প্রেক্ষাপট
সম্প্রতি, মাদ্রাজ হাইকোর্টের একটি ফুল বেঞ্চ রায় দিয়েছে যে, সংবিধানের ১৬১ নম্বর ধারার অধীনে ক্ষমতা প্রয়োগের সময় রাজ্যপাল কঠোরভাবে রাজ্য মন্ত্রিপরিষদের “সহায়তা এবং পরামর্শ” (aid and advice) মানতে বাধ্য। আদালত স্পষ্ট করেছে যে, দণ্ডিত ব্যক্তিদের ক্ষমা বা অকাল মুক্তির বিষয়ে রাজ্যপাল তাঁর ব্যক্তিগত মতামতের ভিত্তিতে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না এবং ক্যাবিনেটের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারবেন না।
১. ধারা ১৬১-এর পরিধি
ভারতীয় সংবিধানের ১৬১ নম্বর ধারা একজন রাজ্যপালকে নিম্নলিখিত ক্ষমতাগুলো প্রদান করে:
- ক্ষমা (Pardon): এটি দণ্ডিত ব্যক্তিকে সাজা এবং দোষ—উভয় থেকেই সম্পূর্ণরূপে মুক্তি দেয়।
- দণ্ডাদেশ স্থগিতকরণ (Reprieve): কোনো সাজার কার্যকারিতা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা।
- দণ্ড হ্রাস (Respite): বিশেষ কোনো কারণে (যেমন: গর্ভাবস্থা বা শারীরিক অক্ষমতা) মূল সাজার বদলে কম সাজা প্রদান করা।
- মকুব (Remission): সাজার ধরন পরিবর্তন না করে সাজার মেয়াদ কমানো (যেমন: দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড কমিয়ে এক বছর করা)।
- লঘুকরণ (Commutation): একটি কঠোর দণ্ডকে হালকা কোনো দণ্ডে পরিবর্তিত করা (যেমন: সশ্রম কারাদণ্ডকে বিনাশ্রম কারাদণ্ডে পরিবর্তন)।
২. ধারা ১৬১-এর সীমাবদ্ধতা
- এক্তিয়ার: এই ক্ষমতা কেবল সেই সব বিষয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যা রাজ্যের শাসনবিভাগীয় ক্ষমতার (রাজ্যের আইনের বিরুদ্ধে অপরাধ) অন্তর্ভুক্ত।
- মৃত্যুদণ্ড: রাষ্ট্রপতির মতো রাজ্যপাল মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কাউকে ক্ষমা করতে পারেন না। তবে তিনি মৃত্যুদণ্ড স্থগিত, মকুব বা লঘুকরণ করতে পারেন।
- সামরিক আদালত: সামরিক আদালত (কোর্ট মার্শাল) দ্বারা প্রদত্ত সাজার ক্ষেত্রে রাজ্যপালের কোনো ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতা নেই।
মাদ্রাজ হাইকোর্টের সাম্প্রতিক রায় (এপ্রিল ২০২৬)
মাদ্রাজ হাইকোর্টের ফুল বেঞ্চ এই বিষয়টি খতিয়ে দেখেছে যে, ক্যাবিনেটের অকাল মুক্তির সুপারিশ বাতিল করার ক্ষেত্রে রাজ্যপালের কোনো “স্বেচ্ছাধীন” (discretionary) ক্ষমতা আছে কি না।
রায়ের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- পরামর্শের বাধ্যবাধকতা: আদালত জানিয়েছে যে, রাজ্যপাল সংবিধান অনুযায়ী রাজ্য ক্যাবিনেটের সুপারিশ পালন করতে বাধ্য। ধারা ১৬৩-এর অধীনে “সহায়তা ও পরামর্শ” শব্দবন্ধটি ১৬১ নম্বর ধারার ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য বাধ্যতামূলক।
- কোনো স্বাধীন সিদ্ধান্ত নয়: বেঞ্চ রায় দিয়েছে যে, কোনো অবস্থাতেই সাজা মকুবের বিষয়ে রাজ্যপাল মন্ত্রিপরিষদের থেকে ভিন্ন কোনো অবস্থান নিতে পারেন না।
- পূর্ববর্তী রায়ের ওপর নির্ভরতা: হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায় মারু রাম বনাম ভারত ইউনিয়ন (১৯৮০) এবং এজি পেরারিভালান বনাম তামিলনাড়ু রাজ্য (২০২২)-এর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এই রায়গুলোতে বলা হয়েছিল যে, রাজ্যপালের শাসনবিভাগীয় ক্ষমতা আসলে রাজ্য সরকারই প্রয়োগ করে।
তুলনামূলক বিশ্লেষণ: রাষ্ট্রপতি বনাম রাজ্যপাল
| বৈশিষ্ট্য | রাষ্ট্রপতি (ধারা ৭২) | রাজ্যপাল (ধারা ১৬১) |
| আইনের পরিধি | কেন্দ্রীয় আইনের বিরুদ্ধে অপরাধ। | রাজ্য আইনের বিরুদ্ধে অপরাধ। |
| মৃত্যুদণ্ড | ক্ষমা, লঘুকরণ বা মকুব করতে পারেন। | ক্ষমা করতে পারেন না; কেবল লঘুকরণ, মকুব বা স্থগিত করতে পারেন। |
| সামরিক আদালত | সামরিক আদালতের সাজায় ক্ষমা দিতে পারেন। | সামরিক আদালতের বিষয়ে কোনো ক্ষমতা নেই। |
| পরামর্শের বাধ্যবাধকতা | কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেটের পরামর্শে বাধ্য। | রাজ্য ক্যাবিনেটের পরামর্শে বাধ্য। |
Q: ভারতে রাজ্যপালের ক্ষমা করার ক্ষমতা সম্পর্কে নিচের বিবৃতিগুলো বিবেচনা করুন:
বিবৃতি-I: কোনো অপরাধ যদি এমন আইনের বিরুদ্ধে হয় যেখানে রাজ্যের শাসনবিভাগীয় ক্ষমতা কার্যকর, তবে রাজ্যপাল মৃত্যুদণ্ড ক্ষমা করার ক্ষমতা রাখেন।
বিবৃতি-II: মাদ্রাজ হাইকোর্ট সম্প্রতি রায় দিয়েছে যে, ১৬১ নম্বর ধারার অধীনে ক্ষমতা প্রয়োগের সময় রাজ্যপাল মন্ত্রিপরিষদের সহায়তা এবং পরামর্শ মানতে বাধ্য।
উপরের বিবৃতিগুলোর ক্ষেত্রে নিচের কোনটি সঠিক?
A) বিবৃতি-I এবং বিবৃতি-II উভয়ই সঠিক এবং বিবৃতি-II হলো বিবৃতি-I এর সঠিক ব্যাখ্যা।
B) বিবৃতি-I এবং বিবৃতি-II উভয়ই সঠিক কিন্তু বিবৃতি-II হলো বিবৃতি-I এর সঠিক ব্যাখ্যা নয়।
C) বিবৃতি-I সঠিক কিন্তু বিবৃতি-II ভুল।
D) বিবৃতি-I ভুল কিন্তু বিবৃতি-II সঠিক।
উত্তর: D
সমাধান:
বিবৃতি-I ভুল: সংবিধান এবং সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায় অনুযায়ী, রাজ্যপাল মৃত্যুদণ্ড ক্ষমা করতে পারেন না। কেবল ভারতের রাষ্ট্রপতির ৭২ নম্বর ধারার অধীনে মৃত্যুদণ্ড ক্ষমা করার ক্ষমতা আছে। রাজ্যপাল কেবল মৃত্যুদণ্ড স্থগিত, মকুব বা লঘুকরণ করতে পারেন।
বিবৃতি-II সঠিক: ২০২৬ সালের এপ্রিলে মাদ্রাজ হাইকোর্টের ফুল বেঞ্চ পুনরায় নিশ্চিত করেছে যে, রাজ্যপালকে ১৬১ নম্বর ধারার অধীনে ক্যাবিনেটের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হবে এবং এই বিষয়ে তাঁর কোনো স্বাধীন ক্ষমতা নেই।