এই নিবন্ধটি পড়ার পর আপনি ইউপিএসসি মেইনস পরীক্ষার এই মডেল প্রশ্নটির উত্তর দিতে পারবেন:
“Discuss the significance of the One Health approach in strengthening pandemic preparedness and addressing emerging zoonotic diseases in India. What challenges hinder its effective implementation?” (১০ নম্বর, GS-2 স্বাস্থ্য)
ভূমিকা
ওয়ান হেলথ হলো একটি সমন্বিত এবং বহুমুখী চিন্তাধারা, যা স্বীকার করে যে মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীর স্বাস্থ্য এবং আমাদের ভাগ করে নেওয়া পরিবেশের সুস্থতা একে অপরের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল।
- বিবর্তন: ‘ওয়ান হেলথ’ শব্দটি আনুষ্ঠানিকভাবে ২০০৩-০৪ সালে (সার্স অতিমারির পর) চালু হয়, যদিও ১৯ শতকে রুডলফ ভার্চো (Rudolf Virchow) প্রথম “ওয়ান মেডিসিন” বা সমন্বিত চিকিৎসার ধারণা দিয়েছিলেন।
- চতুর্মুখী জোট (The Quadripartite): এটি মূলত চারটি প্রধান সংস্থার সমন্বয়ে পরিচালিত হয়:
১. WHO (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা)
২. FAO (খাদ্য ও কৃষি সংস্থা)
৩. UNEP (জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি)
৪. WOAH (বিশ্ব প্রাণী স্বাস্থ্য সংস্থা)
‘ওয়ান হেলথ‘ পদ্ধতির গুরুত্ব
১. প্রাণিজাত রোগের বোঝা: বিশ্ব প্রাণী স্বাস্থ্য সংস্থা (WOAH)-এর মতে, মানুষের মধ্যে হওয়া পরিচিত সংক্রামক রোগগুলোর ৬০% হলো প্রাণিজাত (Zoonotic) এবং নতুনভাবে উদ্ভূত সংক্রামক রোগগুলোর (যেমন—কোভিড-১৯, ইবোলা এবং নিপাহ) ৭৫% প্রাণী থেকে ছড়ায়।
২. অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR): গবাদি পশু এবং মানুষের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে এমন “সুপারবাগ” তৈরি হচ্ছে যা পরিবেশের মাধ্যমে চক্রাকারে ছড়িয়ে পড়ছে।
৩. খাদ্য নিরাপত্তা: FAO-এর তথ্য অনুযায়ী, পশুর রোগের কারণে বিশ্বজুড়ে গবাদি পশুর উৎপাদন অন্তত ২০% হ্রাস পায়, যা সরাসরি সেই ১.৩ বিলিয়ন মানুষের পুষ্টি ও জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলে যারা গবাদি পশুর ওপর নির্ভরশীল।
৪. জলবায়ু পরিবর্তন ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি: বন উজাড় এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে প্রাণীরা তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ছেড়ে লোকালয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে, যার ফলে মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাত এবং ভাইরাসের “স্পিলওভার” (প্রাণী থেকে মানুষের দেহে সংক্রমণ) বাড়ছে।
৫. অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা: বিশ্বব্যাংক-এর হিসাব অনুযায়ী, ‘ওয়ান হেলথ’ বাস্তবায়নে বছরে প্রায় ১০ থেকে ১১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে, যেখানে কোভিড-১৯ এর মতো একটি বড় অতিমারীর ফলে বিশ্বের জিডিপি (GDP) ক্ষতির পরিমাণ ট্রিলিয়ন ডলারে গিয়ে দাঁড়ায়।
বৈশ্বিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো
- ওয়ান হেলথ জয়েন্ট প্ল্যান অফ অ্যাকশন (২০২২-২০২৬): এটি চতুর্মুখী জোটের একটি ৫ বছরের পরিকল্পনা, যা স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং নতুন রোগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দেয়।
- WHO অতিমারি চুক্তি (Pandemic Agreement): এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংবিধানের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে একটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক চুক্তি।
- মূল স্তম্ভ: প্যাথোজেন অ্যাক্সেস অ্যান্ড বেনিফিট-শেয়ারিং (PABS) সিস্টেম, যা টিকার সমবণ্টন এবং তথ্য আদান-প্রদান নিশ্চিত করে।
- ম্যানহাটন নীতি (২০০৪): এটি ১২টি মৌলিক নীতি নির্ধারণ করেছিল যেখানে প্রথমবার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করা হয় যে, “সবার স্বাস্থ্যই এক ও অভিন্ন।”
ভারতের ওয়ান হেলথ ইকোসিস্টেম
ক. জাতীয় ওয়ান হেলথ মিশন (NOHM)
প্রধানমন্ত্রী বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবন উপদেষ্টা পরিষদ (PM-STIAC) দ্বারা চালু হওয়া এই মিশনটি পশুপালন ও দুগ্ধ বিভাগ (DAHD) এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি সমন্বিত উদ্যোগ।
- নজরদারি (Surveillance): মানুষ ও প্রাণীর রোগ রিয়েল-টাইমে ট্র্যাক করার জন্য সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম।
- ল্যাব নেটওয়ার্ক: সারা দেশে BSL-3 এবং BSL-4 ল্যাবরেটরির নেটওয়ার্ক তৈরি করা (বর্তমানে ২২টি ল্যাব এই নেটওয়ার্কের অধীনে আছে)।
- সাড়া প্রদান (Response): একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরির জন্য “ওয়ান হেলথ সাপোর্ট ইউনিট” গঠন করা হয়েছে।
খ. রাজ্যভিত্তিক সফল উদ্যোগ
- ওড়িশা: টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রথমবার জলবায়ু বাজেট (Climate Budget) চালু করেছে।
- কেরল: মিনানগাডি মডেলের মতো অংশগ্রহণমূলক কার্বন-নিরপেক্ষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
- তামিলনাড়ু: পরিবেশগত চাপ কমাতে গ্রিন ক্লাইমেট কোম্পানি এবং “কুল রুফ” প্রজেক্ট চালু করেছে।
বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ বা বাধা
- প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্ছিন্নতা (Institutional Silos): PM-STIAC এবং নীতি আয়োগের মতে, মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্য আলাদা আলাদা মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকায় এবং তাদের কাজের ক্ষেত্র ভিন্ন হওয়ায় সঠিক সমন্বয়ের অভাব দেখা দেয়।
- তহবিলের ভারসাম্যহীনতা: বিশ্বব্যাংক ও WHO-এর মূল্যায়ন অনুযায়ী, বেশিরভাগ বরাদ্দ কেবল মানুষের চিকিৎসার জন্য ব্যয় হয়; প্রাণী স্বাস্থ্যের মতো প্রতিরোধমূলক খাতে মোট বাজেটের ১৫%-এরও কম বরাদ্দ দেওয়া হয়।
- তথ্যের বিচ্ছিন্নতা (Data Fragmentation): NCDC-এর রিপোর্ট অনুসারে, ভারতে কোনো সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা নেই। মানুষ এবং প্রাণীর তথ্যের ফরম্যাট আলাদা হওয়ায় দ্রুত রোগ পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
- আইনি ও নিয়ন্ত্রক ঘাটতি: ভারতে কোনো সুনির্দিষ্ট “ওয়ান হেলথ অ্যাক্ট” নেই। অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন (ORF)-এর মতে, বর্তমানের মহামারি রোগ আইন (১৮৯৭) আধুনিক সময়ের জটিল স্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবিলায় যথেষ্ট নয়।
- পরিকাঠামো ও জনবল সংকট: ICMR ও WOAH-এর মতে, জেলা পর্যায়ে BSL-3 ল্যাবের চরম অভাব রয়েছে এবং গবাদি পশুর সংখ্যার তুলনায় পশুচিকিৎসকের অনুপাত আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে অনেক কম।
- সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাধা: FAO-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, কৃষকদের মধ্যে সচেতনতার অভাব এবং গবাদি পশু মেরে ফেলার ভয়ে (আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায়) রোগের খবর গোপন করার প্রবণতা বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা
- সমন্বিত আইনি কাঠামো: ভারতের উচিত একটি নির্দিষ্ট “ওয়ান হেলথ অ্যাক্ট” বা আইন তৈরির দিকে এগিয়ে যাওয়া। অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন (ORF)-এর আইনি সুপারিশ অনুযায়ী, এটি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় এবং যৌথ বাজেট নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সংবিধিবদ্ধ ভিত্তি প্রদান করবে।
- “ওয়ান হেলথ” ইউনিট কার্যকর করা: নীতি আয়োগের ‘ভিশন ২০৩৫‘ অনুযায়ী, ভারতকে জেলা পর্যায়ে সমন্বিত নজরদারি ইউনিট স্থাপন করতে হবে। সেখানে চিকিৎসা, পশুচিকিৎসা এবং পরিবেশ কর্মকর্তাদের একই স্থানে নিয়োগ করতে হবে যাতে তৃণমূল স্তরে দ্রুত সাড়াপ্রদান নিশ্চিত করা যায়।
- একীভূত ডেটা পরিকাঠামো: ডিজিটাল ইন্ডিয়া উদ্যোগের ওপর ভিত্তি করে একটি “ন্যাশনাল ওয়ান হেলথ ডিজিটাল পোর্টাল” তৈরি করা অপরিহার্য। এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-এর মাধ্যমে মানুষের জন্য IDSP এবং প্রাণীদের জন্য NADRS সিস্টেমের তথ্যগুলোকে একে অপরের সাথে যুক্ত করবে।
- তথ্য প্রদানে উৎসাহ দান: FAO-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, সরকারের উচিত কৃষকদের জন্য “ক্ষতিপূরণ প্রকল্প” চালু করা। এতে আর্থিক ক্ষতির ভয়ে প্রাণিজাত রোগের প্রাদুর্ভাবের খবর গোপন করার প্রবণতা কমবে।
- “পরিবেশগত” স্বাস্থ্য শক্তিশালী করা: UNEP-এর সুপারিশ অনুযায়ী, ওয়ান হেলথ-কে কেবল ডাক্তার এবং পশুচিকিৎসকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বন্যপ্রাণী ও মানুষের সংযোগস্থলগুলো আরও ভালোভাবে পরিচালনা করতে নগর পরিকল্পনায় বন কর্মকর্তা এবং বাস্তুসংস্থানবিদদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
- বৈশ্বিক নেতৃত্ব: জি-২০ (G20) নয়াদিল্লি ঘোষণার প্রতিশ্রুতিগুলোকে কাজে লাগিয়ে ভারতের উচিত গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর নেতৃত্ব দেওয়া। বিশেষ করে WHO অতিমারি চুক্তির PABS সিস্টেম কার্যকর করার মাধ্যমে চিকিৎসা সরঞ্জামের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে।
উপসংহার
ওয়ান হেলথ পদ্ধতি গ্রহণ করা বর্তমানে একটি জৈবিক এবং অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা। মানুষ, প্রাণী এবং পরিবেশের স্বাস্থ্যকে সমন্বিত করার মাধ্যমে ভারত অতিমারি মোকাবিলায় সক্ষমতা, বৈশ্বিক নেতৃত্ব এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে।