UPSC প্রিলিমসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক (IR)
বিষয়বস্তু (About IWT)
- সংজ্ঞা ও তারিখ: সিন্ধু জলচুক্তি (Indus Waters Treaty) হলো ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি দ্বিপাক্ষিক জলবণ্টন চুক্তি, যা ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৬০ তারিখে করাচিতে স্বাক্ষরিত হয়।
- মধ্যস্থতাকারী: সিন্ধু নদ অববাহিকার জলসম্পদ সঠিক ব্যবহারের জন্য বিশ্বব্যাংক (World Bank) এই চুক্তিতে মধ্যস্থতা করেছিল।
- মূল ভূমিকা: এই চুক্তিটি সিন্ধু অববাহিকার ৬টি নদীর জল দুই দেশের মধ্যে বণ্টন করে এবং পারস্পরিক সহযোগিতা ও বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলে।
পটভূমি
- দেশভাগের পূর্বে (১৯৪৭): সিন্ধু অববাহিকা সেচ ব্যবস্থা একটি একক সমন্বিত নেটওয়ার্ক হিসেবে পরিচালিত হতো।
- দেশভাগের প্রভাব: দেশভাগের ফলে অববাহিকাটি দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে:
- ভারত: উজান রাষ্ট্র (Upper Riparian)
- পাকিস্তান: ভাটি রাষ্ট্র (Lower Riparian)
- জটিলতা: মাধোপুর (রাভি) এবং ফিরোজপুর (শতদ্রু) এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্যানেল হেডওয়ার্কগুলো ভারতে থেকে যায়, অথচ প্রধান সেচ খালগুলো পাকিস্তানের কৃষিভূমিতে চলে যায়।
- বিরোধের সূচনা: স্বাধীনতার পরেই দুই দেশের মধ্যে জল নিয়ে তীব্র বিরোধ দেখা দেয়।
- বিশ্বব্যাংকের উদ্যোগ: ১৯৫১ সালে বিশ্বব্যাংক দুই দেশের মধ্যে আলোচনা শুরু করায়।
- চুক্তি স্বাক্ষর: প্রায় ৯ বছরের টানা আলোচনার পর, ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৬০ তারিখে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান বিশ্বব্যাংকের স্বাক্ষরসহ এই ঐতিহাসিক চুক্তিতে সই করেন।
চুক্তির আওতাধীন নদীসমূহ
সিন্ধু জলচুক্তির অধীনে সিন্ধু নদ ব্যবস্থার মোট ৬টি নদী অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:
| নদীর শ্রেণীবিভাগ | নদীর নাম | বণ্টন ও ব্যবহারের অধিকার |
| পূর্বদিকের নদীসমূহ (Eastern Rivers) | রাভি (ইরাবতী), বিয়াস (বিপাশা) ও সাতলেজ (শতদ্রু) | ভারতের জন্য অবাধ ও একচ্ছত্র ব্যবহারের অধিকার। |
| পশ্চিমদিকের নদীসমূহ (Western Rivers) | সিন্ধু, ঝিলম (বিতস্তা) ও চেনাব (চন্দ্রভাগা) | প্রধানত পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ, তবে ভারত সীমিত ব্যবহারের অনুমতি পায়। |
পশ্চিমদিকের নদীগুলোতে ভারতের অনুমোদিত ব্যবহার
ভারত পশ্চিমদিকের নদীগুলোর (সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাব) জল নিম্নলিখিত কাজের জন্য ব্যবহার করতে পারে:
- গৃহস্থালি কাজ, নৌ চলাচল, মৎস্য চাষ, বিনোদন এবং সীমিত সেচ কাজ।
- রান-অফ-দ্য-রিভার (Run-of-the-river) জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ।
- নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে জল সঞ্চয় বা জলাধার তৈরি করা যাবে, তবে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ সম্পূর্ণ পরিবর্তন বা বন্ধ করা যাবে না।
স্থায়ী সিন্ধু কমিশন (Permanent Indus Commission – PIC)
- চুক্তির ধারা VIII (Article VIII) অনুযায়ী স্থায়ী সিন্ধু কমিশন গঠন করা হয়।
- এই কমিশনে প্রতিটি দেশ থেকে একজন করে কমিশনার থাকেন।
- তথ্য বিনিময়, প্রকল্প পরিদর্শন, প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধান এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে কমিশন প্রতি বছর বৈঠকে মিলিত হয়।
তথ্য বিনিময়
স্বচ্ছতা ও চুক্তির সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে ভারত ও পাকিস্তান নিয়মিত নদীর জলপ্রবাহের তথ্য, হাইড্রোলজিক্যাল ডেটা, বন্যার পূর্বাভাস এবং নতুন প্রকল্পের বিশদ বিবরণ একে অপরের সাথে শেয়ার করে।
একতরফা চুক্তি বাতিলের সুযোগ নেই (No Unilateral Exit)
- এই চুক্তিতে কোনো একতরফা বেরিয়ে আসার বা ‘এক্সিট ক্লজ’ (Exit Clause) নেই।
- ভারত ও পাকিস্তান— দুই দেশেরই যৌথ সম্মতি ও আলোচনার মাধ্যমে কেবল এই চুক্তি সংশোধন বা বাতিল করা সম্ভব।
চুক্তির আওতায় প্রধান প্রকল্পসমূহ ও বিরোধ
- বাগলিহার জলবিদ্যুৎ প্রকল্প (Baglihar Hydroelectric Project): চেনাব নদীর ওপর নির্মিত এই প্রকল্পটি ২০০৭ সালে বিশ্বব্যাংকের এক নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ (Neutral Expert) পরীক্ষা করে অনুমোদন দেন।
- কিষানগঙ্গা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প (Kishanganga Hydroelectric Project): ঝিলম নদীর উপনদীর ওপর অবস্থিত এই প্রকল্পের বিষয়ে ২০১৩ সালে স্থায়ী সালিশি আদালত (Court of Arbitration) রায় প্রদান করে।
- রাতলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প (Ratle Hydroelectric Project): চেনাব নদীর ওপর প্রস্তাবিত এই প্রকল্পটি এখনও ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি বড় বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু।
উপসংহার
নানা বিতর্ক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও ভারত-পাকিস্তান জল সহযোগিতার ক্ষেত্রে সিন্ধু জলচুক্তি একটি প্রধান ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে টিকে রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এই চুক্তির সাফল্য নির্ভর করছে সঠিক বাস্তবায়ন, পারস্পরিক আস্থা এবং নতুন জলবায়ুগত চ্যালেঞ্জগুলোর সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ওপর।