প্রেক্ষাপট (Context) ভারতের রাষ্ট্রপতি সম্প্রতি সাতটি রাজ্য এবং দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের জন্য নতুন রাজ্যপাল ও উপ-রাজ্যপাল (L-Gs) নিয়োগ ও বদলির ঘোষণা করেছেন। উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক পরিবর্তন, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন এবং পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল সি.ভি. আনন্দ বোসের মতো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পদত্যাগের প্রেক্ষাপটে এই রদবদল করা হয়েছে।
I. সাম্প্রতিক নিয়োগ এবং মূল পরিবর্তনসমূহ
সর্বশেষ এই নিয়োগগুলি রাজ্যের প্রধানদের স্থানান্তর ও নিযুক্ত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতাকে তুলে ধরে:
- পশ্চিমবঙ্গ: তামিলনাড়ুর প্রাক্তন রাজ্যপাল আর.এন. রবিকে নতুন রাজ্যপাল হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে।
- তামিলনাড়ু: কেরলের রাজ্যপাল রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আর্লেকরকে তামিলনাড়ুর অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
- বিহার: আরিফ মোহাম্মদ খানের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) সৈয়দ আতা হাসনাইন।
- বদলিসমূহ: শিব প্রতাপ শুক্লাকে হিমাচল প্রদেশ থেকে তেলেঙ্গানায় এবং জিষ্ণু দেব বর্মাকে তেলেঙ্গানা থেকে মহারাষ্ট্রে বদলি করা হয়েছে।
- কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল: বিনয় কুমার সাক্সেনাকে দিল্লি থেকে লাদাখে বদলি করা হয়েছে, এবং লাদাখের উপ-রাজ্যপাল কবিন্দর গুপ্তকে হিমাচল প্রদেশের রাজ্যপাল হিসেবে উন্নীত করা হয়েছে।
II. স্থবির সংযোগ (Static Linkages): রাজ্যপালের কার্যালয়
১. সাংবিধানিক বিধান (Constitutional Provisions)
- ধারা ১৫৩: প্রতিটি রাজ্যের জন্য একজন রাজ্যপাল থাকবেন। ১৯৫৬ সালের ৭ম সংবিধান সংশোধনী আইনের মাধ্যমে একই ব্যক্তিকে দুই বা ততোধিক রাজ্যের রাজ্যপাল হিসেবে নিয়োগের সুবিধা দেওয়া হয়েছে (যা তামিলনাড়ুর অতিরিক্ত দায়িত্বের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক)।
- ধারা ১৫৫: রাজ্যপাল তাঁর হস্তাক্ষর ও সিলযুক্ত পরোয়ানা বা ওয়ারেন্টের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির দ্বারা নিযুক্ত হন।
- ধারা ১৫৬: রাজ্যপাল রাষ্ট্রপতির সন্তোষ অনুযায়ী (Pleasure of the President) পদে বহাল থাকেন। এই ধারায় পাঁচ বছরের একটি আদর্শ মেয়াদের কথা উল্লেখ থাকলেও তা রাষ্ট্রপতির ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।
- ধারা ১৬৩: রাজ্যপালকে তাঁর কার্যাবলি সম্পাদনে সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য মুখ্যমন্ত্রীকে প্রধান করে একটি মন্ত্রী পরিষদ থাকবে, তবে কিছু বিশেষ শর্ত বা ক্ষেত্র বাদে যেখানে তাঁর স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা (Discretion) অনুমোদিত।
২. রাজ্যপালের নিয়োগ প্রক্রিয়া
- ভারতের একটি রাজ্যের রাজ্যপাল হলেন ওই রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধান এবং মুখ্য নির্বাহী। এই পদের ধারণাটি কানাডার সাংবিধানিক মডেল থেকে অনুপ্রাণিত।
- প্রথা অনুযায়ী, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব থেকে পদটিকে মুক্ত রাখতে সাধারণত রাজ্যের বাইরের কোনো ব্যক্তিকে রাজ্যপাল হিসেবে নিয়োগ করা হয়।
- যদিও ভারতের রাষ্ট্রপতি রাজ্যপাল নিয়োগ করেন, তবে সাংবিধানিক ব্যবস্থার সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সাথে পরামর্শ করা হবে বলে আশা করা হয়।
- ভারতের রাষ্ট্রপতির মতো রাজ্যপাল সরাসরি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হন না বা কোনো ইলেক্টরাল কলেজের মাধ্যমে পরোক্ষভাবেও নির্বাচিত হন না।
- পরিবর্তে, তিনি রাষ্ট্রপতির দ্বারা একটি ওয়ারেন্টের মাধ্যমে নিযুক্ত হন। তিনি রাষ্ট্রপতির সন্তোষ অনুযায়ী পদে বহাল থাকেন এবং যেকোনো সময় অপসারিত হতে পারেন।
৩. রাজ্যপালের কার্যালয়ের মূল শর্তাবলি
- আইনসভা থেকে পৃথকীকরণ: রাজ্যপাল সংসদ বা কোনো রাজ্য আইনসভার সদস্য হতে পারবেন না। যদি কোনো সদস্য নিযুক্ত হন, তবে তিনি যেদিন থেকে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন সেদিন থেকে তাঁর আসনটি শূন্য বলে গণ্য হবে।
- অন্য কোনো লাভের পদ নয়: রাজ্যপাল অন্য কোনো লাভের পদে (Office of Profit) থাকতে পারবেন না।
- সরকারি বাসভবন: রাজ্যপাল বিনা ভাড়ায় সরকারি বাসভবন (রাজভবন) ব্যবহারের অধিকারী।
- পারিশ্রমিক ও ভাতা: সংসদ রাজ্যপালের বেতন, ভাতা এবং সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণ করে। মেয়াদের মধ্যে এগুলি কমানো যায় না।
- ব্যয় ভাগাভাগি: যদি একজন ব্যক্তি দুই বা ততোধিক রাজ্যের রাজ্যপাল হিসেবে কাজ করেন, তবে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নির্ধারিত হারে রাজ্যগুলোর মধ্যে ব্যয় এবং বেতন ভাগ করা হয়।
- অনাক্রম্যতা: রাজ্যপাল তাঁর মেয়াদের মধ্যে ব্যক্তিগত কাজের জন্য কোনো ফৌজদারি কার্যধারা (Criminal Proceedings) থেকে সুরক্ষা ভোগ করেন। দেওয়ানি কার্যধারার (Civil Proceedings) ক্ষেত্রে দুই মাসের নোটিশ প্রয়োজন।
- যোগ্যতা (ধারা ১৫৭): অবশ্যই ভারতের নাগরিক হতে হবে এবং বয়স অন্তত ৩৫ বছর হতে হবে।
৪. উপ-রাজ্যপাল বনাম রাজ্যপাল
- রাজ্যপাল: রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধান হিসেবে কাজ করেন এবং মন্ত্রী পরিষদের পরামর্শে চলতে বাধ্য (স্বেচ্ছাধীন বিষয়গুলো বাদে)।
- উপ-রাজ্যপাল (L-Gs): রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি হিসেবে দিল্লি, লাদাখ এবং পুডুচেরির মতো কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলি পরিচালনা করেন। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে আইনসভা আছে কি না তার ওপর ভিত্তি করে তাঁদের ক্ষমতার পার্থক্য হয়।
৫. বিশেষাধিকার (Privileges)
- ভারতের সংবিধানের ৩৬১ ধারা অনুযায়ী, রাজ্যপাল তাঁর সরকারি ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য আইনি দায়বদ্ধতা থেকে ব্যক্তিগত অনাক্রম্যতা ভোগ করেন।
- মেয়াদ চলাকালীন তিনি ফৌজদারি কার্যধারা থেকে মুক্ত থাকেন এবং তাঁকে গ্রেপ্তার বা কারারুদ্ধ করা যায় না।
- তবে ব্যক্তিগত কাজের সাথে সম্পর্কিত দেওয়ানি কার্যধারা শুরু করা যেতে পারে, যদি দুই মাসের আগাম নোটিশ প্রদান করা হয়।
নিচের বিবৃতিগুলো বিবেচনা করুন:
১. ১৯৫৬ সালের ৭ম সংবিধান সংশোধনী আইন একই ব্যক্তিকে দুই বা ততোধিক রাজ্যের রাজ্যপাল হিসেবে নিয়োগের সুবিধা করে দিয়েছে।
২. রাজ্যপাল তাঁর মেয়াদের মধ্যে ব্যক্তিগত কাজের জন্য ফৌজদারি কার্যধারা (Criminal Proceedings) থেকে অনাক্রম্যতা বা সুরক্ষা ভোগ করেন।
ওপরে দেওয়া বিবৃতিগুলোর মধ্যে কোনটি/কোনগুলো সঠিক?
(a) শুধুমাত্র 1
(b) শুধুমাত্র 2
(c) 1 এবং 2 উভয়ই
(d) 1 বা 2 কোনোটিই নয়
উত্তর: (c)
ব্যাখ্যা:
• বিবৃতি 1 সঠিক: রাজ্যপালের কার্যালয়ের স্থবির সংযোগ (static linkages) অনুযায়ী, ১৯৫৬ সালের ৭ম সংবিধান সংশোধনী আইন একই ব্যক্তিকে দুই বা ততোধিক রাজ্যের রাজ্যপাল হিসেবে নিয়োগ করা সম্ভব করেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি প্রতিফলিত হয়েছে, যেখানে রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আর্লেকরকে কেরলের রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তামিলনাড়ুর অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
• বিবৃতি 2 সঠিক: ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, একজন রাজ্যপাল তাঁর সরকারি কার্যাবলি সম্পাদনের ক্ষেত্রে আইনি দায়বদ্ধতা থেকে ব্যক্তিগত অনাক্রম্যতা ভোগ করেন। বিশেষ করে, তাঁর মেয়াদের মধ্যে তিনি যেকোনো ফৌজিদারি কার্যধারা থেকে মুক্ত থাকেন, এমনকি তাঁর ব্যক্তিগত কাজের জন্যও। তাঁর মেয়াদের মধ্যে কোনো আদালত থেকে রাজ্যপালকে গ্রেপ্তার বা কারারুদ্ধ করার কোনো আদেশ জারি করা যায় না।