আরবান লোকাল বডিজ (ULBs)

স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকার বা লোকাল বডিজ-এর ভূমিকা বিশ্লেষণ করুন এবং গ্রামীণ স্থানীয় সরকারের সাথে শহর স্থানীয় সরকারের একত্রীকরণের ভালো ও মন্দ দিকগুলি তুলে ধরুন। ২০২৪ (২৫০ শব্দ, GS-2 রাষ্ট্রবিজ্ঞান)

প্রেক্ষাপট:

শহর স্থানীয় সরকার (ULBs) হলো শহরাঞ্চলের স্বায়ত্তশাসনমূলক প্রতিষ্ঠান, যা ১৯৯২ সালের ৭৪তম সংবিধান সংশোধনী আইনের মাধ্যমে সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেয়েছে। এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে Part IX-A (অনুচ্ছেদ 243P–243ZG) এবং দ্বাদশ তফসিল (12th Schedule) যুক্ত করা হয়েছে। এই তফসিলে ১৮টি কার্যকরী বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যেমন—শহর পরিকল্পনা, জল সরবরাহ, পরিচ্ছন্নতা, বস্তি উন্নয়ন এবং জনস্বাস্থ্য।

ভারতে শহর স্থানীয় সরকারের (ULBs) প্রকারভেদ:

ভারতে জনবসতির আকার, জনসংখ্যা এবং আয়ের উপর ভিত্তি করে স্থানীয় সরকারগুলোকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ৭৪তম সংবিধান সংশোধনী আইন অনুযায়ী এটি মূলত তিন প্রকার, তবে আরও কিছু বিশেষ প্রশাসনিক সংস্থা রয়েছে।

. সাংবিধানিক তিনটি স্তর:

  • মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন: বড় মেট্রোপলিটন শহরগুলোর (যেমন—দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু) জন্য এটি গঠিত হয়। এরা সরাসরি রাজ্য সরকারের সাথে কাজ করে এবং এদের স্বায়ত্তশাসন ক্ষমতা অনেক বেশি।
  • মিউনিসিপ্যালিটি বা পৌরসভা: মাঝারি বা ছোট শহরগুলোর জন্য এটি গঠিত হয়। এগুলি বিভিন্ন ওয়ার্ডে বিভক্ত থাকে এবং একটি মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিল দ্বারা পরিচালিত হয়।
  • নগর পঞ্চায়েত: এটি এমন একটি এলাকা যা গ্রাম থেকে শহরে পরিবর্তিত হচ্ছে।

. বিশেষায়িত শহর সংস্থা :

ধরনউদ্দেশ্যমূল বৈশিষ্ট্য
নোটিফায়েড এরিয়া কমিটিদ্রুত উন্নত হওয়া শহর বা যেগুলি পৌরসভার শর্ত পূরণ করে না।সম্পূর্ণভাবে রাজ্য সরকার দ্বারা মনোনীত; কোনো নির্বাচন হয় না।
টাউন এরিয়া কমিটিসীমিত নাগরিক সুবিধা সম্পন্ন ছোট শহর (আলো, ড্রেনেজ)।আধা-স্বায়ত্তশাসিত; বড় গ্রাম পঞ্চায়েতের মতো কাজ করে।
ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডযেখানে সামরিক বাহিনী এবং সাধারণ মানুষ একসাথে থাকে।এটি প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থাকে।
টাউনশিপবড় বড় সরকারি সংস্থা (PSUs) দ্বারা প্রতিষ্ঠিত।কর্মীদের নাগরিক সুবিধা প্রদান করে (যেমন—স্টিল সিটি টাউনশিপ)।
পোর্ট ট্রাস্টবন্দর এলাকার ব্যবস্থাপনা ও সুরক্ষার জন্য।এটি বন্দরের বাণিজ্যিক ও নাগরিক—উভয় দিকই দেখাশোনা করে।
স্পেশাল পারপাস এজেন্সিনির্দিষ্ট কোনো কাজের জন্য তৈরি (যেমন—ডিডিএ)।একক কোনো লক্ষ্য (যেমন—আবাসন বা জল সরবরাহ) নিয়ে কাজ করে।

শহর স্থানীয় সরকারের (ULBs) শাসন কাঠামো:

ধরণ যাই হোক না কেন, বেশিরভাগ স্থানীয় সরকারের অভ্যন্তরীণ কাঠামো একই রকম:

  • কাউন্সিল: এটি একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী শাখা, যেখানে নির্বাচিত ওয়ার্ড কাউন্সিলররা থাকেন।
  • মেয়র বা চেয়ারপারসন: ইনি হলেন নামমাত্র প্রধান (রাজ্য ভেদে নির্বাচিত বা মনোনীত হন)।
  • কমিশনার: একজন আইএএস (IAS) অফিসার বা রাজ্য পর্যায়ের উচ্চপদস্থ আধিকারিক, যিনি নির্বাহী প্রধান হিসেবে সিদ্ধান্তগুলি বাস্তবায়ন করেন।

শহর স্থানীয় সরকারের (ULBs) আর্থিক ব্যবস্থা:

আয়ের উৎসসমূহ:

  • নিজস্ব কর রাজস্ব: সম্পত্তি কর (Property Tax) হলো আয়ের প্রধান উৎস। এছাড়া পেশা কর ও বিজ্ঞাপন কর রয়েছে। GST চালু হওয়ার পর ‘অক্ট্রয়’ এবং ‘এন্ট্রি ট্যাক্স’ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এদের আর্থিক স্বাধীনতা অনেকটা কমে গেছে।
  • নিজস্ব করবহির্ভূত রাজস্ব: ব্যবহারের খরচ (জল, পরিচ্ছন্নতা), বিল্ডিং লাইসেন্স ফি, মিউনিসিপ্যাল সম্পত্তির ভাড়া এবং জরিমানা।
  • আর্থিক অনুদান (Fiscal Transfers): রাজ্য ও কেন্দ্রীয় অর্থ কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে পাওয়া অর্থ। এছাড়া বিশেষ প্রকল্প (AMRUT, SBM 2.0) থেকেও গ্র্যান্ট পাওয়া যায়।
  • বাজারভিত্তিক ও উদ্ভাবনী অর্থায়ন: মিউনিসিপ্যাল বন্ড, ব্যাংক বা হুডকো (HUDCO) থেকে ঋণ এবং পিপিপি (PPP) মডেল।

প্রস্তাবিত আরবান চ্যালেঞ্জ ফান্ড (Urban Challenge Fund) শহরগুলিকে “বাজার-নির্ভর” করার চেষ্টা করছে, যেখানে শহরগুলিকে ৫০% অর্থ বন্ড বা ঋণের মাধ্যমে জোগাড় করতে হবে এবং কেন্দ্র ২৫% সহায়তা দেবে।

আর্থিক ব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যা:

ভারতের মিউনিসিপ্যাল আয় জিডিপি-র (GDP) মাত্র %, যা উন্নত দেশগুলির (৫–৮%) তুলনায় অনেক কম।

  • ভার্টিক্যাল ও হরাইজন্টাল ভারসাম্যহীনতা: স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব অনেক বেশি কিন্তু আয়ের উৎস খুব সীমিত। এছাড়া বড় শহর এবং ছোট শহরগুলোর আয়ের ক্ষমতার মধ্যেও বিশাল পার্থক্য রয়েছে।
  • উৎপাদনশীল কর হারানো: GST আসার আগে ‘অক্ট্রয়’ থেকে প্রচুর আয় হতো, যা এখন বন্ধ হয়ে গেছে।
  • নির্ভরশীলতা: নিজস্ব আয় কম থাকায় শহরগুলি রাজ্য বা কেন্দ্রের ক্ষতিপূরণের ওপর নির্ভর করে থাকে, যা অনেক সময় পেতে দেরি হয়।
  • কার্যকরী ওভারল্যাপ: রাজ্যগুলি কাজের দায়িত্ব (১২তম তফসিল অনুযায়ী) দিলেও সেই অনুযায়ী তহবিল (Fund) বা পর্যাপ্ত কর্মী (Functionaries) দেয় না।
  • বাধ্যতামূলক ব্যয়: বাজেটের সিংহভাগ (৬০%-৮০%) বেতন ও পেনশনের মতো রাজস্ব ব্যয়ে চলে যায়, ফলে নতুন পরিকাঠামো তৈরির জন্য টাকা থাকে না।
  • দুর্বল অ্যাকাউন্টিং: অনেক শহর এখনও সঠিক অডিট বা ডবলএন্ট্রি বুককিপিং করে না, যার ফলে তারা বাজার থেকে ঋণ বা বন্ড নিতে পারে না।

সরকারি উদ্যোগসমূহ:

  • আরবান চ্যালেঞ্জ ফান্ড (UCF): শহরগুলিকে ঋণের যোগ্য বা “ব্যাঙ্কবল” করার জন্য ১ লক্ষ কোটি টাকার প্রকল্প। শহর বাজার থেকে ৫০% অর্থ জোগাড় করলে কেন্দ্র ২৫% টাকা দেবে।
  • ক্রেডিট রিপেমেন্ট গ্যারান্টি: ছোট শহরগুলিকে বাজার থেকে ঋণ নিতে সহায়তা করার জন্য ৫,০০০ কোটি টাকার গ্যারান্টি ফান্ড।
  • AMRUT 2.0: ২০২৬ সালের মধ্যে শহরগুলিকে জল সুরক্ষিত করার লক্ষ্য। এর মধ্যে ‘জল সরবরাহ’ এবং ‘নিকাশি ব্যবস্থা’ উন্নত করা অন্তর্ভুক্ত।
  • SBM-Urban 2.0: শহরগুলিকে আবর্জনা মুক্ত করার লক্ষ্য। এর মূল কাজ হলো বর্জ্য পৃথকীকরণ এবং পুরনো ল্যান্ডফিল পরিষ্কার করা।
  • PM e-Bus Sewa: পরিবেশবান্ধব যাতায়াতের জন্য পিপিপি (PPP) মডেলে ১০,০০০ ইলেকট্রিক বাস নামানোর পরিকল্পনা।
  • ডিজিটাল ও সংস্কারমূলক পদক্ষেপ: স্মার্ট সিটি মিশনের সময়সীমা বাড়ানো, TULIP ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে মেধাবী তরুণদের নিয়োগ এবং ডিজিটাল ল্যান্ড রেকর্ড তৈরি।

ভবিষ্যৎ পথ:

  • আর্থিক স্বায়ত্তশাসন: রাজ্যগুলিকে কেবল নিয়ন্ত্রণ না করে শহরগুলিকে নিজস্ব কর আদায়ের ক্ষমতা দিতে হবে।
  • প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি: দ্রুত ডবলএন্ট্রি অ্যাকাউন্টিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে যাতে বিনিয়োগকারীরা ভরসা পায়।
  • সেবা ও আয়ের ভারসাম্য: কেবল লাভজনক প্রজেক্ট নয়, বস্তি উন্নয়ন বা গরিবদের সেবার মতো কাজগুলোতেও নজর দিতে হবে।
  • মাস্টার প্ল্যান শক্তিশালী করা: শহর পরিকল্পনাকে শক্তভাবে কার্যকর করতে হবে যাতে অবৈধ নির্মাণ রোধ করা যায়।
  • পারফরম্যান্স ভিত্তিক গ্র্যান্ট: যারা ভালো কাজ করবে (যেমন—বর্জ্য ব্যবস্থাপনা), তাদের বেশি অনুদান দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
  • দুর্বল শ্রেণির সুরক্ষা: শহর আধুনিকীকরণের সময় গরিব মানুষ বা ভাড়াটেদের ওপর যাতে বাড়তি চাপের সৃষ্টি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

উপসংহার:

ভারতের শহরগুলির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শহর স্থানীয় সরকারগুলোকে কেবল অনুদান-নির্ভর না রেখে আর্থিক স্বয়ম্ভর কেন্দ্রে পরিণত করার ওপর। ডিজিটাল শাসনব্যবস্থা এবং স্বচ্ছ হিসাবরক্ষণের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুললেই শতকোটি মানুষের জন্য উন্নত ও নিরাপদ শহর তৈরি করা সম্ভব হবে।