প্রেক্ষাপট
- সম্প্রতি তামিলনাড়ুর মাদুরাইয়ের একটি ট্রায়াল কোর্ট বা বিচারিক আদালত নয়জন পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছে। ব্যবসায়ী পি. জয়রাজ এবং তাঁর ছেলে জে. বেনিক্সকে হেফাজতে নির্যাতন ও হত্যার দায়ে তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
- ২০২০ সালের জুন মাসে কোভিড-১৯ লকডাউনের সময় সাতানকুলাম থানায় এই ঘটনা ঘটেছিল, যেখানে তাঁদের ওপর চরম শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। বিচারক এই ঘটনাটিকে একটি “সামাজিক ব্যাধি” এবং “বেড়ায় ক্ষেত খাওয়ার” মতো ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের দায়িত্ব যেখানে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা, সেখানে তাঁরাই এমন জঘন্য অপরাধ করেছেন।
- এই রায় ভারতে পুলিশের দায়বদ্ধতা এবং নির্যাতন-বিরোধী আইনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।
১. হেফাজতে সহিংসতার সংজ্ঞা
পুলিশ বা বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের হেফাজতে থাকাকালীন কোনো ব্যক্তির ওপর শারীরিক বা মানসিক কষ্ট দেওয়াই হলো হেফাজতে সহিংসতা। এর মধ্যে রয়েছে:
- শারীরিক নির্যাতন: মারধর করা, ‘থার্ড ডিগ্রি’ পদ্ধতি প্রয়োগ এবং যৌন নিপীড়ন।
- মানসিক নির্যাতন: হুমকি দেওয়া, অপমান করা এবং ঘুমাতে না দেওয়া।
- হেফাজতে মৃত্যু: পুলিশের লকআপ বা কারাগারে থাকাকালীন মৃত্যু।
২. সাংবিধানিক সুরক্ষা
রাষ্ট্রের ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করার জন্য ভারতের সংবিধানে বেশ কিছু সুরক্ষাকবচ দেওয়া হয়েছে:
- ধারা ২০(৩): এটি নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য না দেওয়ার অধিকার দেয়। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তিকেই নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যাবে না।
- ধারা ২১: এটি জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়। সুপ্রিম কোর্ট এই ধারাটিকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছে যেখানে নির্যাতন ও নিষ্ঠুর আচরণ থেকে মুক্ত থাকার অধিকারও অন্তর্ভুক্ত।
- ধারা ২২: এটি গ্রেপ্তার এবং আটকের বিরুদ্ধে সুরক্ষা প্রদান করে। এর মধ্যে রয়েছে গ্রেপ্তারের কারণ জানার অধিকার এবং একজন আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়ার অধিকার।
৩. আইনি বিধান
- ভারতীয় দণ্ডবিধি (IPC) / ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS): আইপিসি-র ৩৩০ এবং ৩৩১ ধারা (বর্তমানে বিএনএস-এর সংশ্লিষ্ট ধারা) স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য কাউকে আঘাত বা গুরুতর আঘাত করার জন্য শাস্তির বিধান রাখে।
- ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC) / ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (BNSS): সিআরপিসি-র ১৭৬(১এ) ধারা অনুযায়ী, হেফাজতে মৃত্যু, নিখোঁজ হওয়া বা ধর্ষণের ক্ষেত্রে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে বিচার বিভাগীয় তদন্ত বাধ্যতামূলক।
- ভারতীয় সাক্ষ্য আইন: ধারা ২৫ অনুযায়ী, পুলিশ অফিসারের কাছে দেওয়া কোনো স্বীকারোক্তি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
৪. ঐতিহাসিক বিচারিক নির্দেশিকা: ডি.কে. বাসু বনাম পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য (১৯৯৭)
হেফাজতে নির্যাতন রোধ করতে সুপ্রিম কোর্ট গ্রেপ্তার এবং আটকের ক্ষেত্রে ১১টি বাধ্যতামূলক নিয়ম বা নির্দেশিকা জারি করেছে:
- পরিচয়: পুলিশ কর্মীদের অবশ্যই তাঁদের নাম এবং পদবীসহ পরিষ্কার ও দৃশ্যমান নেমট্যাগ পরে থাকতে হবে।
- অ্যারেস্ট মেমো: গ্রেপ্তারের সময় একটি মেমো তৈরি করতে হবে, যা কমপক্ষে একজন সাক্ষী (পরিবারের সদস্য বা স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি) দ্বারা সত্যায়িত হতে হবে।
- জানানোর অধিকার: গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির অধিকার আছে যে তাঁর কোনো বন্ধু বা আত্মীয়কে যত দ্রুত সম্ভব গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানানো।
- স্বাস্থ্য পরীক্ষা: গ্রেপ্তারের সময় এবং আটক থাকাকালীন প্রতি ৪৮ ঘণ্টা অন্তর একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডাক্তার দ্বারা গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হবে।
- আইনি সহায়তা: জিজ্ঞাসাবাদ চলাকালীন গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি তাঁর আইনজীবীর সাথে দেখা করার অনুমতি পেতে পারেন (পুরো সময় ধরে না হলেও)।
৫. আন্তর্জাতিক মানদণ্ড
নির্যাতনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ কনভেনশন (UNCAT): ভারত ১৯৯৭ সালে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও এখনও এটি অনুমোদন (ratify) করেনি। এটি অনুমোদন করলে ভারতকে নির্যাতনকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে একটি নির্দিষ্ট স্বতন্ত্র আইন প্রণয়ন করতে হবে।
Q: ভারতে হেফাজতে সহিংসতার বিরুদ্ধে সুরক্ষাকবচগুলোর প্রেক্ষিতে নিচের বিবৃতিগুলো বিবেচনা করুন:
1. ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (BNSS) অনুযায়ী, পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত বাধ্যতামূলক।
2. ভারত নির্যাতনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ কনভেনশনে (UNCAT) স্বাক্ষর করেছে এবং দেশীয় আইনে এর বিধানগুলো কার্যকর করার জন্য এটি অনুমোদন করেছে।
3. ডি.কে. বাসু নির্দেশিকা অনুসারে, আটক থাকাকালীন প্রতি ২৪ ঘণ্টা অন্তর একজন ডাক্তার দ্বারা গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক।
ওপরের বিবৃতিগুলোর মধ্যে কয়টি সঠিক?
(a) কেবল একটি
(b) কেবল দুটি
(c) তিনটিই সঠিক
(d) একটিও নয়
সমাধান: উত্তর: (a)
বিবৃতি 1 সঠিক: সিআরপিসি-র ১৭৬(১এ) ধারা (যা বিএনএস-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে) অনুযায়ী, হেফাজতে মৃত্যু, ধর্ষণ বা নিখোঁজ হওয়ার ক্ষেত্রে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দ্বারা বিচার বিভাগীয় তদন্ত বাধ্যতামূলক।
বিবৃতি 2 ভুল: ভারত ১৯৯৭ সালে UNCAT-এ স্বাক্ষর করলেও এটি এখনও অনুমোদন (ratify) করেনি।
বিবৃতি 3 ভুল: ডি.কে. বাসু নির্দেশিকা অনুযায়ী, আটক থাকাকালীন প্রতি ৪৮ ঘণ্টা অন্তর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত, ২৪ ঘণ্টা নয়।