এই নিবন্ধটি পড়ার পর আপনি ইউপিএসসি (UPSC) মেইনস-এর এই মডেল প্রশ্নটির উত্তর দিতে পারবেন:
“যদিও সক্ষমতা তত্ত্ব (Capabilities Approach) উন্নয়নের ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছে, তবুও এটি বেশ কিছু তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।” সমালোচনামূলক আলোচনা করুন। (১৫ নম্বর, GS-4 নৈতিকতা)
ভূমিকা
ঐতিহ্যগতভাবে উন্নয়নকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং জাতীয় আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিমাপ করা হতো। মোট দেশজ উৎপাদন (GDP) এবং মাথাপিছু আয়ের মতো সূচকগুলোকেই অগ্রগতির প্রধান মাপকাঠি হিসেবে দেখা হতো।
এই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিক অমর্ত্য সেন তাঁর সক্ষমতা তত্ত্ব (Capabilities Approach) প্রস্তাব করেন। তিনি উন্নয়নকে কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হিসেবে নয়, বরং মানুষের স্বাধীনতা এবং পছন্দের পরিধি বিস্তৃতি হিসেবে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
সক্ষমতার ধারণা: দক্ষতা ও আয়ের ঊর্ধ্বে (The Idea of Capability)
সেন-এর কাঠামোর মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘সক্ষমতা‘ (Capability), যা প্রচলিত দক্ষতা বা যোগ্যতার চেয়ে অনেক গভীর। সক্ষমতা তত্ত্ব অনুযায়ী, সক্ষমতা হলো সেই বাস্তব স্বাধীনতা যা একজন ব্যক্তির কাঙ্ক্ষিত জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজন।
সেন এখানে ‘ফাংশনিং’ (Functioning) এবং ‘ক্যাপাবিলিটি’ (Capability)-এর মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য দেখিয়েছেন:
- ফাংশনিং (Functioning): এটি একজন ব্যক্তির বাস্তব অর্জনকে বোঝায়—যেমন সুস্থ থাকা, শিক্ষিত হওয়া বা রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া।
- সক্ষমতা (Capability): এটি মূলত সেই সুযোগ বা স্বাধীনতাকে বোঝায় যা মানুষকে কাঙ্ক্ষিত ‘ফাংশনিং’ অর্জনে সাহায্য করে।
একই আয় হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সচলতার সুযোগের অভাবে দুই ব্যক্তির জীবনযাত্রার মান সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে। এই সুযোগগুলো জীবনের পছন্দকে প্রশস্ত করে, আর সুযোগের অভাব পছন্দকে সীমিত করে। তাই উন্নয়নকে কেবল আয় বা ফলাফলের ভিত্তিতে নয়, বরং মানুষের প্রাপ্ত সুযোগ ও স্বাধীনতার ভিত্তিতে বিচার করা উচিত।
উন্নয়ন নিয়ে নতুন ভাবনা: জিডিপি এবং মাথাপিছু আয়ের সীমাবদ্ধতা
১. অর্থনৈতিক সংকোচনবাদ (Economic Reductionism): জিডিপি কেবল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের হিসাব দেয়, কিন্তু সামগ্রিক সামাজিক অগ্রগতির আংশিক চিত্রই ফুটিয়ে তোলে।
২. বণ্টনগত অন্ধত্ব (Distributional Blindness): উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি বৈষম্যও থাকতে পারে, যা সমাজের বড় একটি অংশকে প্রান্তিক বা দরিদ্র করে রাখতে পারে।
৩. সামাজিক দিকের অবহেলা: জিডিপি স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং নাগরিক স্বাধীনতার মতো অত্যাবশ্যকীয় বিষয়গুলোর প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়।
প্রবৃদ্ধির ভূমিকা: অমর্ত্য সেনের মতে, অর্থনৈতিক সূচকগুলো কেবল উন্নয়নের একটি ‘মাধ্যম‘ হওয়া উচিত; প্রকৃত উন্নয়ন নিহিত রয়েছে মানুষের সক্ষমতা ও স্বাধীনতার বিস্তারের মধ্যে।
উন্নয়ন মানেই মানুষের স্বাধীনতার বিস্তার
সেন উন্নয়নকে মানুষের স্বাধীনতা বৃদ্ধির একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে, স্বাধীনতা হলো উন্নয়নের প্রাথমিক লক্ষ্য এবং উন্নয়নের প্রধান মাধ্যম।
মানুষের স্বাধীনতার বিভিন্ন দিক একে অপরের সাথে যুক্ত:
- রাজনৈতিক স্বাধীনতা: ভোট দেওয়ার অধিকার, মতপ্রকাশ এবং গণতান্ত্রিক শাসনে অংশগ্রহণ।
- অর্থনৈতিক সুবিধা: কর্মসংস্থান, ঋণ এবং বাজার ব্যবহারের সুযোগ।
- সামাজিক সুযোগ: শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য সরকারি পরিষেবা।
- সুরক্ষামূলক নিরাপত্তা: চরম অভাব, শোষণ বা সামাজিক বর্জন থেকে ব্যক্তিকে রক্ষা করা।
এই স্বাধীনতাগুলো একে অপরকে শক্তিশালী করে—যেমন, শিক্ষা ভালো কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে, যা আবার অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সামাজিক অংশগ্রহণ বাড়ায়। এভাবে উন্নয়ন মানুষের পছন্দের সীমা বাড়িয়ে দেয় এবং মানুষ কেবল সুবিধাভোগী নয়, বরং নিজের জীবন গড়ার সক্রিয় কারিগর (Agents of Change) হয়ে ওঠে।
স্বায়ত্তশাসনের সমতা এবং মানুষের সক্রিয় ভূমিকা
অমর্ত্য সেনের তত্ত্বের একটি অপরিহার্য দিক হলো স্বায়ত্তশাসনের সমতা (Equality of Autonomy)। এটি জোর দেয় যে, প্রত্যেকের নিজের জীবন গড়ার এবং স্বপ্ন পূরণের সমান সুযোগ থাকা উচিত।
এর জন্য শিক্ষা, তথ্যের অধিকার এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের মতো পরিবেশ প্রয়োজন। উন্নয়ন কেবল মানুষকে সুবিধা দেওয়া নয়, বরং মানুষকে শক্তিশালী করা যাতে তারা নিজেদের জীবন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারে।
নীতি ও ন্যায়: প্রতিষ্ঠান বনাম বাস্তব বিচার (Niti and Nyaya)
প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের ওপর ভিত্তি করে অমর্ত্য সেন ‘নীতি‘ (Niti) এবং ‘ন্যায়‘ (Nyaya)-এর মধ্যে পার্থক্য করেছেন:
- নীতি (Niti): এটি প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম এবং ব্যবস্থার নির্ভুল দিকটিকে বোঝায়।
- ন্যায় (Nyaya): এটি বাস্তব জীবনে মানুষের মঙ্গলের ওপর সেই নিয়মের প্রভাব বা প্রকৃত বিচারকে বোঝায়।
সক্ষমতা তত্ত্ব বা ‘ক্যাপাবিলিটি অ্যাপ্রোচ‘-এর চ্যালেঞ্জসমূহ
১. সক্ষমতা নির্ধারণে আদর্শগত বিতর্ক: সক্ষমতা তত্ত্বের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো—কোনগুলো ‘মূল সক্ষমতা’ তা চিহ্নিত করা। মার্থা নুসবাউম এই সমস্যা সমাধানের জন্য মানুষের কেন্দ্রীয় সক্ষমতার একটি নির্দিষ্ট তালিকা প্রস্তাব করেছেন (যেমন—শারীরিক স্বাস্থ্য, আবেগীয় সুস্থতা, যুক্তি এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ)। তিনি যুক্তি দেন যে, মানবিক মর্যাদার ন্যূনতম মানদণ্ড হিসেবে রাষ্ট্রকে এগুলো নিশ্চিত করতে হবে। তবে অমর্ত্য সেন সক্ষমতার কোনো সর্বজনীন তালিকা তৈরির বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, প্রতিটি সমাজকে গণতান্ত্রিক আলোচনার (Public Reasoning) মাধ্যমে নিজস্ব সক্ষমতাগুলো বেছে নিতে হবে। এর ফলে একটি বড় চ্যালেঞ্জ দেখা দেয়: সক্ষমতা চিহ্নিতকরণ এবং অগ্রাধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সর্বজনীন ঐক্যমত্যের অভাব।
২. তত্ত্বকে নীতিতে রূপান্তরের সমস্যা (প্র্যাক্সিস সমস্যা): তাত্ত্বিক জ্ঞান এবং বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে একটি বড় ব্যবধান রয়েছে, যাকে দর্শনের ভাষায় ‘প্র্যাক্সিস‘ (Praxis) বলা হয়।
- নীতি নির্ধারণে চ্যালেঞ্জ: সক্ষমতা তত্ত্ব একটি শক্তিশালী আদর্শগত কাঠামো দিলেও একে সুনির্দিষ্ট সরকারি নীতিতে রূপান্তর করা বেশ জটিল।
- শাসনে প্রয়োগ: সরকারকে স্বাধীনতা ও সুযোগের ধারণাগুলোকে সর্বজনীন শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো বাস্তব নীতিতে রূপান্তর করতে হয়।
- প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা: মূল চ্যালেঞ্জ হলো প্রতিষ্ঠানগুলো যেন কেবল মুখে সক্ষমতার কথা না বলে বাস্তবে মানুষের সুযোগের পরিধি বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
৩. পরিমাপ এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ:
- পরিমাপের সমস্যা: জিডিপি বা আয়ের মতো সূচকগুলো সহজেই গণনা করা যায়, কিন্তু স্বাধীনতা, মর্যাদা এবং অংশগ্রহণের মতো গুণগত (Qualitative) বিষয়গুলো পরিমাপ করা অত্যন্ত কঠিন।
- রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ: বর্তমানে ‘প্লুটোক্র্যাটিক পপুলিজম‘ (যেখানে মুষ্টিমেয় ধনী গোষ্ঠী ক্ষমতা দখল করে সাধারণ মানুষের আবেগকে ব্যবহার করে) বৃদ্ধি পাওয়ায় উন্নয়নের আলোচনা কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। এর ফলে মানুষের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের মতো মূল নীতিগুলো গুরুত্ব হারাচ্ছে।
৪. প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচার বনাম বাস্তব ফলাফল: এই তত্ত্ব ন্যায়বিচারের প্রকৃতি নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি করে। জন রলস তাঁর ‘ভেইল অফ ইগনোরেন্স’ (Veil of Ignorance) বা ‘অজ্ঞতার আবরণ’ ধারণার মাধ্যমে এমন একটি ন্যায্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কথা বলেছেন যা সাম্য ও ন্যায়বিচার রক্ষা করবে। সেন রলসের এই কাঠামোকে সম্মান জানালেও তিনি মনে করেন যে, কেবল প্রতিষ্ঠানের গঠন দেখে ন্যায়বিচার বিচার করা যায় না। বরং নজর দিতে হবে বাস্তব সামাজিক ফলাফল এবং মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর। অনেক সময় প্রতিষ্ঠানগুলো তাত্ত্বিকভাবে ন্যায্য মনে হলেও বাস্তবে বৈষম্য দূর করতে ব্যর্থ হয়।
সক্ষমতা তত্ত্বকে শক্তিশালী করার পথনির্দেশ
১. সক্ষমতা নির্ধারণে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ: সমাজকে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক আলোচনার মাধ্যমে তাদের প্রধান সক্ষমতাগুলো চিহ্নিত ও অগ্রাধিকার দিতে উৎসাহিত করতে হবে। এতে নাগরিক, বিশেষজ্ঞ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরি হবে।
২. কার্যকর জননীতিতে রূপান্তর: সরকারকে উন্নয়ন পরিকল্পনায় সক্ষমতা তত্ত্বকে যুক্ত করতে হবে। সর্বজনীন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শ্রমবাজার তৈরির মাধ্যমে মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
৩. বহুমাত্রিক সূচক তৈরি করা: কেবল জিডিপির ওপর নির্ভর না করে মানব উন্নয়ন সূচক (HDI), সামাজিক অগ্রগতি সূচক এবং জনকল্যাণমূলক পরিমাপক গ্রহণ করতে হবে যা স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং মর্যাদাকে সঠিকভাবে প্রতিফলিত করে।
৪. প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি: ‘প্লুটোক্র্যাটিক পপুলিজম’-এর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্বচ্ছ শাসনব্যবস্থা, আইনের শাসন এবং প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।
উপসংহার
অমর্ত্য সেনের সক্ষমতা তত্ত্ব উন্নয়নের একটি ভবিষ্যৎমুখী দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। যেখানে অগ্রগতি কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে নয়, বরং মানুষের স্বাধীনতা, পছন্দ এবং সক্রিয় ভূমিকার (Agency) বিস্তৃতি দিয়ে পরিমাপ করা হবে।