশু ও কিশোর-কিশোরী অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্ত।
  • অতিরিক্ত ওজনের প্রাদুর্ভাবের সবচেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলিতে, যা দ্রুত পুষ্টিগত রূপান্তরকে নির্দেশ করে।
  • সাব-সাহারান আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়া ব্যতীত বিশ্বের বেশিরভাগ অঞ্চলে স্থূলতার হার কম ওজনের হারকে ছাড়িয়ে গেছে; তবে এই দুই অঞ্চলে এখনও কম ওজন বা পুষ্টিহীনতা একটি বড় সমস্যা।

শৈশব স্থূলতা বৃদ্ধির কারণসমূহ

  • অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের দিকে ঝোঁক: শিশুরা ক্রমশ অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার (Ultra-processed foods – UPFs) গ্রহণ করছে যাতে প্রচুর পরিমাণে চিনি, লবণ, অস্বাস্থ্যকর চর্বি এবং রাসায়নিক উপাদান থাকে। এগুলোর ব্যাপক বিজ্ঞাপন শিশুদের খাদ্যাভ্যাসকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করে।
  • অর্থনৈতিক কারণ: তাজা এবং পুষ্টিকর খাবারের তুলনায় অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার প্রায়ই সস্তা এবং সহজে পাওয়া যায়। ভুট্টা, সয়া এবং গমের মতো ফসলের জন্য দেওয়া কৃষি ভর্তুকি এবং প্রিজারভেটিভের ব্যবহার এই দামের পার্থক্যের জন্য দায়ী।
  • স্কুল টিফিন কর্মসূচিতে অস্বাস্থ্যকর খাবার: ২০২৪ সালের একটি গ্লোবাল সার্ভে অনুযায়ী, বিশ্বের প্রতি চারটি স্কুল মিল প্রোগ্রামের মধ্যে একটিতে প্রক্রিয়াজাত মাংস দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে মিষ্টি, ভাজা খাবার এবং চিনিযুক্ত পানীয়ও দেওয়া হয়।
  • শারীরিক পরিশ্রমের অভাব: নগরায়ণ, খেলার জায়গার অভাব, যানবাহনের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং স্ক্রিন টাইম (ফোন/টিভি) বৃদ্ধির ফলে শিশুদের শারীরিক কার্যকলাপ কমে গেছে, যা তাদের অলস জীবনযাত্রার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
  • জেনেটিক কারণ: কিছু ক্ষেত্রে স্থূলতা বংশগত বা জেনেটিক পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রভাবিত হতে পারে, যা নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে দ্রুত ওজন বৃদ্ধির দিকে ধাবিত করে।
  • দুর্বল নীতিগত পদক্ষেপ: অনেক দেশেই এখনও কঠোর নিয়ন্ত্রনবিধি নেই। খুব কম দেশেই খাবারের প্যাকেটের সামনে পুষ্টির মান উল্লেখ করা (Front-of-pack labelling) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। স্বাস্থ্যকর খাবারকে উৎসাহিত করার জন্য ভর্তুকি দেওয়ার ব্যবস্থাও খুব সীমিত।

ক্রমবর্ধমান শৈশব স্থূলতার প্রভাব

শৈশব স্থূলতা দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যগত জটিলতার সম্ভাবনাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়, যা শারীরিক, বিপাকীয় এবং মানসিক সুস্থতাকে প্রভাবিত করে। এর প্রধান স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলো হলো:

  • বিপাকীয় এবং হৃদরোগ সংক্রান্ত ব্যাধি (Metabolic and Cardiovascular Disorders): শৈশব স্থূলতা টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ (Hypertension), হাইপারগ্লাইসেমিয়া, উচ্চ কোলেস্টেরল এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। শরীরের অতিরিক্ত চর্বি স্বাভাবিক বিপাকীয় কার্যকলাপে ব্যাঘাত ঘটায় এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগের প্রবণতা বৃদ্ধি করে।
  • যকৃৎ বা লিভার সংক্রান্ত জটিলতা: অতিরিক্ত চর্বি জমার ফলে মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ (MASLD) হতে পারে। এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে যকৃতে অস্বাভাবিক চর্বি জমা হয়, যা চিকিৎসা না করলে লিভারের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
  • পেশী ও হাড়ের সমস্যা (Musculoskeletal Problems): অতিরিক্ত ওজন হাড় এবং জয়েন্টের ওপর অত্যাধিক চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে জয়েন্টের সমস্যা, কঙ্কালতন্ত্রের ধকল এবং চলাফেরার ক্ষমতা হ্রাস পায়, যা শারীরিক সক্রিয়তাকে আরও সীমিত করে দেয়।
  • মানসিক ও সামাজিক প্রভাব: স্থূলতায় আক্রান্ত শিশুরা প্রায়শই হীনম্মন্যতা (Low self-esteem), উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং সামাজিক কলঙ্কের শিকার হয়। স্কুল বা সামাজিক পরিবেশে উপহাস (Bullying) ও বৈষম্যের ফলে এই সমস্যাগুলো আরও প্রকট হয়।
  • প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে স্থায়িত্ব: শৈশব স্থূলতা প্রায়শই প্রাপ্তবয়স্ক বয়স পর্যন্ত বজায় থাকে, যা সারাজীবনের জন্য অসংক্রামক ব্যাধি (NCDs) এবং অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

সুস্থ পুষ্টি ও স্থূলতা রোধে প্রধান সরকারি উদ্যোগসমূহ

  • পোষণ অভিযান (POSHAN Abhiyaan): উন্নত পুষ্টি পরিষেবা এবং সচেতনতার মাধ্যমে শিশু, কিশোরী এবং মায়েদের পুষ্টির মান উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে এই অভিযান পরিচালিত হয়।
  • ইট রাইট ইন্ডিয়া মুভমেন্ট (Eat Right India Movement): ভোক্তা সচেতনতা বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার সংস্কার এবং স্কুলে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর এবং টেকসই খাদ্যাভ্যাসকে উৎসাহিত করা হয়।
  • ‘আজ সে থোড়া কম’ (Aaj Se Thoda Kam) প্রচারভিযান: এটি একটি দেশব্যাপী সচেতনতামূলক কর্মসূচি যা মানুষকে তাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় চর্বি, চিনি এবং লবণের পরিমাণ ধীরে ধীরে কমানোর জন্য উৎসাহিত করে।
  • রুকো (RUCO – Repurpose Used Cooking Oil) উদ্যোগ: ব্যবহৃত রান্নার তেল সংগ্রহ করে তা বায়োডিজেল বা সাবানের মতো পণ্যে রূপান্তর করা নিশ্চিত করা হয়, যাতে এই তেল পুনরায় খাদ্য প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হয়ে স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে না পারে।

বৈশ্বিক নীতিগত পদক্ষেপ

  • বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউনিসেফ (UNICEF)-এর রূপরেখা: এই সংস্থাগুলো স্বাস্থ্যকর স্কুল পরিবেশ নিশ্চিত করা, চিনিযুক্ত পানীয়ের ওপর কর আরোপ, জাঙ্ক ফুডের বিজ্ঞাপনী নিয়ন্ত্রণ এবং শৈশব স্থূলতার প্রবণতা জাতীয়ভাবে পর্যবেক্ষণের সুপারিশ করে।
  • টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) ৩.৪: এই লক্ষ্যমাত্রাটি অসংক্রামক ব্যাধি থেকে অকাল মৃত্যু হ্রাসের ওপর জোর দেয়, যেখানে শৈশব স্থূলতা মোকাবেলাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য করা হয়।

শৈশব স্থূলতা মোকাবেলায় ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা

  • স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস প্রচার: খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি, ভাউচার, নগদ অর্থ স্থানান্তর এবং স্থানীয় খাদ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে সাশ্রয়ী ও পুষ্টিকর খাবারের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা।
  • নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা: অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ নিরুৎসাহিত করতে জাঙ্ক ফুডের বিজ্ঞাপনী প্রচারের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা, খাবারের প্যাকেটের সামনে পুষ্টির মান উল্লেখ করা (Front-of-pack labelling) এবং অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর উচ্চহারে কর আরোপ করা।
  • সক্রিয় জীবনযাত্রায় উৎসাহিত করা: ‘ফিট ইন্ডিয়া মুভমেন্ট’ এবং ‘খেলো ইন্ডিয়া’র মতো উদ্যোগের মাধ্যমে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের নিয়মিত শারীরিক কসরতে উৎসাহিত করা এবং খেলাধুলা ও ফিটনেসকে দৈনন্দিন রুটিনের অন্তর্ভুক্ত করা।
  • শিশুদের জন্য শারীরিক অবকাঠামোর উন্নতি: শিক্ষা অধিকার আইন (RTE)-এর মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতিটি স্কুলে খেলার মাঠ এবং ক্রীড়া সুবিধার উপস্থিতি কঠোরভাবে নিশ্চিত করা। এছাড়া আবাসিক এলাকাগুলোতে পার্ক এবং উন্মুক্ত বিনোদনমূলক স্থান তৈরি করা যাতে শিশুরা বাইরে খেলাধুলার সুযোগ পায়।
  • চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতি: বর্তমানে ‘সেমাগ্লুটাইড’ (Semaglutide) এবং ‘তিরজেপাটাইড’ (Tirzepatide)-এর মতো নতুন স্থূলতা-বিরোধী ওষুধগুলো আশাব্যঞ্জক ফলাফল দেখাচ্ছে। যদিও উচ্চমূল্যের কারণে বর্তমানে এগুলোর ব্যবহার সীমিত, তবে ভবিষ্যতে সাশ্রয়ী মূল্যের জেনেরিক সংস্করণ পাওয়া গেলে চিকিৎসার সুযোগ আরও বাড়বে।
  • জনসচেতনতা বৃদ্ধি: সুষম খাদ্য, অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড গ্রহণের ঝুঁকি এবং নিয়মিত ব্যায়ামের গুরুত্ব সম্পর্কে পরিবার ও সম্প্রদায়ের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

উপসংহার

পরিবর্তিত খাদ্যাভ্যাস, অলস জীবনযাত্রা এবং দ্রুত আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের ফলে ভারতে শৈশব স্থূলতা আজ একটি উল্লেখযোগ্য জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। স্বাস্থ্যকর পুষ্টি, নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ, কার্যকর আইনি নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতার মতো প্রতিরোধমূলক কৌশলের মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধান করা অপরিহার্য। এটি কেবল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য রক্ষাই করবে না, বরং ভারতের জনতাত্ত্বিক লভ্যাংশকে (Demographic Dividend) দীর্ঘস্থায়ী করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

Latest Articles