ভারতের বিচার বিভাগে বৈচিত্র্যের অপরিহার্যতা

“বিচারবিভাগের স্বাধীনতা এবং বিচারবিভাগীয় বৈচিত্র্য একে অপরের বিরোধী নয়, বরং পরিপূরক সাংবিধানিক মূল্যবোধ।” ভারতের বিচারবিভাগীয় নিয়োগের প্রেক্ষাপটে এটি আলোচনা করুন। (২৫০ শব্দ, ১৫ নম্বর – GS-2, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও শাসনপ্রণালী)

প্রেক্ষাপট

  • সম্প্রতি ডিএমকে (DMK) সাংসদ তথা প্রবীণ আইনজীবী পি. উইলসন রাজ্যসভায় একটি বেসরকারি সংবিধান সংশোধনী বিল পেশ করেছেন। এই বিলটি বিচারবিভাগীয় নিয়োগের ক্ষেত্রে সামাজিক বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা এবং সুপ্রিম কোর্টের আঞ্চলিক বেঞ্চ স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার ওপর পুনরায় আলোকপাত করেছে।
  • এই উদ্যোগটি মূলত কোলেজিয়াম ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতাগুলি দূর করার চেষ্টা করে। বর্তমান ব্যবস্থা ভারতের সামাজিক বৈচিত্র্য প্রতিফলিত করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, বিশেষ করে তফসিলি জাতি (SC), তফসিলি উপজাতি (ST), অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি (OBC), নারী এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বের অভাবের বিষয়টি এখানে গুরুত্ব পেয়েছে।

পটভূমি: বিচারবিভাগীয় নিয়োগের সাংবিধানিক বিধি

ভারতীয় সংবিধান বিচারবিভাগীয় নিয়োগের ক্ষেত্রে এমন একটি কাঠামো তৈরি করেছে যা শাসনবিভাগ (Executive) এবং বিচারবিভাগের (Judiciary) ভূমিকার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে।

  • ধারা ১২৪: সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা ভারতের প্রধান বিচারপতির (CJI) সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হন। এখানে বিচারবিভাগের মতামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
  • ধারা ২১৭: হাইকোর্টের বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতি (CJI), সংশ্লিষ্ট হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং রাজ্যপালের সঙ্গে পরামর্শ করা বাধ্যতামূলক, যা বহু-পক্ষীয় অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করে।
  • ধারা ১৩০: সুপ্রিম কোর্টের প্রধান আসন দিল্লিতে অবস্থিত হলেও, প্রধান বিচারপতি (CJI) কেন্দ্র সরকারের অনুমোদন নিয়ে ভারতের অন্য যে কোনো স্থানে সুপ্রিম কোর্টের আসন বা আঞ্চলিক বেঞ্চ নির্দিষ্ট করতে পারেন। এর জন্য নতুন কোনো সংবিধান সংশোধনীর প্রয়োজন নেই।
  • ধারা ১৬: এটি সরকারি চাকরিতে সমান সুযোগ এবং সংরক্ষণের অধিকার প্রদান করে। এই নীতিটি সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারবিভাগেও প্রয়োগ করা সম্ভব, যাতে সেখানে সঠিক সামাজিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা যায়।

নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিবর্তন: কোলেজিয়াম ব্যবস্থা

. কোলেজিয়াম ব্যবস্থার ঐতিহাসিক বিবর্তন

  • ১৯৮০ দশকের আগে: মূল সাংবিধানিক নকশা অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শের পর নিয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিত শাসনবিভাগ।
  • প্রথম বিচারক মামলা (১৯৮১): জনগণের কাছে দায়বদ্ধতার যুক্তিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে শাসনবিভাগের প্রাধান্য বজায় রাখা হয়।
  • দ্বিতীয় বিচারক মামলা (১৯৯৩): আগের রায় বাতিল করে কোলেজিয়াম ব্যবস্থা গঠন করা হয়। সুপ্রিম কোর্টে নিয়োগের জন্য প্রধান বিচারপতি + জন প্রবীণতম বিচারপতি এবং হাইকোর্টের জন্য প্রধান বিচারপতি + জন প্রবীণতম বিচারপতির সমন্বয়ে এই ব্যবস্থা গঠিত হয়, যেখানে বিচারবিভাগের স্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
  • তৃতীয় বিচারক মামলা (১৯৯৮): কোলেজিয়ামের ভূমিকা আরও বিস্তৃত করা হয়। সরকার একবার আপত্তি জানাতে পারে, কিন্তু কোলেজিয়াম সেই সুপারিশ পুনরায় পাঠালে তা মানা সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক। এর ফলে নিয়োগে বিচারবিভাগের চূড়ান্ত আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

. কোলেজিয়াম ব্যবস্থার কার্যপ্রণালী

  • কার্যপদ্ধতি: মেধা, জ্যেষ্ঠতা এবং কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে কোলেজিয়াম নাম প্রস্তাব করে এবং তা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠায়। সরকার পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করতে পারলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কোলেজিয়ামের হাতেই থাকে।
  • বর্তমান পরিস্থিতি (২০২৬): বর্তমানে সুপ্রিম কোর্ট তার পূর্ণ অনুমোদিত ৩৪ জন বিচারপতির শক্তি নিয়ে কাজ করছে। তবে ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী হাইকোর্টগুলিতে ৩৩১টি শূন্যপদ রয়ে গেছে, যা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতাকে প্রকট করে।
  • স্বচ্ছতার প্রচেষ্টা: স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্ট সরকারকে একটি নতুন মেমোরেন্ডাম অফ প্রসিডিউর (MoP) তৈরির নির্দেশ দেয়। ২০১৭ সালে এটি চূড়ান্ত হলেও সরকার তা গ্রহণ করেনি।

. কোলেজিয়াম ব্যবস্থাকে সংজ্ঞায়িত করা গুরুত্বপূর্ণ রায়সমূহ

  • বিচারক মামলাসমূহ (Judges Cases): কোলেজিয়াম ব্যবস্থাকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো (Basic Structure) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যা বিচারবিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে।
  • চতুর্থ বিচারক মামলা (২০১৫): ২০১৪ সালের ৯৯তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে জাতীয় বিচারবিভাগীয় নিয়োগ কমিশন (NJAC) গঠন করা হয়েছিল। এতে প্রধান বিচারপতি, ২ জন প্রবীণ বিচারপতি, কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী এবং ২ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি থাকার কথা ছিল।
  • সুপ্রিম কোর্টের রায়: ৫:০ রায়ে সুপ্রিম কোর্ট এই কমিশনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে বাতিল করে। আদালতের মতে, এটি বিচারবিভাগের স্বাধীনতা ও মৌলিক কাঠামোকে লঙ্ঘন করেছে।
  • যুক্তি: আইনমন্ত্রী ও অ-বিচারবিভাগীয় সদস্যদের উপস্থিতিতে শাসনবিভাগের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল; ফলে পুনরায় কোলেজিয়াম ব্যবস্থা ফিরে আসে।

বিচারবিভাগে বৈচিত্র্য আনার লক্ষ্যে বেসরকারি বিল

এই বিলটি মেধার সঙ্গে আপস না করেই বিচারবিভাগে বৈচিত্র্য এবং বিচারে সর্বজনীন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেয়।

  • বৈচিত্র্যের ম্যান্ডেট: সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট নিয়োগের ক্ষেত্রে জনসংখ্যার অনুপাত অনুযায়ী তফসিলি জাতি (SC), তফসিলি উপজাতি (ST), অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি (OBC), নারী এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।
  • সময়সীমা: কোলেজিয়ামের সুপারিশ পাওয়ার পর কেন্দ্র সরকারকে সর্বোচ্চ ৯০ দিনের মধ্যে তা বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া।
  • আঞ্চলিক বেঞ্চ: দিল্লি (প্রধান বেঞ্চ) ছাড়াও কলকাতা, মুম্বাই এবং চেন্নাইয়ে সুপ্রিম কোর্টের স্থায়ী আঞ্চলিক বেঞ্চ স্থাপন করা।
  • এক্টিয়ার: এই আঞ্চলিক বেঞ্চগুলি সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণ এক্টিয়ার বা ক্ষমতা প্রয়োগ করবে; কেবল সাংবিধানিক বিষয়গুলি দিল্লির মূল ‘কনস্টিটিউশন বেঞ্চ’-এর জন্য সংরক্ষিত থাকবে।
  • যৌক্তিকতা: এটি বিচারে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার উন্নত করবে, দিল্লির ওপর অত্যধিক নির্ভরতা কমাবে এবং ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা দূর করবে। উল্লেখ্য যে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টে ৯০,০০০এর বেশি মামলা বকেয়া রয়েছে।

ভারতের বিচারবিভাগে বৈচিত্র্যের প্রয়োজনীয়তা

. দীর্ঘস্থায়ী প্রতিনিধিত্বের অভাব দূরীকরণ

ভারতের বহুমাত্রিক সমাজের প্রতিফলন বিচারবিভাগে থাকা আবশ্যক, কিন্তু বর্তমান তথ্য এক হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরে:

  • ২০১৮২০২৪ হাইকোর্ট নিয়োগ (৭১৫ জন বিচারক): মাত্র ২২ জন তফসিলি জাতি (SC), ১৬ জন তফসিলি উপজাতি (ST), ৮৯ জন অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি (OBC) এবং ৩৭ জন সংখ্যালঘু নিযুক্ত হয়েছেন (অর্থাৎ মাত্র প্রায় ২৩% প্রান্তিক গোষ্ঠী থেকে)।
  • সুপ্রিম কোর্ট: ১৯৫০ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট ২৮৭ জন বিচারপতির মধ্যে মাত্র ১১ জন মহিলা (~৮%)। আজও কোনও SC/ST মহিলা বিচারপতি সুপ্রিম কোর্টে নিযুক্ত হননি এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু থেকে মাত্র একজন নারী নিযুক্ত হয়েছিলেন (বিচারপতি ফাতিমা বিবি)।
  • বার (Bar) থেকে সরাসরি নিয়োগ: সরাসরি আইনজীবীদের মধ্য থেকে সুপ্রিম কোর্টে বিচারক হওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপক লিঙ্গ বৈষম্য দেখা যায়—যেখানে জন পুরুষ সরাসরি নিযুক্ত হয়েছেন, সেখানে মহিলা মাত্র জন (বিচারপতি ইন্দু মালহোত্রা)।

. প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতির পথে কাঠামোগত বাধা

ব্যক্তিগত মেধার অভাব নয়, বরং কাঠামোগত বাধাগুলোই নারী এবং প্রান্তিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের অগ্রগতিকে সীমিত করেছে:

  • বিলম্বিত নিয়োগ: মহিলা বিচারকদের প্রায়ই ক্যারিয়ারের অনেক দেরিতে উচ্চতর বিচারবিভাগে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা তাঁদের কার্যকাল (Tenure) সংক্ষিপ্ত করে দেয় এবং জ্যেষ্ঠতা (Seniority) অর্জনে বাধা সৃষ্টি করে।
  • সংক্ষিপ্ত কার্যকাল: অনেক মহিলা বিচারপতি ৩ বছরেরও কম সময় দায়িত্ব পালন করেছেন, যা আদালতের প্রাতিষ্ঠানিক নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় তাঁদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ কমিয়ে দেয়।
  • সুযোগের সীমাবদ্ধতা: এই কাঠামোগত সমস্যাগুলো দূর করার জন্য কোনো সুসংগত ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিনিধিত্বের অভাবের এক দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছে।

. ন্যায়বিচারের গুণগত মান সামাজিক বৈধতা

বিচারবিভাগে একজাতীয়তা (Homogeneity) গণতান্ত্রিক বৈধতাকে দুর্বল করে, যা শেষ পর্যন্ত জনমনে আস্থার অভাব তৈরি করে:

  • দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতা: বৈচিত্র্যহীন বেঞ্চ অনেক সময় প্রান্তিক মানুষের বাস্তবতা বুঝতে ব্যর্থ হয়। উদাহরণস্বরূপ, হাথরাস ধর্ষণ মামলায় দলিত মহিলার জবানবন্দি খারিজ হওয়া বনাম ২০১২ সালের দিল্লি গণধর্ষণ মামলায় তা গ্রহণ করার তুলনামূলক বিতর্কটি উল্লেখযোগ্য।
  • গণতান্ত্রিক ঘাটতি: সংসদ বা সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণ থাকলেও বিচারবিভাগে তার অনুপস্থিতি একে সমাজের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে।
  • প্রতিষ্ঠানের বৈধতা: বৈচিত্র্যময় বিচারকরা আইনি ব্যাখ্যাকে সমৃদ্ধ করেন। উদাহরণস্বরূপ, লিঙ্গ সংবেদনশীলতার বিষয়ে বিচারপতি বি.ভি. নাগরত্ন এবং উত্তরাধিকার আইনের ক্ষেত্রে বিচারপতি লায়লা শেঠের অবদান অনস্বীকার্য।

. কোলেজিয়াম ব্যবস্থার নির্বাচন পদ্ধতির সমালোচনা

কোলেজিয়াম ব্যবস্থা প্রায়ই তার অস্বচ্ছতা এবং সামাজিক বৈচিত্র্য নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার জন্য সমালোচিত হয়:

  • স্বজনপোষণ অস্বচ্ছতা: নির্দিষ্ট কোনও কার্যকরী ‘মেমোরেন্ডাম অফ প্রসিডিউর’ (MoP) না থাকায় নির্বাচন প্রক্রিয়াটি অস্বচ্ছ বলে গণ্য হয়। বিচারপতি দীপক মিশ্রর সময় স্বচ্ছতার চেষ্টা করা হলেও তা স্থায়ী হয়নি।
  • মেধার মিথএবং সামাজিক পুঁজি: সমাজবিজ্ঞানী সতীশ দেশপান্ডের মতে, মেধার আড়ালে অনেক সময় উচ্চবর্ণের সামাজিক সুবিধা এবং নেটওয়ার্ক লুকিয়ে থাকে।
    • ইয়েল অধ্যাপক ড্যানিয়েল মার্কোভিটস একে একটি মেরিটোক্র্যাসি ট্র্যাপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
    • ডঃ বি.আর. আম্বেদকর সতর্ক করেছিলেন যে, যদি কাউকে সামাজিক সম্পদ থেকে বঞ্চিত করা হয়, তবে তার মেধা অর্থহীন হয়ে পড়ে।
  • লিঙ্গ অন্ধত্ব: কোলেজিয়াম মূলত প্রবীণতম পুরুষ বিচারপতিদের নিয়ে গঠিত হওয়ায় লিঙ্গ সম্পর্কিত বিষয়গুলি প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। এর ফলে পারিবারিক আইন বা কর্মক্ষেত্রে হেনস্থার মতো মামলায় বৈচিত্র্যময় দৃষ্টিভঙ্গির অভাব দেখা যায়।

আন্তর্জাতিক সেরা উদাহরণ

কোলেজিয়াম ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা দূর করতে ভারত আন্তর্জাতিক কিছু মডেল অনুসরণ করতে পারে:

  • যুক্তরাজ্য : এখানে বিচারক, আইনজীবী এবং সাধারণ নাগরিকদের (Lay members) নিয়ে একটি স্বাধীন কমিশন কাজ করে। এটি নিয়োগ প্রক্রিয়াকে কেবল বিচারকদের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখে না এবং আইনি বাধ্যবাধকতার মাধ্যমে বৈচিত্র্যকে উৎসাহিত করে।
  • দক্ষিণ আফ্রিকা : স্বচ্ছতার দিক থেকে এটি একটি বিশ্বসেরা মডেল। এদের সংবিধানেই বলা আছে যে বিচারবিভাগে দেশের জাতিগত ও লিঙ্গগত বৈচিত্র্য প্রতিফলিত হতে হবে।
  • কেনিয়া: কেনিয়ায় বিচারপতি নিয়োগের জন্য প্রকাশ্যে টেলিভিশন সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। এই স্বচ্ছতা জনমনে গভীর বিশ্বাস তৈরি করে এবং বিচারকের আইনি জ্ঞানের পাশাপাশি সামাজিক সংবেদনশীলতাও যাচাই করে।

ভবিষ্যতের পথ: একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বিচারবিভাগের জন্য সংস্কার

  • বিচারবিভাগের স্বসংস্কার: কোলেজিয়ামের উচিত স্বেচ্ছায় বৈচিত্র্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং স্বচ্ছতার জন্য বার্ষিক জাতিগত লিঙ্গভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করা।
  • সাংবিধানিক সংশোধনী: ১৬ নম্বর ধারার যুক্তিকে ১২৪ ২১৭ নম্বর ধারায় প্রসারিত করা; ১০৪তম সংশোধনীর আদলে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বাধ্যতামূলক করা।
  • এনজেএসি (NJAC)- পুনরুজ্জীবন: একটি ব্যাপকভিত্তিক কমিশন গঠন করা প্রয়োজন যা:
    • প্রান্তিক মেধাবীদের খুঁজে বের করতে একটি ডাইভারসিটি সেক্রেটারিয়েট গঠন করবে।
    • স্বাধীনতা রক্ষায় বিচারকদের সংখ্যাধিক্য বজায় রাখবে, তবে সামাজিক প্রেক্ষিত বুঝতে বিশিষ্ট নাগরিক বা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করবে।
    • চূড়ান্ত সুপারিশের আগে বার কাউন্সিল বা জনসমীক্ষার মাধ্যমে মতামত গ্রহণ করবে।
  • আঞ্চলিক বেঞ্চ: ল কমিশন ও সংসদীয় প্যানেলের সুপারিশ অনুযায়ী ১৩০ নম্বর ধারা প্রয়োগ করে কলকাতা থেকে শুরু করে আঞ্চলিক বেঞ্চের বিস্তার ঘটানো।
  • আইন প্রণয়ন: নিয়োগের মাপকাঠি হিসেবে সামাজিক পটভূমিকে অন্তর্ভুক্ত করতে জুডিশিয়াল ডাইভারসিটি অ্যাক্ট পাস করা।
  • তথ্য স্বচ্ছতা দায়বদ্ধতা: আইন মন্ত্রক ও বিচারবিভাগ কর্তৃক বার্ষিক মেশিনরিডেবল রিপোর্ট প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা; এই তথ্যকে RTI-এর অন্তর্ভুক্ত করা যাতে নাগরিক সমাজ নজরদারি চালাতে পারে এবং জনসংখ্যার অনুপাতে নিয়োগের ঘাটতি পূরণ করা যায়।
  • নিম্ন আদালতকেপাইপলাইনহিসেবে শক্তিশালী করা: নিম্ন আদালতে স্বচ্ছ নিয়োগ, পদোন্নতিতে সংরক্ষণ এবং SC/ST/OBC নারী প্রার্থীদের জন্য বৃত্তি ও মেন্টরশিপ নিশ্চিত করা; উচ্চতর বিচারবিভাগের জন্য একটি বৈচিত্র্যময় ‘ট্যালেন্ট পুল’ তৈরি করা।
  • সাংস্কৃতিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর: বিচারকদের জন্য লিঙ্গবিচার, জাতিগত সমীকরণ ও প্রান্তিক মানুষের বাস্তবতা নিয়ে বাধ্যতামূলক শিক্ষা মডিউল চালু করা; বৈচিত্র্যকে কেবল ‘কোটা রাজনীতি’ হিসেবে না দেখে সাংবিধানিক সমতা বৈধতার অপরিহার্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করা।

উপসংহার

আম্বেদকর বলেছিলেন, সামাজিক গণতন্ত্রের ভিত্তি ছাড়া রাজনৈতিক গণতন্ত্র স্থায়ী হতে পারে না একটি প্রতিনিধিত্বমূলক বেঞ্চ গঠন মেধার সঙ্গে আপস নয়, বরং সাম্যের সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি পূরণ। যে বিচারবিভাগ তার গঠনে বৈচিত্র্যময়, তা বিচারবিবেচনায় আরও শক্তিশালী এবং ন্যায়বিচারে আরও সঠিক হবে।

Latest Articles