এই নিবন্ধটি পড়ার পর আপনি ইউপিএসসি মেইনস-এর এই মডেল প্রশ্নটির উত্তর সমাধান করতে পারবেন:
Critically analyse the impact of underfunding of judiciary, legal aid, and prisons on the constitutional promise of access to justice in India.১৫ নম্বর (GS-2, শাসনব্যবস্থা)
প্রেক্ষাপট
কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৬-২৭-এ বিচার ব্যবস্থার উন্নতির জন্য নির্দিষ্ট কোনো আর্থিক বরাদ্দ করা হয়নি। ভারতের ১১টি উচ্চ-জিডিপি (GDP) সম্পন্ন রাজ্যের (যেমন—গুজরাট, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, উত্তর প্রদেশ ইত্যাদি) বাজেট বিশ্লেষণ করলে একটি গভীর কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এটি দেখায় যে, ভারত এখনও ন্যায়বিচারকে মামলার মীমাংসা বা বিচার করার চেয়ে আইন প্রয়োগ ও নজরদারির দৃষ্টিকোণ থেকেই বেশি দেখছে।
ভারতে বিচার ব্যবস্থার খরচের বর্তমান পরিস্থিতি
- রাজ্য স্তরের ব্যয়: ভারতের ১১টি ধনী বা উচ্চ-জিডিপি রাজ্য তাদের মোট বাজেটের মাত্র গড়ে ৪.৬% টাকা সামগ্রিক বিচার ব্যবস্থার (পুলিশ, কারাগার, বিচার বিভাগ এবং আইনি সহায়তা) জন্য খরচ করে।
- বৈশ্বিক তুলনা: ইউরোপ যেখানে তাদের মোট জিডিপি-র (GDP) প্রায় ০.৩১% টাকা ন্যায়বিচারের জন্য খরচ করে (যার মধ্যে পুলিশ খরচ অন্তর্ভুক্ত নেই), সেখানে ভারতে রেকর্ড পরিমাণ মামলার চাপ থাকা সত্ত্বেও বিচার বিভাগের বাজেট মোট রাজ্য বাজেটের ১%-এরও কম।
- মাথাপিছু খরচের অসমতা:
- পুলিশ: জাতীয় স্তরে ১,৫০০ টাকা | ১১টি উচ্চ-জিডিপি রাজ্যে গড়ে ১,৬১৬ টাকা।
- কারাগার: ১৫০ টাকা।
- বিচার বিভাগ: ৪৫০ টাকা।
- বিনামূল্যে আইনি সহায়তা: মাত্র ৯ টাকা।
স্তম্ভ-ভিত্তিক কাঠামোগত ঘাটতি
ক) পুলিশিং: আইন প্রয়োগ এবং নজরদারির ওপর অতিরিক্ত জোর
- অসম বণ্টন: বড় রাজ্যগুলিতে বিচার ব্যবস্থার জন্য বরাদ্দ করা মোট অর্থের ৮০%-এরও বেশি একা পুলিশ বিভাগই গ্রাস করে।
- গুণগত মানের অভাব: এই তহবিলের বেশিরভাগ টাকাই চলে যায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতে এবং প্রতিদিনের প্রশাসনিক সমস্যা সামলাতে। দীর্ঘমেয়াদি গুণগত মান বাড়ানোর ক্ষেত্রগুলি অবহেলিত থেকে যায়:
- প্রশিক্ষণ: পুলিশ বাজেটের ১.৫%-এরও কম টাকা প্রশিক্ষণের জন্য দেওয়া হয়।
- ফরেনসিক (বৈজ্ঞানিক তদন্ত): পায় মাত্র আনুমানিক ১% টাকা।
খ) বিচার বিভাগ: বিপুল মামলার চাপ বনাম ক্ষমতার অভাব
- নিম্ন আদালতের সংকট: দেশের ৩,৫০০টি জেলা আদালত হাইকোর্টের চেয়ে ৭ গুণ বেশি মামলা সামলায়, কিন্তু তারা বাজেট পায় হাইকোর্টের তুলনায় মাত্র ৩ গুণ।
- জনসংখ্যার তুলনায় বিচারকের ঘাটতি: বর্তমানে প্রতি ১০ লাখ জনসংখ্যার বিপরীতে বিচারকের সংখ্যা মাত্র ১৫ জন। এটি ১৯৮৭ সালের ল কমিশন বা আইন কমিশনের সুপারিশের চেয়ে অনেক কম, যেখানে প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য ৫০ জন বিচারক রাখার কথা বলা হয়েছিল।
- প্রশাসনিক ঘাটতি: জেলা আদালতে প্রতিটি বিচারকের পদের বিপরীতে সাচিবিক ও কেরানির কাজের জন্য অন্তত ৫ থেকে ৯টি অন্য পদের প্রয়োজন, যা এখনও পূরণ করা হয়নি। এছাড়া বিচার বিভাগের মোট বাজেটের মাত্র ১% টাকা প্রশিক্ষণের জন্য খরচ করা হয়।
গ) কারাগার: অতিরিক্ত ভিড় এবং কম গুরুত্ব
- কম বরাদ্দ: কারাগারগুলি রাজ্য বাজেটের মাত্র একটি সামান্য অংশ অর্থাৎ ০.১৪% টাকা পায়।
- পরিকাঠামোগত চাপ: উচ্চ-জিডিপি রাজ্যগুলির কারাগারগুলিতে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি কয়েদি থাকে, যার গড় হার ১৩৭% (এটি জাতীয় গড় ১৩১%-এর চেয়েও বেশি)।
- জনবল সংকট: কারাগারগুলি অন্তত ৩০% কর্মী শূন্যতা নিয়ে চলছে এবং কারাগারে কর্মীদের প্রশিক্ষণের জন্য প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে মাত্র ০.২৩ টাকা (২৩ পয়সা) খরচ করা হয়।
ঘ) আইনি সহায়তা এবং স্বাধীন তদারকি সংস্থা: সবচেয়ে দুর্বল লিঙ্ক
- আইনি সহায়তা: এটি সবচেয়ে কম তহবিল পায় (মাথাপিছু মাত্র ৯ টাকা)। ফলে গরিব এবং পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য সংবিধানের ধারা ৩৯এ (Article 39A) অনুযায়ী বিনামূল্যে আইনি সহায়তা ও সমতার ভিত্তিতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার মূল মাধ্যমটিই পঙ্গু হয়ে পড়েছে।
- রাজ্য মানবাধিকার কমিশন (SHRCs): এই স্বাধীন তদারকি সংস্থাগুলি তীব্র আর্থিক সংকটে ভুগছে। এরা মাথাপিছু পায় মাত্র ৮০ পয়সা এবং এখানে ৪০%-এরও বেশি কর্মী পদ খালি পড়ে রয়েছে, যার ফলে এরা মৌলিক কাজগুলো করতেই হিমশিম খাচ্ছে।
সরকারি উদ্যোগসমূহ
- ই-কোর্টস মিশন মোড প্রজেক্ট – তৃতীয় পর্যায় (e-Courts Mission Mode Project – Phase III): এর উদ্দেশ্য হলো কাগজের ব্যবহার ছাড়া ডিজিটাল আদালত তৈরি করা, ক্লাউড ডেটা স্টোরেজ বাড়ানো এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) ব্যবহারের মাধ্যমে ঝুলে থাকা মামলার পূর্বাভাস দিয়ে বিচার ব্যবস্থাকে আধুনিক করা।
- টেলি-ল স্কিম (Tele-Law Scheme): কমন সার্ভিস সেন্টার (CSC)-এ ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে প্রান্তিক নাগরিকদের প্যানেল আইনজীবীদের সাথে যুক্ত করে একদম তৃণমূল স্তরে আইনি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এর লক্ষ্য।
- বিচার বিভাগীয় পরিকাঠামোর জন্য কেন্দ্রীয় স্পনসরড স্কিম (CSS for Judicial Infrastructure): রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলিকে আধুনিক আদালত ভবন, বিচারকদের জন্য আবাসন এবং সাধারণ মানুষের বসার ঘরের মতো নাগরিক সুবিধা তৈরির জন্য এই প্রকল্পের অধীনে আর্থিক সাহায্য দেওয়া হয়।
- ন্যায় বিকাশ পোর্টাল (Nyaya Vikas Portal): এটি একটি অনলাইন তদারকি ব্যবস্থা, যা দেশের বিচার বিভাগীয় পরিকাঠামো প্রকল্পগুলির বাস্তবায়ন এবং তহবিল ছাড়ের পরিস্থিতি সরাসরি বা রিয়েল-টাইমে ট্র্যাক করে।
- জাতীয় প্রচার অভিযান – আমাদের সংবিধান আমাদের সম্মান: এর লক্ষ্য হলো ‘সবকো ন্যায়, হর ঘর ন্যায়’-এর মতো স্থানীয় প্রচারের মাধ্যমে নাগরিকদের মধ্যে আইনি সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটানো।
দুর্বল আইনি সহায়তা ও তদারকি সংস্থার প্রভাব
- ন্যায়বিচারকে বিলাসবহুল বানিয়ে তোলে: আইনি সহায়তা দুর্বল হলে ভালো মানের আইনি লড়াই কেবল ধনীদের অধিকার হয়ে দাঁড়ায়, যা গরিবদের নাগালের বাইরে চলে যায়।
- পিছিয়ে পড়া মানুষের অধিকার কেড়ে নেয়: দরিদ্র নাগরিকরা টাকার অভাবে সঠিক সময়ে আইনজীবী পান না এবং সামান্য কারণেও দীর্ঘদিন জেলে পচতে বাধ্য হন।
- সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে: দুর্বল আইনি সহায়তার কারণে সংবিধানের ধারা ৩৯এ (বিনামূল্যে আইনি সাহায্য) সম্পূর্ণ ব্যর্থ প্রমাণিত হয়।
- মানবাধিকার রক্ষাকারীদের পঙ্গু করে: মাথাপিছু মাত্র ৮০ পয়সা পাওয়ায় রাজ্য মানবাধিকার কমিশনগুলো বড় বড় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার তদন্ত করতেই পারে না।
- প্রাতিষ্ঠানিক ভুলগুলো ঢাকা পড়ে যায়: তদারকি সংস্থাগুলোতে ৪০% পদ খালি থাকায় সরকারি ব্যবস্থার অন্যায় বা ভুলত্রুটিগুলো কোনো রকম স্বাধীন পরীক্ষা ছাড়াই পার পেয়ে যায়।
ভবিষ্যতের করণীয়
- বাজেটের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা: কেবল পুলিশ বা আইন প্রয়োগের ওপর জোর না দিয়ে, বাজেটের একটা বড় অংশ আদালত তৈরি, কারাগার সংস্কার এবং বিনামূল্যে আইনি সহায়তার পেছনে খরচ করতে হবে।
- শূন্যপদ দ্রুত পূরণ করা: ল কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য ৫০ জন বিচারক নিয়োগের লক্ষ্য পূরণে এবং সহকারী কর্মী নিয়োগের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে।
- মানবসম্পদের উন্নয়ন ও আধুনিকীকরণ: আধুনিক ফরেনসিক ল্যাব তৈরি এবং পুলিশ ও বিচারকদের উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য বাজেট বরাদ্দ অন্তত ৫% বাড়াতে হবে, যাতে তদন্তের মান বাড়ে।
- আইনি সহায়তার জন্য স্থায়ী তহবিল: গরিব মানুষের বিনামূল্যে আইনি লড়াইয়ের অধিকার সুরক্ষিত করতে আইনি সহায়তা কেন্দ্রের জন্য একটি স্থায়ী এবং মুদ্রাস্ফীতি-সামঞ্জস্যপূর্ণ বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
- মানবাধিকার কমিশনগুলোকে শক্তিশালী করা: রাজ্য মানবাধিকার কমিশনগুলির (SHRC) সব শূন্যপদ পূরণ করতে হবে এবং তাদের পর্যাপ্ত স্বাধীন তহবিল দিতে হবে যাতে তারা নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে।
উপসংহার
ভারতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে একটি সাংবিধানিক ও সুষম পুনর্বিন্যাসকৃত বিচার বিভাগীয় বাজেট অত্যন্ত জরুরি। প্রযুক্তি-নির্ভর বিচার ব্যবস্থা এবং জনবান্ধব আইনি পরিবেশের পেছনে বিনিয়োগই ভারতকে স্রেফ বলপ্রয়োগের শাসন থেকে একটি ভবিষ্যতমুখী ও অধিকার-সচেতন গণতন্ত্রে রূপান্তরিত করবে।