প্রেক্ষাপট
ভারতের ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞরা ডায়াবেটিস চিকিৎসার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র HbA1c পরীক্ষার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হওয়ার জন্য সতর্ক করেছেন। তাঁরা লক্ষ্য করেছেন যে, ভারতে ব্যাপক হারে দেখা দেওয়া রক্তাল্পতা (অ্যানিমিয়া), আয়রনের অভাব এবং বংশগত রক্তাল্পতা জনিত রোগগুলো এই পরীক্ষার ফলে ভুল প্রভাব ফেলতে পারে। ভারতের ১০ কোটিরও বেশি ডায়াবেটিস রোগীর সঠিক রোগ নির্ণয় ও ব্যবস্থাপনার জন্য তাঁরা একটি সমন্বিত পদ্ধতির পরামর্শ দিয়েছেন—যেখানে HbA1c-এর সাথে OGTT এবং কন্টিনিউয়াস গ্লুকোজ মনিটরিং (CGM) ব্যবহার করা হবে।
HbA1c (গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন) টেস্ট সম্পর্কে
রক্তে শর্করার দীর্ঘমেয়াদী নিয়ন্ত্রণ মূল্যায়নের জন্য HbA1c টেস্টকে দীর্ঘদিন ধরে “গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড” বা সেরা মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
১. HbA1c কী?
- সংজ্ঞা: HbA1c-এর পূর্ণরূপ হলো গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন। রক্তের গ্লুকোজ (চিনি) যখন লোহিত রক্তকণিকায় (RBC) থাকা হিমোগ্লোবিন নামক প্রোটিনের সাথে লেগে যায়, তখন এটি তৈরি হয়। হিমোগ্লোবিনের কাজ হলো শরীরের কোষে অক্সিজেন বহন করা।
- প্রক্রিয়া: হিমোগ্লোবিনের সাথে গ্লুকোজ যুক্ত হওয়ার এই প্রক্রিয়াকে গ্লাইকেশন বলা হয়। রক্তে চিনির পরিমাণ যত বেশি হবে, হিমোগ্লোবিনের গ্লাইকেটেড হওয়ার শতাংশ তত বাড়বে।
- সময়সীমা: লোহিত রক্তকণিকা সাধারণত গড়ে প্রায় ১২০ দিন (৩ থেকে ৪ মাস) বেঁচে থাকে। তাই HbA1c টেস্ট গত ৮ থেকে ১২ সপ্তাহের গড় রক্ত শর্করার মাত্রা প্রতিফলিত করে।
২. প্রচলিত টেস্টগুলোর তুলনায় সুবিধা
- স্থিতিশীলতা: ফাস্টিং প্লাজমা গ্লুকোজ (FPG) বা খাবার পরবর্তী (PP) টেস্টের মতো HbA1c সাম্প্রতিক খাবার, শারীরিক পরিশ্রম বা স্বল্পমেয়াদী মানসিক চাপের দ্বারা প্রভাবিত হয় না।
- সুবিধা: এই পরীক্ষাটি দিনের যে কোনো সময় করা যায় এবং এর জন্য খালি পেটে থাকার (ফাস্টিং) প্রয়োজন নেই।
- জটিলতার সাথে সম্পর্ক: উচ্চ HbA1c মাত্রার সাথে দীর্ঘমেয়াদী ডায়াবেটিক জটিলতা যেমন— রেটিনোপ্যাথি (চোখের ক্ষতি), নেফ্রোপ্যাথি (কিডনি রোগ), এবং নিউরোপ্যাথি (স্নায়ুর ক্ষতি)-র সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে।
৩. ফলাফলের ব্যাখ্যা
ফলাফল সাধারণত শতাংশ (%) হিসেবে দেওয়া হয়। আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন (ADA) এবং WHO-এর মতে:
| ফলাফলের সীমা | শ্রেণীবিভাগ |
| ৫.৭% এর নিচে | স্বাভাবিক (Normal) |
| ৫.৭% থেকে ৬.৪% | প্রি-ডায়াবেটিস (Prediabetes) |
| ৬.৫% বা তার বেশি | ডায়াবেটিস (Diabetes) |
৪. সীমাবদ্ধতা এবং নির্ভুলতাকে প্রভাবিতকারী কারণ
বেশ কিছু শারীরিক কারণে এই পরীক্ষার ফলাফল ভুলভাবে বেশি বা কম আসতে পারে:
- লোহিত রক্তকণিকার আয়ু: যে কোনো অবস্থা যা লোহিত রক্তকণিকার (RBC) আয়ু পরিবর্তন করে (যেমন নির্দিষ্ট কিছু রক্তাল্পতা), তা ফলাফল বদলে দিতে পারে।
- রক্তাল্পতা (অ্যানিমিয়া): শরীরে আয়রনের অভাবজনিত রক্তাল্পতা থাকলে HbA1c-এর মান ভুলভাবে বেশি আসতে পারে।
- রক্তের ব্যাধি: হিমোগ্লোবিনোপ্যাথি যেমন— সিকল সেল ডিজিজ বা থ্যালাসেমিয়া গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন পরিমাপে বাধা সৃষ্টি করে।
- অন্যান্য অবস্থা: কিডনি বিকল হওয়া, লিভারের রোগ, গর্ভাবস্থা (বিশেষ করে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ট্রাইমেস্টার) এবং সাম্প্রতিক রক্ত সঞ্চালন (Blood Transfusion) ফলাফলকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
প্রশ্ন: ডায়াবেটিস নির্ণয়ে ব্যবহৃত HbA1c (গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন) টেস্টের প্রসঙ্গে নিচের বিবৃতিগুলো বিবেচনা করুন:
1. এই পরীক্ষাটি লোহিত রক্তকণিকার পরিবর্তে রক্তরসে (Plasma) লেগে থাকা গ্লুকোজ পরিমাপের মাধ্যমে গড় গ্লুকোজের মাত্রা নির্ণয় করে।
2. ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট (OGTT)-এর মতো HbA1c টেস্টের জন্য রোগীকে খালি পেটে থাকার প্রয়োজন হয় না।
3. আয়রনের অভাবজনিত রক্তাল্পতা এবং থ্যালাসেমিয়ার মতো অবস্থাগুলো HbA1c টেস্টের ভুল ফলাফল দিতে পারে।
উপরের কয়টি বিবৃতি সঠিক?
a) মাত্র একটি
b) মাত্র দুটি
c) তিনটিই সঠিক
d) কোনোটিই নয়
সমাধান:
সঠিক উত্তর: (b) (মাত্র দুটি)
• বিবৃতি 1 ভুল: HbA1c টেস্ট লোহিত রক্তকণিকার ভেতরে থাকা হিমোগ্লোবিনের সাথে যুক্ত গ্লুকোজের শতাংশ পরিমাপ করে, রক্তরসের গ্লুকোজ নয়।
• বিবৃতি 2 সঠিক: HbA1c-এর অন্যতম সুবিধা হলো এটি ৩ মাসের গড় প্রতিফলিত করে এবং সাম্প্রতিক খাবার গ্রহণের দ্বারা প্রভাবিত হয় না, তাই খালি পেটে থাকার প্রয়োজন নেই।
• বিবৃতি 3 সঠিক: হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ, গঠন বা আয়ুষ্কালকে প্রভাবিত করে এমন যে কোনো অবস্থা (যেমন রক্তাল্পতা বা থ্যালাসেমিয়া) গ্লাইকেশনের শতাংশকে ওলটপালট করে দিতে পারে, যার ফলে ভুল ফলাফল আসে।