প্রেক্ষাপট
- সম্প্রতি, ২০২৬ সালের মার্চের শুরুতে ইরান এবং ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থা মারাত্মক অস্থিরতার মুখে পড়েছে। এই সংঘাত এখন আর কেবল পরোক্ষ যুদ্ধের (proxy warfare) মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং সরাসরি একে অপরের ভূখণ্ড এবং হরমুজ প্রণালীর মতো কৌশলগত সামুদ্রিক পথে আক্রমণের রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই উত্তেজনা “যুদ্ধকালীন ঝুঁকির সারচার্জ” (War Risk Surcharges) বাড়িয়ে দিয়েছে এবং পারস্য উপসাগরের জাহাজ চলাচল ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। এর ফলে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (GCC) ভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যের গতি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
- বর্তমানে চলমান এই সংঘাত জিসিসি (GCC) এবং ইরানের সাথে ভারতের বার্ষিক প্রায় ১৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্যে বহুমুখী হুমকি সৃষ্টি করেছে।
১. লজিস্টিকস এবং খরচের ওপর সাধারণ প্রভাব
- জাহাজ ভাড়া এবং বিমা: জাহাজ কোম্পানিগুলো মাল পরিবহনের ভাড়া ৩০-৫০% বাড়িয়ে দিয়েছে। ইন্ডিয়ান রাইস এক্সপোর্টার্স ফেডারেশন বিমার অতিরিক্ত ঝুঁকির কারণে সদস্যদের সিআইএফ (CIF – খরচ, বিমা এবং ভাড়া) চুক্তি এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।
- হরমুজ প্রণালী এবং বাব আল-মানদেব: এই অঞ্চলগুলোতে অস্থিরতার কারণে জাহাজগুলো কেপ অফ গুড হোপ (আফ্রিকার নিচ দিয়ে) ঘুরে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এতে যাতায়াতের সময় প্রায় দুই সপ্তাহ বেড়ে যাচ্ছে এবং লাভের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে।
- পেমেন্ট এবং নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বাধা: ইরানের ওপর ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞা এবং ওই অঞ্চলে কড়া নজরদারির (KYC) কারণে লেনদেনের টাকা পেতে মারাত্মক দেরি হচ্ছে।
২. ভারতের বিভিন্ন রপ্তানি খাতের ওপর প্রভাব
২.১ কৃষি রপ্তানি (বাসমতী চাল)
ভারত বিশ্বের বৃহত্তম চাল রপ্তানিকারক এবং মধ্যপ্রাচ্য (সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইয়েমেন) ভারতের মোট বাসমতী চাল রপ্তানি মূল্যের প্রায় ৫০% (৫০,০০০ কোটি টাকা) দখল করে আছে।
- দাম হ্রাস: ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে উত্তেজনা বাড়ার পর জাহাজ চলাচল থমকে যাওয়ায় ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে চালের দাম ৫-৬% কমে গেছে।
- ইরান পরিস্থিতি: ইরানে ভারতের রপ্তানির (প্রায় ১.২৪ বিলিয়ন ডলার) বড় অংশ হলো চাল, চা এবং চিনি। আকাশপথ বন্ধ থাকা এবং বন্দরে জটলা সৃষ্টির কারণে বর্তমানে এই রপ্তানি বাণিজ্য “অলাভজনক” হয়ে পড়েছে।
২.২ পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানি
ভারত তার জামনগর, ভাদিনার এবং পারাদ্বীপের বিশাল শোধনাগার ক্ষমতার মাধ্যমে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ করে।
- ঝুঁকিতে থাকা পরিমাণ: প্রতিদিন প্রায় ৭৪,০০০ ব্যারেল পরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়।
- অদ্ভুত পরিস্থিতি: তেলের দাম বাড়লে তাত্ত্বিকভাবে শোধনাগারগুলোর লাভ হওয়ার কথা থাকলেও, পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত খরচের কারণে সেই লাভ শেষ হয়ে যাচ্ছে।
২.৩ রত্ন, অলঙ্কার এবং হীরা
এই খাতটি বিশ্বব্যাপী পুন-রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে দুবাইয়ের ওপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল।
- সরবরাহ ব্যবস্থা: ভারতের মোট সোনা আমদানির প্রায় ৫০-৬০% দুবাই হয়ে আসে।
- উৎপাদন ঝুঁকি: আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সুরাট এবং মুম্বাইয়ের পলিশিং কেন্দ্রগুলোতে কাঁচা হীরা আসার পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
২.৪ ওষুধ শিল্প (Pharmaceuticals)
ভারতকে বিশ্বের “ওষুধের দোকান” বলা হয়, কিন্তু এই যুদ্ধ এপিআই (ওষুধ তৈরির কাঁচামাল) সরবরাহে চাপ সৃষ্টি করছে।
- দ্বিমুখী সমস্যা: চীন থেকে আনা এপিআই ভারতে প্রক্রিয়াজাত করে মধ্যপ্রাচ্য ও ইরানে রপ্তানি করা হয়। বর্তমান অস্থিরতায় এই পুরো প্রক্রিয়ার খরচ ও সময় উভয়ই বেড়ে গেছে।
২.৫ বস্ত্র, ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য এবং রাসায়নিক
- বস্ত্র শিল্প: ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় পণ্য পাঠানোর খরচ আকাশচুম্বী হওয়ায় তিরুপুর এবং সুরাটের উৎপাদকরা লোকসানের মুখে পড়েছেন।
- রাসায়নিক: অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ায় কাঁচামালের খরচ বাড়ছে, আবার জাহাজ ভাড়াও বেশি দিতে হচ্ছে—ফলে রপ্তানিকারকদের মুনাফা কমে যাচ্ছে।
৩. প্রধান পণ্য এবং বর্তমান অবস্থার সারাংশ
| উপসাগরীয় দেশ | প্রধান রপ্তানি পণ্য | বর্তমান অবস্থা ও প্রভাব |
| সংযুক্ত আরব আমিরাত | অলঙ্কার, পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম | বিঘ্নিত: আকাশপথ বন্ধ ও উচ্চ বিমা খরচের কারণে দুবাই হাবের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। |
| সৌদি আরব | বাসমতী চাল, ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য | স্থবির: নতুন চুক্তি করা বন্ধ আছে; ভারতীয় বন্দরগুলোতে প্রচুর পণ্য জমে গেছে। |
| ইরান | চা, চাল, ওষুধ | সংকটজনক: নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের কারণে বাণিজ্য প্রায় বন্ধের পথে। |
| ওমান | খনিজ, বস্ত্র, ইঞ্জিনিয়ারিং | কৌশলগত কেন্দ্র: ডুকম (Duqm)-এর মতো বন্দরগুলো বিকল্প পথ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। |
Q: ২০২৬ সালের পশ্চিম এশীয় সংকটের মাঝে ভারতের বাণিজ্য পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে নিচের বিবৃতিগুলো বিবেচনা করুন:
1. জিসিসি (GCC) দেশসমূহ এবং ইরান যৌথভাবে ভারতের মোট বাসমতী চাল রপ্তানি মূল্যের প্রায় অর্ধেকের যোগান দেয়।
2. সিআইএফ (CIF) চুক্তির অধীনে, উপসাগরীয় বন্দরগুলোতে পণ্য পৌঁছানো পর্যন্ত সামুদ্রিক বিমার খরচ বাড়ার ঝুঁকি ভারতীয় রপ্তানিকারককে বহন করতে হয়।
3. লোহিত সাগরের বদলে কেপ অফ গুড হোপ রুট দিয়ে বস্ত্র রপ্তানি পাঠালে সাধারণত যাতায়াতের সময় প্রায় এক সপ্তাহ বেড়ে যায়।
ওপরের কতগুলো বিবৃতি সঠিক?
(a) কেবল একটি
(b) কেবল দুটি
(c) তিনটিই সঠিক
(d) কোনটিই নয়
সমাধান: উত্তর: (b)
• বিবৃতি 1 সঠিক: সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, ইউএই এবং ইয়েমেন ভারতের বাসমতী চাল রপ্তানি মূল্যের (প্রায় ৫০,০০০ কোটি টাকা) প্রায় ৫০% বহন করে।
• বিবৃতি 2 সঠিক: সিআইএফ চুক্তিতে বিক্রেতা (রপ্তানিকারক) খরচ, বিমা এবং ভাড়ার জন্য দায়ী থাকেন। তাই বিমার খরচ বাড়লে রপ্তানিকারকের লাভ সরাসরি কমে যায়।
• বিবৃতি 3 ভুল: কেপ অফ গুড হোপ দিয়ে ঘুরে গেলে যাতায়াতে প্রায় দুই সপ্তাহ (এক সপ্তাহ নয়) সময় বেশি লাগে, যা খরচ অনেক বাড়িয়ে দেয়।