প্রেক্ষাপট
সম্প্রতি একটি বড় হাইকোর্টের রায়ের পর ভুলে যাওয়ার অধিকার (Right to be Forgotten) বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। আদালত রায় দিয়েছে যে, কোনো ব্যক্তির অতীতের আইনি সমস্যাগুলো ইন্টারনেটে তার জীবনকে স্থায়ীভাবে নষ্ট করতে পারে না। আদালত সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, যেসব ব্যক্তি নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন, কিংবা যারা ঘরোয়া পারিবারিক বিরোধ মিটিয়ে ফেলেছেন, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১ (Article 21)-এর অধীনে তাদের গোপনীয়তার অধিকার রয়েছে। তাদের সম্মান ও ভবিষ্যতের সুযোগগুলো রক্ষা করার জন্য, ইন্টারনেট সার্চ ইঞ্জিন এবং আইনি ওয়েবসাইটগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা জনসাধারণের সার্চ রেজাল্ট থেকে ওই ব্যক্তিদের নাম সরিয়ে ফেলে, যাতে একটি সাধারণ অনলাইন সার্চ তাদের স্থায়ী ছায়ার মতো তাড়া করে না বেড়ায়।
১. ধারণা এবং কার্যপদ্ধতি
- সংজ্ঞা: ভুলে যাওয়ার অধিকার (RTBF) ব্যক্তিদের এই সুযোগ দেয় যে, যখন কোনো ব্যক্তিগত তথ্য অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায় বা তার পেছনে কোনো বৈধ জনস্বার্থ থাকে না, তখন তারা পাবলিক ডিজিটাল মাধ্যম থেকে সেই তথ্য সীমিত, আড়াল বা অপসারণ করার অনুরোধ করতে পারেন।
- ডি-ইনডেক্সিং বনাম সম্পূর্ণ মুছে ফেলা (De-indexing vs. Erasure): ডি-ইনডেক্সিং মানে সরকারি আর্কাইভ বা নথিপত্র থেকে মামলার রেকর্ড পুরোপুরি মুছে ফেলা নয়। এটি অনলাইন সার্চ ইঞ্জিনগুলোকে এমনভাবে পরিবর্তন করে যাতে কোনো ব্যক্তির নাম দিয়ে সার্চ করলে সেই রেকর্ডটি সবার প্রথমে না আসে। এর ফলে প্রাতিষ্ঠানিক রেকর্ডও ঠিক থাকে এবং ব্যক্তির নিজস্ব গোপনীয়তাও রক্ষা পায়।
- উৎস: এটি বিশ্বব্যাপী প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পায় ২০১৪ সালে ‘গুগল স্পেন’ মামলায় ইউরোপীয় বিচার আদালত (European Court of Justice) দ্বারা এবং পরবর্তীতে ইইউ-এর জেনারেল ডেটা প্রোটেকশন রেগুলেশন (GDPR)-এর অধীনে এটি সংহতি লাভ করে।
২. ভারতে আইনি মর্যাদা
- সাংবিধানিক ভিত্তি: এটি একটি অলিখিত অধিকার যা সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক কে. এস. পুট্টাস্বামী বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া (২০১৭) মামলার গোপনীয়তা রায়ের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে অনুচ্ছেদ ২১ (জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার)-এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
- আইনগত কাঠামো: যদিও বিচার বিভাগ উল্লেখ করেছে যে আদালতের রেকর্ড ডি-ইনডেক্স করার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো আইনি কোড নেই, তবুও ব্যক্তিগত তথ্য মুছে ফেলার এই মূল নীতিটি ডিজিটাল পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন (DPDP) অ্যাক্ট, ২০২৩-এর বিধানগুলো দ্বারা সমর্থিত।
- মাধ্যমের দায়িত্ব (Intermediary Duty): আইটি রুলস, ২০২১ (IT Rules, 2021)-এর অধীনে, আদালতের নির্দেশ থাকলে ডিজিটাল মাধ্যমগুলো নির্দিষ্ট কোনো তথ্য সরিয়ে নিতে বা ডি-ইনডেক্স করতে বাধ্য।
৩. বিচার বিভাগীয় ব্যতিক্রমসমূহ (এটি কোনো পরম অধিকার নয়)
ভুলে যাওয়ার অধিকার যুক্তিসঙ্গত কিছু শর্ত সাপেক্ষে নিয়ন্ত্রিত এবং নিচের পরিস্থিতিগুলোতে আদালত এই অধিকারের আবেদন খারিজ করে দেয়:
- জঘন্য অপরাধ বা নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে ঘটিত কোনো অপরাধের সাজাপ্রাপ্ত হলে।
- কোনো সরকারি কর্মকর্তা দ্বারা আর্থিক জালিয়াতি, দুর্নীতি বা জনগণের বিশ্বাসের বড় ধরনের অবমাননা হলে।
- এমন কোনো বিষয় যেখানে অবিচ্ছিন্ন জনস্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে, অথবা তথ্য মুছে ফেললে ঐতিহাসিক রেকর্ড বিকৃত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
- ভৌগোলিক পরিধি: ইন্টারনেট বা ডিজিটাল দুনিয়ার কোনো সীমানা না থাকায়, আদালত মনে করে যে এই ডি-ইনডেক্সিং কার্যকর করতে হলে সার্চ ইঞ্জিনের সমস্ত আঞ্চলিক ডোমেইনে এটি বিশ্বব্যাপী প্রয়োগ করা উচিত।
প্রশ্ন: ভারতে 'ভুলে যাওয়ার অধিকার' সম্পর্কিত নিচের বিবৃতিগুলো বিবেচনা করুন:
বিবৃতি I: 'ভুলে যাওয়ার অধিকার' হলো একটি পরম মৌলিক অধিকার (Absolute Fundamental Right) যা ভারতের সংবিধানের তৃতীয় খণ্ডে (Part III) স্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে।
বিবৃতি II: 'ভুলে যাওয়ার অধিকার'-এর অধীনে একটি বিচার বিভাগীয় রেকর্ড ডি-ইনডেক্স করলে সেটি পাবলিক আইনি ডেটাবেস এবং আদালতের আর্কাইভ থেকে স্থায়ীভাবে মুছে যায়।
উপরের বিবৃতিগুলোর প্রেক্ষিতে নিচের কোনটি সঠিক?
(a) বিবৃতি I এবং বিবৃতি II উভয়ই সঠিক এবং বিবৃতি II হলো বিবৃতি I-এর সঠিক ব্যাখ্যা
(b) বিবৃতি I এবং বিবৃতি II উভয়ই সঠিক এবং বিবৃতি II হলো বিবৃতি I-এর সঠিক ব্যাখ্যা নয়
(c) বিবৃতি I সঠিক কিন্তু বিবৃতি II ভুল
(d) বিবৃতি I এবং বিবৃতি II উভয়ই ভুল
সমাধান ও উত্তর
সঠিক উত্তর: (d)
• বিবৃতি I ভুল: 'ভুলে যাওয়ার অধিকার' কোনো পরম বা অনিয়ন্ত্রিত অধিকার নয়, এবং এটি সংবিধানের তৃতীয় খণ্ডে স্পষ্টভাবে লেখাও নেই। এটি অনুচ্ছেদ ২১ (পুট্টাস্বামী মামলা)-এর বিচার বিভাগীয় ব্যাখ্যার মাধ্যমে পাওয়া একটি অলিখিত অধিকার এবং এটি উন্মুক্ত বিচার ব্যবস্থা ও জনস্বার্থের মতো ব্যতিক্রম দ্বারা সীমাবদ্ধ।
• বিবৃতি II ভুল: ডি-ইনডেক্সিং মানে অফিশিয়াল নথিপত্র থেকে একটি রায় স্থায়ীভাবে মুছে ফেলা নয়। এটি কেবল সাধারণ সার্চ ইঞ্জিনে ব্যক্তির নাম দিয়ে সার্চ করলে মামলাটি সামনে আসা বন্ধ করে, কিন্তু সরাসরি আইনি সাইটেশন বা মামলা নম্বর দিয়ে খুঁজলে রেকর্ডটি সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়।