গোপনীয়তা বনাম স্বচ্ছতার দ্বন্দ্ব: RTI আইন ও DPDP আইনের ভারসাম্য

“DPDP আইন, ২০২৩-এর ‘বৈধ ব্যবহার’ (Legitimate Uses) কাঠামো এবং RTI আইনের গুরুত্ব হ্রাস একত্রে একটি ‘একমুখী আয়না’ (One-way Mirror) তৈরি করেছে, যা গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতাকে ক্ষুণ্ণ করে।” — জানার অধিকার এবং গোপনীয়তার অধিকারের মধ্যে উদীয়মান সাংবিধানিক সংঘাতের আলোকে এই বিবৃতিটি সমালোচনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করুন। (২৫০ শব্দ, ১৫ নম্বর, GS-২, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও শাসনপ্রণালী)

প্রেক্ষাপট

  • সম্প্রতি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ডিজিটাল পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন (DPDP) আইন, ২০২৩ থেকে উদ্ভূত “সাংবিধানিক সংবেদনশীলতা” নিরসনের জন্য একগুচ্ছ আবেদন একটি সংবিধান বেঞ্চে পাঠিয়েছে।
  • এই আবেদনগুলোতে তথ্য অধিকার (RTI) আইন, ২০০৫-এর ধারা ৮(১)(জে) সংশোধনীকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে, যাকে সমালোচকরা গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতার ওপর এক “মরণ আঘাত” হিসেবে অভিহিত করেছেন।
  • ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত মন্তব্য করেছেন যে, আদালতের এখন “ব্যক্তিগত তথ্য”-এর সীমানা আইনিভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে গোপনীয়তার অধিকারের দোহাই দিয়ে নাগরিকের জানার মৌলিক অধিকারকে অন্যায়ভাবে স্তব্ধ না করা হয়।

পটভূমি: আইনি কাঠামোর বিবর্তন

বর্তমান আইনি লড়াইটি দুটি ভিন্ন অধিকারের মধ্যে মৌলিক সংঘাতের প্রতিফলন, যা ভারতের সাংবিধানিক কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

১. RTI আইন, ২০০৫: “সূর্যালোক” আইন

RTI আইন কেবল কোনো প্রশাসনিক উপহার ছিল না; এটি সংবিধানে বিদ্যমান একটি অধিকারের আনুষ্ঠানিক সংকলন ছিল।

  • সাংবিধানিক ভিত্তি: “জানার অধিকার” (অনুচ্ছেদ ১৯)
    • স্টেট অফ ইউপি বনাম রাজ নারায়ণ (১৯৭৫): এই ঐতিহাসিক মামলায় বিচারপতি ম্যাথু পর্যবেক্ষণ করেছিলেন: “আমাদের মতো একটি দায়িত্বশীল সরকারে… এই দেশের জনগণের প্রতিটি সরকারি কাজ এবং জনস্বার্থে করা সমস্ত কিছু জানার অধিকার রয়েছে।”
    • যুক্তি: আদালত রায় দিয়েছিল যে, নাগরিকদের কাছে তথ্য না থাকলে বাক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা (অনুচ্ছেদ ১৯(১)(এ)) অর্থহীন। তথ্য গোপন রাখলে নাগরিকরা কোনো মতামত দিতে বা সরকারকে দায়বদ্ধ করতে পারে না। তাই RTI হলো অনুচ্ছেদ ১৯-এর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
    • দর্শন: এটি শাসনব্যবস্থাকে “অফিসিয়াল সিক্রেসি” থেকে “পাবলিক ট্রাস্ট”-এর দিকে নিয়ে যায়। অর্থাৎ, তথ্য জনগণের সম্পদ এবং রাষ্ট্র কেবল তার রক্ষক।
    • আন্দোলন: ১৯৯০-এর দশকে অরুণা রায়ের নেতৃত্বে মজদুর কিষাণ শক্তি সংগঠন (MKSS) রাজস্থানে একটি ব্যাপক আন্দোলন শুরু করে। তাদের বিখ্যাত স্লোগান ছিল: “হামারা পয়সা, হামারা হিসাব”
  • মূল ধারা ৮(১)(জে): একটি সুষম ছাড় এটি ছিল তথ্যের সুরক্ষাকবচ, যা কেবল তখনই তথ্য প্রকাশে বাধা দিত যদি:
    • তথ্যের সাথে কোনো জনস্বার্থ বা সরকারি কাজের সম্পর্ক না থাকে।
    • তথ্য প্রকাশ করলে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত পরিসরে অহেতুক হস্তক্ষেপ হয়।
  • “জনস্বার্থ” অগ্রাধিকার (Public Interest Override): তথ্য ব্যক্তিগত হলেও, যদি জনতথ্য কর্মকর্তা (PIO) মনে করতেন যে “বৃহত্তর জনস্বার্থ” ব্যক্তিগত ক্ষতির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তবে সেই তথ্য প্রকাশ করা যেত। এমনকি আইনে স্পষ্টভাবে বলা ছিল: যে তথ্য সংসদ বা রাজ্য বিধানসভাকে দিতে অস্বীকার করা যায় না, তা কোনো নাগরিককেও অস্বীকার করা যাবে না।

২. DPDP আইন, ২০২৩: গোপনীয়তার ঢাল

এই আইনটি ডিজিটাল যুগে “তথ্যগত গোপনীয়তা” (Informational Privacy) সুরক্ষায় একটি নতুন স্তর যুক্ত করেছে।

  • সাংবিধানিক ভিত্তি: “গোপনীয়তার অধিকার” (অনুচ্ছেদ ২১)
    • পুট্টস্বামী মামলা (২০১৭): ৯ বিচারপতির একটি বেঞ্চ গোপনীয়তাকে অনুচ্ছেদ ২১-এর অধীনে একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করে।
    • তিনটি শর্ত (Three-fold Test): আদালত জানিয়েছে সরকার কেবল তখনই গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ করতে পারে যদি তা তিনটি শর্ত পূরণ করে: বৈধতা (লিখিত আইন), ন্যায়সঙ্গত উদ্দেশ্য (জাতীয় নিরাপত্তা বা জনকল্যাণ), এবং আনুপাতিকতা (উদ্দেশ্য পূরণে ন্যূনতম হস্তক্ষেপ)।
  • সংশোধনী (ধারা ৪৪(৩)): “সার্বিক নিষেধাজ্ঞা”
    • DPDP আইনটি RTI আইনের ৮(১)(জে) ধারা থেকে “জনস্বার্থ” সংক্রান্ত ভারসাম্যমূলক মানদণ্ডটি মুছে দিয়েছে।
    • এর পরিবর্তে একটি কঠোর নিয়ম আনা হয়েছে: যে কোনো “ব্যক্তিগত তথ্য” এখন প্রকাশের আওতামুক্ত।
    • সমস্যা: “জনস্বার্থ” রক্ষার সুযোগটি সরিয়ে দেওয়ার ফলে এটি ‘আনুপাতিকতা তত্ত্ব’ (Proportionality Doctrine) লঙ্ঘন করে। এটি গোপনীয়তাকে এমন এক ঢাল হিসেবে তৈরি করে, যা দুর্নীতি ফাঁস বা সরকারি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ বিচারবিভাগীয় নজির: সি.পি.আই.ও (CPIO) বনাম সুভাষ চন্দ্র আগরওয়াল (২০১৯)

  • সুপ্রিম কোর্ট এর আগে রায় দিয়েছিল যে, স্বচ্ছতা এবং গোপনীয়তা হলো সমমর্যাদার অধিকার। আদালত জানিয়েছিল যে, বিচারকদের সম্পত্তির বিবরণ বা নিয়োগ সংক্রান্ত নথি প্রকাশ করা যেতে পারে যদি তা কোনো ন্যায়সঙ্গত জনস্বার্থ পূরণ করে।
  • ২০২৩ সালের সংশোধনীটি ‘জনস্বার্থ’ (Public Interest)-এর এই পথটিকে সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে দিয়ে পূর্ববর্তী বিচারবিভাগীয় নজিরকে অগ্রাহ্য করেছে। এর ফলে সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে জড়িত বিষয়গুলোতে RTI আইন কার্যত ‘অচল’ হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

একটি শক্তিশালী গণতন্ত্রে RTI আইনের গুরুত্ব

  • অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের সুরক্ষা: স্বচ্ছতা হলো একটি “সদর্থক সরকারের” ভিত্তি। RTI আইন নিশ্চিত করে যে ‘সার্বভৌম’ (জনগণ) যেন কার্যকরভাবে ‘এজেন্ট’ (রাষ্ট্র)-এর ওপর নজরদারি চালাতে পারে। এটি গণতন্ত্রকে কেবল ভোটদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দৈনন্দিন তদারকির স্তরে নিয়ে যায়।
  • সামাজিক অডিট ও জনকল্যাণমূলক পরিষেবা: প্রান্তিক মানুষের জন্য রেশন (PDS) বণ্টন, MGNREGA-র মজুরি এবং পেনশনের তালিকা যাচাই করার এক অপরিহার্য হাতিয়ার হলো RTI। ভুয়া সুবিধাভোগী (Ghost Beneficiaries) রুখতে এই তালিকায় ব্যক্তিগত তথ্য থাকা জরুরি, যা RTI-এর মাধ্যমে স্বচ্ছ রাখা সম্ভব হয়।
  • দুর্নীতিবিরোধী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো: সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পত্তি, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং শৃঙ্খলামূলক রেকর্ডের ওপর নজরদারি চালানোর সুযোগ দেয় এই আইন। এটি সরকারি পদের সততা বজায় রাখতে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রুখতে সাহায্য করে।
  • সততা নিশ্চিতকরণে RTI ও ই-গভর্ন্যান্সের সাফল্য: ২০০৫ সাল থেকে RTI অসংখ্য বড় দুর্নীতি ফাঁস করেছে। যেমন:
    • আদর্শ হাউজিং সোসাইটি কেলেঙ্কারি: কার্গিল যুদ্ধের বিধবাদের জন্য বরাদ্দ আবাসন কীভাবে প্রভাবশালীরা দখল করেছিল, তা RTI-এর মাধ্যমেই সামনে আসে।
    • ২জি স্পেকট্রাম ও কমনওয়েলথ গেমস কেলেঙ্কারি: টেলিকম স্পেকট্রাম বণ্টনে অনিয়ম এবং সরকারি তহবিলের বিশাল ক্ষতি এই আইনের সাহায্যেই উন্মোচিত হয়।
    • ব্যাপম (Vyapam) কেলেঙ্কারি: মধ্যপ্রদেশের চিকিৎসা শিক্ষা ও নিয়োগে বড় ধরনের জালিয়াতি ফাঁস করতে RTI আবেদনগুলো বড় ভূমিকা পালন করেছিল।
  • ই-গভর্ন্যান্স ও RTI-এর পরিপূরকতা: RTI হলো তথ্যের ‘চাহিদা’ (নাগরিকের চাওয়া), আর ই-গভর্ন্যান্স হলো তথ্যের ‘যোগান’ (সরকারের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ)। ‘ভূমি’ (ডিজিটাইজড রেকর্ড), GeM (স্বচ্ছ কেনাকাটা) এবং DBT (সরাসরি অর্থ হস্তান্তর)-এর মতো প্রকল্পগুলো মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে।

RTI-DPDP সংঘাতের ফলে উদ্ভূত চ্যালেঞ্জসমূহ

  • ‘লেজিটিমেট ইউজ’ (Legitimate Uses) বা বৈধ ব্যবহারের বৈপরীত্য: DPDP আইনের ৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী, জনকল্যাণের জন্য সরকার নাগরিকদের সম্মতি ছাড়াই তথ্য ব্যবহার করতে পারবে। কিন্তু RTI সংশোধনী নাগরিকদের সরকারি তথ্য পেতে বাধা দিচ্ছে। এতে একটি ‘একমুখী আয়না’ (One-way Mirror) তৈরি হচ্ছে—যেখানে রাষ্ট্র নাগরিকের ওপর নজর রাখতে পারবে, কিন্তু নাগরিক রাষ্ট্রের কাজ তদারকি করতে পারবে না।
  • সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর বিরূপ প্রভাব: অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় তথ্য সংগ্রহকারী সাংবাদিকদের ‘ডেটা ফিকুশিয়ারি’ (Data Fiduciaries) হিসেবে চিহ্নিত করা হতে পারে। DPDP আইনের কঠোর নিয়ম লঙ্ঘনে ২৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান সাংবাদিকদের সরকারি প্রেস রিলিজের ওপর নির্ভরশীল করে তুলতে পারে।
  • আনুপাতিকতা পরীক্ষার (Proportionality Test) ব্যর্থতা: সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশানুসারে, কোনো মৌলিক অধিকার খর্ব করতে হলে তা হতে হবে “ন্যূনতম হস্তক্ষেপকারী”। কিন্তু ‘জনস্বার্থের অগ্রাধিকার’ (Public Interest Override) মুছে ফেলা যুক্তিবিরোধী; কারণ এটি জানার অধিকার (অনুচ্ছেদ ১৯) এবং গোপনীয়তার অধিকার (অনুচ্ছেদ ২১)-এর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।

ভবিষ্যতের পথনির্দেশ: স্বচ্ছতা ও গোপনীয়তার ভারসাম্য পুনরুদ্ধার

  • অনুচ্ছেদ ১৯ এবং অনুচ্ছেদ ২১-এর মধ্যে সমন্বয়: আমাদের ‘জানার অধিকার’ এবং ‘গোপনীয়তার অধিকার’-এর মধ্যে একটি ভারসাম্য প্রয়োজন। উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ এবং কোনোটিকেই অন্যটির অধীনস্থ করা উচিত নয়।
    • সংবিধান বেঞ্চের উচিত ২০১৯ সালের ‘সেন্ট্রাল পাবলিক ইনফরমেশন অফিসার’ (CPIO) মামলার রায়ের চেতনাকে বজায় রাখা, যেখানে বলা হয়েছিল যে বিচারবিভাগীয় স্বাধীনতা ও গোপনীয়তা স্বচ্ছতার প্রয়োজনের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। একইভাবে, আদালত ‘ব্যক্তিগত তথ্য’ আসলে কী, তা নির্ধারণ করতে পারে।
  • তথ্য অনুসন্ধানকারীদের সুরক্ষা: অধিকারকর্মীদের শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে ‘হুইসেলব্লোয়ার্স প্রোটেকশন অ্যাক্ট, ২০১৪’ দ্রুত কার্যকর করতে হবে।
  • সাংবাদিকদের জন্য আইনি সুরক্ষা: ভারতের উচিত ইউরোপীয় ইউনিয়নের GDPR মডেলের মতো বিধান গ্রহণ করা, যেখানে সাংবাদিকতার উদ্দেশ্যে তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সংবাদমাধ্যমগুলো আর্থিক ক্ষতির ভয় ছাড়াই তাদের ‘ওয়াচডগ’ (Watchdog) ভূমিকা পালন করতে পারবে।
  • ARC সংস্কার বাস্তবায়ন: আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা ভিতর থেকে পরিবর্তন করতে দ্বিতীয় প্রশাসনিক সংস্কার কমিশনের (2nd ARC) পরামর্শ অনুযায়ী ঔপনিবেশিক আমলের ‘গোপনীয়তার শপথ’-এর পরিবর্তে ‘স্বচ্ছতার শপথ’ গ্রহণ করার এখনই উপযুক্ত সময়।

উপসংহার

একটি প্রাণবন্ত গণতন্ত্রে তথ্য হলো অক্সিজেনের মতো। ডিজিটাল সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গিয়ে যেন স্বচ্ছতার পথ রুদ্ধ না হয়। একটি ‘সচেতন নাগরিক সমাজ’ (Informed Citizenry) গড়ে তোলার জন্য RTI এবং DPDP আইনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং এটি একটি সুস্থ গণতন্ত্রের নৈতিক দাবি। সুপ্রিম কোর্টের আসন্ন রায় এই দুই অধিকারের একটি সুন্দর সহাবস্থান নিশ্চিত করবে—এটাই কাম্য।

Latest Articles