পালসার এবং গভীর মহাকাশ নেভিগেশন

প্রেক্ষাপট

  • সম্প্রতি, ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মহাকাশে দূরত্ব পরিমাপের আরও একটি সঠিক (accurate) পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। আকাশগঙ্গার আয়নিত গ্যাস মেঘের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করার সময় পালসার (Pulsars) থেকে নির্গত রেডিও তরঙ্গ বা বিকিরণ পর্যবেক্ষণ করে তারা এই সাফল্য অর্জন করেছেন।
  • ‘মান্থলি নোটিশেস অফ দ্য রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি’-তে প্রকাশিত এই গবেষণাটি মূলত ফোকাস করে কীভাবে এই স্পন্দিত নাক্ষত্রিক অবশিষ্টাংশ থেকে আসা সংকেতগুলো মহাকাশের আন্তঃনাক্ষত্রিক মাধ্যমের কারণে বিকৃত হয়। এই গবেষণায় ভেলা পালসার উইন্ড নেবুলা (Vela pulsar wind nebula)-কে প্রধান বিষয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটি আমাদের গ্যালাক্সির জটিল অঞ্চলের অশান্ত প্লাজমার কারণে দূরত্ব নির্ণয়ে যে দীর্ঘদিনের ভুলভ্রান্তি হতো, তা দূর করবে।

১. পালসার (Pulsars) কী?

পালসার (যাকে সংক্ষেপে Pulsating Radio Sources বলা হয়) হলো অত্যন্ত শক্তিশালী চৌম্বকীয় ক্ষমতা সম্পন্ন এবং দ্রুত ঘূর্ণায়মান নিউট্রন তারা (Neutron Stars)। একটি বিশাল নক্ষত্র যখন সুপারনোভা বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে যায়, তখন তার যে ঘন কেন্দ্রটি অবশিষ্ট থাকে, সেটিই হলো এই পালসার।

  • বিকিরণ প্রক্রিয়া: এরা এদের চৌম্বক মেরু থেকে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বিকিরণ (রেডিও তরঙ্গ) নির্গত করে। যেহেতু এই বিকিরণের রশ্মিগুলো লাইটহাউসের আলোর মতো পৃথিবীর ওপর দিয়ে ঘুরে যায়, তাই এদেরকে “স্পন্দন” বা পালস হিসেবে দেখা যায়।
  • মহাজাগতিক ঘড়ি: এদের ঘূর্ণনের গতি অত্যন্ত স্থিতিশীল হওয়ার কারণে পালসারগুলোকে উচ্চ-নির্ভুল সময়রক্ষক বা মহাজাগতিক ঘড়ি হিসেবে ব্যবহার করা হয়, অনেকটা পৃথিবীর পারমাণবিক ঘড়ির মতো।
  • মিলিসেকেন্ড পালসার: এগুলো প্রতি সেকেন্ডে শত শত বার ঘোরে এবং মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

২. দূরত্ব পরিমাপ: “নতুন উপায়”

প্রথাগত পদ্ধতিগুলো প্রায়ই ইলেকট্রন বিন্যাসের মডেলের ওপর নির্ভর করে, যা সবসময় নির্ভরযোগ্য হয় না। নতুন এই পদ্ধতিটি দুটি ভিন্ন ভৌত প্রভাবকে একত্রিত করে:

  • ডিসপারসন মেজার (DM): রেডিও তরঙ্গ যখন আন্তঃনাক্ষত্রিক মাধ্যমের মধ্য দিয়ে যায়, তখন মুক্ত ইলেকট্রনগুলো উচ্চ-কম্পাঙ্কের তরঙ্গের তুলনায় নিম্ন-কম্পাঙ্কের তরঙ্গগুলোকে বেশি ধীর করে দেয়। এই সময়ের ব্যবধান বা দেরি মেপে বিজ্ঞানীরা পৃথিবী এবং পালসারের মধ্যে ইলেকট্রনের সংখ্যা অনুমান করেন।
  • স্ক্যাটার ব্রডেনিং (Scatter Broadening): মহাকাশের প্লাজমা মসৃণ নয়; এর অসমতা রেডিও তরঙ্গগুলোকে বিক্ষিপ্ত করে, যার ফলে সংকেতটি কিছুটা “ঘোলাটে” বা প্রসারিত দেখায়। এটি অনেকটা নক্ষত্রের ঝিকমিক করার মতো, তবে এটি রেডিও স্পেকট্রামে ঘটে।
  • কে-ফ্যাক্টর (k-factor): গবেষকরা গাম নেবুলা (Gum Nebula)-র মতো জটিল অঞ্চলে দূরত্বের সঠিক অনুমান করার জন্য DM এবং বিচ্ছুরণকে (scattering) একটি একক প্যারামিটারে যুক্ত করেছেন, যার নাম দেওয়া হয়েছে $k-factor$

৩. প্যারালাক্স পদ্ধতির সাথে তুলনা

  • প্যারালাক্স পদ্ধতি (Parallax Method): এটিকে দূরত্বের পরিমাপের ক্ষেত্রে “স্বর্ণমান” (gold standard) ধরা হয়। এটি পৃথিবীর কক্ষপথের ওপর ভিত্তি করে দূরত্ব পরিমাপের জন্য ত্রিকোণমিতি ব্যবহার করে। তবে এর একটি নির্দিষ্ট সীমা আছে এবং এটি অত্যন্ত দূরের বস্তুর ক্ষেত্রে কম কার্যকর।
  • নতুন পদ্ধতি: এই পদ্ধতির কোনো নির্দিষ্ট দূরত্বের সীমাবদ্ধতা নেই। এটি এমনকি আকাশগঙ্গার বাইরের বস্তু, যেমন— ফাস্ট রেডিও বার্স্ট (FRBs)-এর দূরত্ব পরিমাপেও ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।

৪. যুক্ত থাকা প্রধান প্রতিষ্ঠান এবং অঞ্চল

  • আইআইটি-কানপুর এবং রমন রিসার্চ ইনস্টিটিউট: এই গবেষণায় নেতৃত্বদানকারী ভারতের প্রধান প্রতিষ্ঠান।
  • গাম নেবুলা (Gum Nebula): আয়নিত গ্যাসের একটি বিশাল অঞ্চল যেখানে ১০টি ভিন্ন পালসারের ওপর ভিত্তি করে নতুন মডেলটি পরীক্ষা করা হয়েছে।
  • ভেলা পালসার উইন্ড নেবুলা: একটি প্রধান মহাজাগতিক লক্ষ্যবস্তু যা বিচ্ছুরণ এবং ডিসপারসন মডেলগুলোকে যাচাই (validate) করতে ব্যবহৃত হয়েছে।
Q. 'পালসার' এবং মহাকাশের দূরত্ব পরিমাপের প্রসঙ্গে নিচের বিবৃতিগুলো বিবেচনা করুন:

1. পালসার হলো মৃত নক্ষত্রের দ্রুত ঘূর্ণায়মান অবশিষ্টাংশ যা নিয়মিত রেডিও তরঙ্গের রশ্মি নির্গত করে।

2. ডিসপারসন মেজার (DM) পদ্ধতিটি এই তথ্যের ওপর নির্ভর করে যে, আন্তঃনাক্ষত্রিক মুক্ত ইলেকট্রনগুলো নিম্ন-কম্পাঙ্কের তুলনায় উচ্চ-কম্পাঙ্কের রেডিও তরঙ্গকে বেশি ধীর করে দেয়।

3. প্যারালাক্স পদ্ধতির বিপরীতে, বিচ্ছুরণ-ভিত্তিক এই নতুন দূরত্ব পরিমাপ কৌশলের কোনো নির্দিষ্ট দূরত্বের সীমাবদ্ধতা নেই।

উপরের বিবৃতিগুলোর মধ্যে কয়টি সঠিক?
(a)
মাত্র একটি
(b) মাত্র দুটি
(c) সবকটি (তিনটিই)
(d) একটিও নয়

উত্তর: খ) মাত্র দুটি

ব্যাখ্যা:
বিবৃতি 1 সঠিক: পালসার প্রকৃতপক্ষে নিউট্রন তারার ঘন ও ঘূর্ণায়মান কেন্দ্র যা মহাজাগতিক লাইটহাউসের মতো কাজ করে।

বিবৃতি 2 ভুল: মহাকাশের মাধ্যমে আসার সময় মুক্ত ইলেকট্রনগুলো উচ্চ-কম্পাঙ্কের তুলনায় নিম্ন-কম্পাঙ্কের রেডিও তরঙ্গকে বেশি ধীর করে দেয়। ফলে ভিন্ন ভিন্ন কম্পাঙ্কের তরঙ্গ পৃথিবীতে পৌঁছাতে সময়ের সামান্য পার্থক্য ঘটে।

বিবৃতি 3 সঠিক: প্যারালাক্স পদ্ধতি পৃথিবীর কক্ষপথের জ্যামিতির ওপর সীমাবদ্ধ হলেও, বিচ্ছুরণ-ভিত্তিক পদ্ধতি তাত্ত্বিকভাবে আমাদের গ্যালাক্সির বাইরের অনেক দূরের বস্তুর ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যেতে পারে।

Practice Today’s MCQs