প্রেক্ষাপট
সম্প্রতি ২০২৬ সালের মার্চ মাসে ‘জিওফিজিক্যাল রিসার্চ লেটার্স’-এ প্রকাশিত পটসডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি গবেষণায় নিশ্চিত করা হয়েছে যে, ২০১৫ সাল থেকে বিশ্ব উষ্ণায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং একটি তীব্র গতিবৃদ্ধির পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং সৌর চক্রের মতো প্রাকৃতিক প্রভাবগুলোকে আলাদা করে এই গবেষণায় দেখা গেছে যে, উষ্ণায়নের হার প্রতি দশকে ০.২° সেলসিয়াস থেকে বেড়ে বর্তমানে প্রায় প্রতি দশকে ০.৩৫° সেলসিয়াস হয়েছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে অ্যারোসল দূষণ কমে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট উষ্ণায়নের ‘উন্মোচন’ (Unmasking) প্রভাবকে দায়ী করা হয়েছে।
১. উষ্ণায়নের ধারা: স্থিতিশীল থেকে দ্রুতগতি
- ভিত্তি: ১৯৭০-এর দশক থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পৃথিবীর উষ্ণতা প্রতি দশকে ০.২° সেলসিয়াস হারে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল গতিতে বেড়েছে।
- পরিবর্তন: ২০১৫ সাল থেকে এই হার প্রায় ৭৫% বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বর্তমানে এটি আনুমানিক প্রতি দশকে ০.৩৫° সেলসিয়াস-এ পৌঁছেছে।
- পরিসংখ্যানগত গুরুত্ব: গবেষকরা ‘পিসওয়াইজ লিনিয়ার মডেল’ ব্যবহার করে ২০১৫ সালকে পরিবর্তনের একটি বিশেষ সময় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তারা ৯৮% নিশ্চিত যে এটি এল নিনোর মতো কোনো প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ফল নয়, বরং জলবায়ু ব্যবস্থার একটি কাঠামোগত পরিবর্তন।
২. অ্যারোসলের ভূমিকা: ‘দুইধারী তলোয়ার’
অ্যারোসল হলো বায়ুমণ্ডলে ভেসে থাকা অতি ক্ষুদ্র কঠিন কণা বা তরল বিন্দু। এগুলো জলবায়ুকে প্রধানত দুটি উপায়ে প্রভাবিত করে:
| বৈশিষ্ট্য | শীতলকারী অ্যারোসল (প্রতিফলক) | উষ্ণকারী অ্যারোসল (শোষক) |
| উদাহরণ | সালফেট, নাইট্রেট, সমুদ্রের লবণ, খনিজ ধূলিকণা। | ব্ল্যাক কার্বন (ঝুল কালি), ব্রাউন কার্বন। |
| কার্যপদ্ধতি | আগত সৌর বিকিরণকে মহাকাশে প্রতিফলিত করে পাঠিয়ে দেয় (অ্যালবেডো বৃদ্ধি করে)। | সৌর শক্তি শোষণ করে এবং তাপ বিকিরণ করে; বরফের ওপর জমা হলে অ্যালবেডো কমিয়ে দেয়। |
| উৎস | আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, কয়লা বা জীবাশ্ম জ্বালানি দহন। | বায়োমাস (জৈববস্তু) পোড়ানো, ডিজেল ইঞ্জিন, রান্নার চুলা। |
| মেঘের ওপর প্রভাব | ক্লাউড কনডেনসেশন নিউক্লিয়াই (CCN) হিসেবে কাজ করে মেঘকে উজ্জ্বল এবং দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে (শীতলকরণ)। | চারপাশের বাতাস গরম করে মেঘকে সরিয়ে দিতে পারে। |
৩. ‘অ্যারোসল আনমাস্কিং’ বা উন্মোচন প্রভাব
- একটি কঠিন আপস: কয়েক দশক ধরে শিল্পকারখানার নির্গত সালফেট দূষণ একটি ‘ছাতা’ হিসেবে কাজ করেছে, যা গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে সৃষ্ট উষ্ণায়নের প্রায় ০.৪° থেকে ০.৫° সেলসিয়াস তাপমাত্রা আড়াল করে রেখেছিল।
- বায়ু নির্মলকরণ: চীন ও ভারতের মতো দেশগুলো যখন বায়ুর গুণমান উন্নত করার জন্য কঠোর নিয়ম চালু করছে এবং কয়লার ব্যবহার কমিয়ে আনছে, তখন এই প্রতিফলিত অ্যারোসলের ঘনত্ব কমে যাচ্ছে।
- পরিণতি: এই ‘শীতলকারী মাস্ক’ বা আবরণটি সরে যাওয়ার ফলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পূর্ণ শক্তি অনুভূত হচ্ছে, যার ফলে তাপমাত্রায় হঠাৎ বিশাল উল্লম্ফন দেখা দিচ্ছে।
৪. প্যারিস চুক্তির ওপর প্রভাব
- ১.৫° সেলসিয়াস সীমা: প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য হলো শিল্প-পূর্ব সময়ের তুলনায় উষ্ণতা বৃদ্ধি ১.৫° সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা।
- সংশোধিত সময়সীমা: বর্তমানের এই দ্রুত হারে উষ্ণতা বৃদ্ধি পেতে থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যেই ১.৫° সেলসিয়াসের সীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা রয়েছে, যা আইপিসিসি (IPCC)-র পূর্ববর্তী পূর্বাভাস (২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝি) থেকে অনেক দ্রুত।
- নেট-জিরো বা শূন্য নির্গমনের তাগিদ: এই গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, অপূরণীয় ক্ষতি এড়াতে ২০৫০ বা ২০৭০ সালের ‘নেট-জিরো’ লক্ষ্যমাত্রাগুলো আরও এগিয়ে আনার প্রয়োজন হতে পারে।
Q: 'বায়ুমণ্ডলীয় অ্যারোসল' এবং বিশ্ব উষ্ণায়নের ওপর তাদের প্রভাবের প্রেক্ষিতে নিচের বিবৃতিগুলো বিবেচনা করুন:
1. বেশিরভাগ অ্যারোসল, যেমন সালফেট এবং নাইট্রেট, পৃথিবীর অ্যালবেডো বাড়িয়ে গ্রহের ওপর একটি শীতল প্রভাব ফেলে।
2. ব্ল্যাক কার্বন বা ঝুল কালি হলো একটি স্বল্পস্থায়ী জলবায়ু দূষণকারী যা সৌর বিকিরণ শোষণ করে উষ্ণায়নে অবদান রাখে।
3. শিল্পজাত অ্যারোসল দূষণ কমালে বিশ্ব উষ্ণায়নের হার কমে যায় কারণ এটি বায়ুমণ্ডল থেকে ক্ষতিকারক দূষণকারী পদার্থ সরিয়ে দেয়।
উপরের বিবৃতিগুলোর মধ্যে কোনটি/কোনগুলো সঠিক?
(a) কেবল 1 এবং 2
(b) কেবল 2 এবং 3
(c) কেবল 1 এবং 3
(d) 1, 2 এবং 3
উত্তর: (a)
• 1 নম্বর বিবৃতি সঠিক: সালফেট এবং নাইট্রেট অ্যারোসলগুলো প্রকৃতিগতভাবে প্রতিফলক। এগুলো সূর্যের আলোকে প্রতিফলিত করে এবং মেঘ তৈরিতে সাহায্য করে পৃথিবীর প্রতিফলন ক্ষমতা (অ্যালবেডো) বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে ভূপৃষ্ঠ শীতল থাকে।
• 2 নম্বর বিবৃতি সঠিক: ব্ল্যাক কার্বন (ঝুল কালি) একটি উষ্ণকারী উপাদান। সালফেটের মতো এটি আলো প্রতিফলিত না করে শোষণ করে। এটি বায়ুমণ্ডলে মাত্র কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ থাকে বলে একে 'স্বল্পস্থায়ী জলবায়ু দূষণকারী' (SLCP) বলা হয়।
• 3 নম্বর বিবৃতি ভুল: শিল্পজাত অ্যারোসল দূষণ কমালে আসলে বিশ্ব উষ্ণায়নের হার বেড়ে যায়। কারণ এই দূষণকারী পদার্থগুলো আগে গ্রিনহাউস গ্যাসের উষ্ণতাকে আড়াল করে রেখেছিল। এগুলো সরিয়ে ফেলায় কার্বন ডাই অক্সাইড এবং মিথেনের পূর্ণ উষ্ণায়ন প্রভাব কাজ শুরু করে ('আনমাস্কিং ইফেক্ট')।