এই নিবন্ধটি পড়ার পর আপনি ইউপিএসসি (UPSC) মেইনস–এর এই মডেল প্রশ্নটি সমাধান করতে পারবেন:
“সাম্প্রতিক আর্থিক উন্নতি সত্ত্বেও, ভারতের বিদ্যুৎ বন্টন কোম্পানিগুলো (DISCOMs) গভীর কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। ডিসকমগুলোর প্রধান সমস্যাগুলি সমালোচনামূলকভাবে পরীক্ষা করুন এবং তাদের দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক ও কার্যকরী স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের পরামর্শ দিন।” (২৫০ শব্দ, GS-3, অর্থনীতি)
প্রেক্ষাপট
ভারতের বিদ্যুৎ খাত দীর্ঘকাল ধরে “লোকসানের উত্তরাধিকার“ দ্বারা জর্জরিত ছিল, তবে বর্তমানে সেখানে একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে, বিদ্যুৎ বন্টনকারী কোম্পানি বা ডিসকম (DISCOMs) ছিল বিদ্যুৎ সরবরাহ শৃঙ্খলের সবচেয়ে দুর্বল অংশ, যা বিশাল ঋণ এবং অদক্ষতার জন্য পরিচিত ছিল।
তবে, ২০২৪–২৫ অর্থবর্ষের সাম্প্রতিক তথ্য একটি বিশাল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে: ডিসকমগুলো ২,৭০১ কোটি টাকার নিট মুনাফা (Profit After Tax) অর্জন করেছে, যা এক দশক আগের ৬৭,৯৬২ কোটি টাকার লোকসানের তুলনায় এক বিশাল সাফল্য।
ডিসকম সম্পর্কে:
১. মূল কাজ
ডিসকমগুলোর দায়িত্ব হলো বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানি বা জেনকো (GENCOs) থেকে বিদ্যুৎ কেনা এবং তা শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
- সংগ্রহ: তারা তাপীয়, জলবিদ্যুৎ বা সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাথে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (PPA) স্বাক্ষর করে।
- অবকাঠামো: তারা বৈদ্যুতিক খুঁটি, ট্রান্সফরমার এবং স্থানীয় তারের নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণ করে।
- রাজস্ব: তারা গ্রাহকদের বিল পাঠায় এবং জেনকো (GENCOs) ও ট্রান্সমিশন কোম্পানিগুলোর (TRANSCOs) পাওনা মেটানোর জন্য অর্থ সংগ্রহ করে।
- ঐতিহাসিক অনুমোদন: মূলত বিদ্যুৎ (সরবরাহ) আইন, ১৯৪৮-এর অধীনে গঠিত এই সংস্থাগুলোর আইনিভাবে ৩% মুনাফা করার কথা ছিল, যা তারা কয়েক দশক ধরে করতে ব্যর্থ হয়েছে।
২. সংস্থার ধরণ
বর্তমানে ভারতে ৭২টি ডিসকম কাজ করছে:
- সরকারি মালিকানাধীন: অধিকাংশ (৪৪টি), যা সরকারি বিভাগ বা রাষ্ট্রীয় কর্পোরেশন হিসেবে পরিচালিত।
- বেসরকারি: ১৬টি সংস্থা (যেমন: দিল্লি বা মুম্বাইয়ের টাটা পাওয়ার, আদানি পাওয়ার)।
- বিদ্যুৎ বিভাগ: ১২টি (মূলত কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোতে)।
ডিসকমের আর্থিক অবস্থা:
১. লোকসানের যুগ (২০১৪–এর আগে)
- তীব্র সংকট: এই সময়টি ক্রমাগত বাড়তে থাকা লোকসানের জন্য পরিচিত ছিল। ২০১৩–১৪ সালে এই খাতে মোট ৬৭,৯৬২ কোটি টাকার বিশাল লোকসান হয়েছিল।
- ঘাটতি: বিদ্যুৎ সরবরাহের গড় খরচ (ACS) এবং গড় উপার্জনের (ARR) মধ্যে বিশাল পার্থক্য ছিল (প্রতি ইউনিটে প্রায় ৭৮ পয়সা)। অর্থাৎ, প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রিতে ডিসকমের লোকসান হতো।
- দক্ষতার অভাব: বিদ্যুৎ চুরি এবং পুরনো কাঠামোর কারণে AT&C (কারিগরি ও বাণিজ্যিক) লোকসান ২২%-এর বেশি ছিল।
২. সংগ্রামের সময়কাল (২০১৫–২০২১)
- ক্রমবর্ধমান ঋণ: উদয় (UDAY) প্রকল্পের মতো বিভিন্ন উদ্ধার পরিকল্পনা সত্ত্বেও ঋণ জমতে থাকে। ২০২০–২১ সালের মধ্যে মোট লোকসান ৫.৫ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছায়।
- পেমেন্ট সংকট: ডিসকমগুলো উৎপাদনকারীদের (GENCOs) টাকা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় পুরো বিদ্যুৎ খাতে ঋণের চক্র তৈরি হয়।
- কাঠামোগত সমস্যা: সরকারি ভর্তুকি পেতে দেরি হওয়া এবং বিদ্যুতের সঠিক দাম নির্ধারিত না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।
৩. সফল প্রত্যাবর্তন (২০২২–২০২৫)
- মুনাফা: কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবার, ২০২৪–২৫ অর্থবর্ষে ডিসকমগুলো ২,৭০১ কোটি টাকা মুনাফা করেছে।
- দক্ষতা বৃদ্ধি: AT&C লোকসান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ১৫.০৪%-এ নেমে এসেছে।
- খরচ পুনরুদ্ধার: প্রতি ইউনিটে খরচ ও আয়ের ব্যবধান ৭৮ পয়সা থেকে কমে মাত্র ০.০৬ পয়সা হয়েছে।
- ঋণ পরিশোধ: ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে বকেয়া পাওনা ছিল ১.৩৯ লাখ কোটি টাকা, যা ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে কমে মাত্র ৪,৯২৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
ডিসকম খাতে নীতিগত সংস্কার:
১. রিভ্যাম্পড ডিস্ট্রিবিউশন সেক্টর স্কিম (RDSS): ৩ লাখ কোটি টাকার এই প্রকল্পটিতে কাজের ভিত্তিতে অর্থ সাহায্য দেওয়া হয়। ডিসকমগুলো যদি প্রতি বছর লোকসান কমানোর লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে, তবেই তারা স্মার্ট প্রিপেইড মিটার এবং অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য টাকা পায়।
২. লেট পেমেন্ট সারচার্জ (LPS) রুলস, ২০২২: এটি বকেয়া পাওনা মেটানোর একটি বাধ্যতামূলক কাঠামো। এর মাধ্যমে পুরনো ঋণ ৪৮টি সুদমুক্ত কিস্তিতে (EMI) পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়। তবে নতুন পাওনা মেটাতে দেরি করলে ডিসকমগুলোকে বিদ্যুৎ বাজার থেকে নিষিদ্ধ করার কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।
৩. বিদ্যুৎ (সংশোধনী) বিধি: এটি আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে। রাজ্য সরকারগুলোকে তাদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া ভর্তুকি অগ্রিম পরিশোধ করতে হয়, যাতে ডিসকমের খরচ ও আয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে।
৪. বাধ্যতামূলক ফিডার সেগ্রিগেশন: কৃষিকাজের জন্য বিদ্যুতের লাইন এবং ঘরোয়া ব্যবহারের লাইন আলাদা করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এর ফলে কৃষিতে প্রকৃত বিদ্যুৎ খরচ মাপা যায় এবং বাণিজ্যিক লোকসানকে কৃষি ব্যবহারের আড়ালে লুকানো বন্ধ হয়।
৫. ইন্টিগ্রেটেড রেটিং এক্সারসাইজ: পাওয়ার ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (PFC) প্রতি বছর ২৫টিরও বেশি প্যারামিটারের ভিত্তিতে ডিসকমগুলোর মান নির্ধারণ করে। এই রেটিং দেখে ব্যাংকগুলো ঋণ দেয়, যা ডিসকমগুলোকে ভালো কাজ করতে উৎসাহিত করে।
ডিসকমের সামনে চ্যালেঞ্জসমূহ:
এত উন্নতি সত্ত্বেও ডিসকমের মুনাফা এখনও ভঙ্গুর: ১. সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা: অনেক ডিসকমের মুনাফা মূলত কৃত্রিম, কারণ তারা বিশাল সরকারি ভর্তুকি পায়। যেমন, তামিলনাড়ুর TNPDCL ৩১,০০০ কোটি টাকা সরকারি সাহায্য পাওয়ার পর ২,০৭৩ কোটি টাকা মুনাফা দেখিয়েছে; এই সাহায্য না পেলে তাদের ১৪,০৩৪ কোটি টাকা লোকসান হতো।
২. অস্থায়ী রাজস্ব উদ্বৃত্ত: বর্তমান মুনাফা চিরস্থায়ী নাও হতে পারে। কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান পরিচালন খরচের কারণে ডিসকমগুলো আবারও লোকসানে পড়তে পারে।
৩. বিদ্যুতের অস্বভাবিক দাম: রাজনৈতিক কারণে বিদ্যুতের প্রকৃত খরচের (ACS) সাথে মিলিয়ে দাম নির্ধারণ করতে অনীহা দেখা যায়। ফলে আয়ের তুলনায় খরচ বেশি থেকে যায়।
৪. কৃষি মিটারের অভাব: অনেক রাজ্যে কৃষিক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সঠিক কোনো মিটার নেই। এর ফলে কতটা বিদ্যুৎ প্রকৃতপক্ষে কৃষিতে যাচ্ছে আর কতটা চুরি হচ্ছে বা কারিগরি কারণে নষ্ট হচ্ছে, তা বোঝা কঠিন হয়।
৫. বিশাল ঋণ: পুরনো বকেয়া কমলেও ডিসকমগুলোর মোট ঋণের পরিমাণ এখনো প্রায় ৭.২৬ লাখ কোটি টাকা। এই ঋণের বোঝা আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
আগামীর পথ:
১. সর্বজনীন ফিডার সেগ্রিগেশন: সারাদেশে কৃষি ও ঘরোয়া বিদ্যুতের লাইন আলাদা করতে হবে। এতে বিদ্যুতের সঠিক হিসাব পাওয়া যাবে এবং অপচয় কমবে।
২. সৌর পাম্পের প্রসার: নীতি আয়োগের সুপারিশ অনুযায়ী, PM-KUSUM প্রকল্পের মাধ্যমে সৌর পাম্পের ব্যবহার বাড়াতে হবে। এতে ডিসকমের বিদ্যুৎ কেনার খরচ কমবে এবং ভর্তুকির ওপর চাপ কমবে।
৩. টার্গেটেড সাবসিডি ও ডিবিটি (DBT): ঢালাওভাবে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ না দিয়ে কেবল অভাবী মানুষদের জন্য ভর্তুকি দেওয়া উচিত। ডিরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার (DBT)-এর মাধ্যমে সরাসরি গ্রাহকের কাছে ভর্তুকি পৌঁছে দিলে স্বচ্ছতা বাড়বে।
৪. প্রযুক্তি–নির্ভর দক্ষতা: বিলিং-এর ভুল কমাতে এবং সময়মতো টাকা আদায় করতে দ্রুত স্মার্ট প্রিপেইড মিটার বসাতে হবে। গ্রিড আধুনিকীকরণ করলে সৌর বিদ্যুতের মতো পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির ব্যবহার সহজ হবে।
৫. রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা: ডিসকমগুলোকে লাভজনক করতে সাহসী প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন। বিদ্যুতের সঠিক দাম নির্ধারণ এবং বিদ্যুৎ চুরি বন্ধ করাই দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের পথ।
উপসংহার:
ভারতের বিদ্যুৎ খাতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ডিসকমগুলোকে ভর্তুকি-নির্ভর থেকে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার ওপর। স্মার্ট-গ্রিড প্রযুক্তি, সৌরশক্তির প্রসার এবং বিদ্যুতের সঠিক দাম নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আর্থিক শৃঙ্খলার মাধ্যমগুলিই ডিসকমগুলোকে ভারতের ক্রমবর্ধমান শক্তির চাহিদা পূরণ করতে এবং নেট জিরো (Net Zero) লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে সাহায্য করতে পারবে।