প্রেক্ষাপট
সম্প্রতি ওড়িশার রায়গড়া জেলায় প্রস্তাবিত সিজিমালি (Sijimali) বক্সাইট খনি অভিমুখী একটি রাস্তা নির্মাণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের সাথে পুলিশের তীব্র সংঘর্ষ ঘটে। কুতামাল গ্রামের বাসিন্দারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, প্রায় ৩১১ মিলিয়ন টন বক্সাইট সমৃদ্ধ এই খনি প্রকল্পটি তাদের এলাকার চিরস্থায়ী জলের উৎসগুলো শুকিয়ে দেবে এবং তাদের ঐতিহ্যবাহী জীবিকাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এই ঘটনাটি বেদান্ত লিমিটেডের মতো বড় কোম্পানিগুলোর শিল্পায়ন এবং সাংবিধানিক কাঠামোর অধীনে আদিবাসী অধিকার রক্ষার মধ্যে চলমান দ্বন্দ্বকে পুনরায় সামনে এনেছে।
১. বক্সাইট: অ্যালুমিনিয়ামের আকরিক
- উপাদান: বক্সাইট কোনো নির্দিষ্ট খনিজ নয়, এটি প্রধানত হাইড্রেটেড অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড সমৃদ্ধ একটি শিলা।
- ভূতাত্ত্বিক গঠন: ক্রান্তীয় ও উপ-ক্রান্তীয় জলবায়ুতে অ্যালুমিনিয়াম সিলিকেট সমৃদ্ধ শিলাসমূহের পচনের ফলে (ল্যাটেরালাইজেশন পদ্ধতি) এটি গঠিত হয়।
- ব্যবহার: এটি অ্যালুমিনা তৈরির প্রধান উৎস, যা থেকে পরবর্তীতে অ্যালুমিনিয়াম তৈরি করা হয়। অ্যালুমিনিয়াম মহাকাশ গবেষণা, নির্মাণ এবং প্যাকেজিং শিল্পের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাতু।
২. ভারতে বক্সাইটের বণ্টন
২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী ভারতে বক্সাইটের মোট সঞ্চয় প্রায় ৬৫০ মিলিয়ন টন। পূর্বঘাট পর্বতমালা ভারতের প্রধান বক্সাইট উৎপাদনকারী অঞ্চল।
ক. ওড়িশা (শীর্ষস্থানীয়):
- অবদান: ভারতের মোট বক্সাইট উৎপাদনের ৫০ শতাংশের বেশি এখানে হয়।
- প্রধান অঞ্চল: কালাহান্ডি এবং কোরাপুট জেলা জুড়ে বিস্তৃত ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ বেল্টটি দেশের বৃহত্তম বক্সাইট সমৃদ্ধ অঞ্চল।
- গুরুত্বপূর্ণ খনি: পঞ্চপতমালি (কোরাপুট) এশিয়ার বৃহত্তম বক্সাইট খনি হিসেবে পরিচিত; এটি দামানজোদিতে অবস্থিত ন্যালকো (NALCO) রিফাইনারিতে আকরিক সরবরাহ করে। এছাড়াও গন্ধমর্দন (বরগড়) এবং কোডিংামালি (রায়গড়া) অন্যতম প্রধান খনি।
খ. গুজরাট:
- অবদান: এটি ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎপাদক (প্রায় ১৫-১৮%)।
- অবস্থান: কচ্ছ উপসাগর এবং আরব সাগরের মধ্যবর্তী অঞ্চলে এর সঞ্চয় দেখা যায়।
- জেলা: জামনগর, দেবভূমি দ্বারকা, জুনাগড় এবং ভাবনগর।
গ. ঝাড়খণ্ড:
- অবস্থান: লোহারদাগা এবং গুমলার ‘প্যাটল্যান্ড’ (Patlands) উচ্চমানের বক্সাইটের জন্য বিখ্যাত।
ঘ. ছত্তিশগড় ও মধ্যপ্রদেশ:
- মাইকালা রেঞ্জ: বিলাসপুর ও দুর্গ জেলায় প্রচুর বক্সাইট পাওয়া যায়।
- অমরকন্টক মালভূমি: এটি মধ্যপ্রদেশের শাহদোল ও মন্ডলা এবং ছত্তিশগড়ের সুরগুজা জেলা জুড়ে বিস্তৃত।
৩. বিশ্বের শীর্ষ বক্সাইট উৎপাদনকারী দেশ
অস্ট্রেলিয়া এবং গিনি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বক্সাইট উৎপাদক। এছাড়াও চীন এবং ব্রাজিল উল্লেখযোগ্য উৎপাদক দেশ।
৪. আদিবাসী এলাকার সাংবিধানিক ও আইনি সুরক্ষা
- পঞ্চম তফশিল (Fifth Schedule): ওড়িশার বক্সাইট সমৃদ্ধ অধিকাংশ এলাকা সংবিধানের পঞ্চম তফশিলের অন্তর্গত, যা তপশিলি এলাকা ও জনজাতিদের প্রশাসনের বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করে।
- পিইএসএ (PESA) আইন, ১৯৯৬: এই আইন অনুযায়ী, তপশিলি এলাকায় ভূমি অধিগ্রহণ বা খনি ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রামসভার সাথে পরামর্শ করা বাধ্যতামূলক।
- বন অধিকার আইন (FRA), ২০০৬: এটি বনের জমিতে বসবাসকারী সম্প্রদায়ের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয় এবং বনভূমি অন্য কাজে ব্যবহারের জন্য তাদের সম্মতি প্রয়োজন হয়।
৫. পরিবেশগত ও সামাজিক উদ্বেগ
- জলের উৎস শুকিয়ে যাওয়া: পাহাড়ের ওপরের বক্সাইটের স্তর প্রাকৃতিক আধারের মতো কাজ করে যা ঝরনাগুলোকে সচল রাখে; এই স্তর খনন করলে জলের উৎসগুলো শুকিয়ে যেতে পারে।
- উচ্ছেদ: খনি প্রকল্পের ফলে আদিবাসীদের বাধ্যতামূলক উচ্ছেদ ঘটে, যা তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ঐতিহ্যবাহী অর্থনৈতিক কাঠামো নষ্ট করে।
- বাস্তুসংস্থান: উন্মুক্ত খনি (Open-cast mining) ব্যবস্থার ফলে পূর্বঘাট অঞ্চলে ব্যাপক বন উজাড় এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয়।
প্রশ্ন: ভারতের বক্সাইট সম্পদ প্রসঙ্গে নিচের বিবৃতিগুলো বিবেচনা করুন:
১. বক্সাইট প্রধানত ক্রান্তীয় জলবায়ুতে শিলার বায়ুমণ্ডলীয় আবহবিকারের (weathering) মাধ্যমে গঠিত হয়।
২. ওড়িশা রাজ্যে ভারতের মোট বক্সাইট সঞ্চয়ের ৫০ শতাংশের বেশি রয়েছে।
৩. পিইএসএ (PESA) আইন ১৯৯৬-এর অধীনে, তপশিলি এলাকায় গৌণ খনিজ (minor minerals) উত্তোলনের জন্য খনি ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রামসভার সুপারিশ বাধ্যতামূলক।
উপরের কয়টি বিবৃতি সঠিক?
(a) মাত্র একটি
(b) মাত্র দুটি
(c) তিনটিই
(d) কোনটিই নয়
উত্তর: (c) তিনটিই
সমাধান:
• বিবৃতি ১ সঠিক: বিভিন্ন শিলা (যেমন চুনাপাথর বা ব্যাসাল্ট) গরম এবং আর্দ্র ক্রান্তীয় পরিস্থিতিতে রাসায়নিক আবহবিকারের ফলে বক্সাইট গঠিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় সিলিকা অপসারিত হয় এবং অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড সঞ্চিত হতে থাকে।
• বিবৃতি ২ সঠিক: ভারতে বক্সাইট সম্পদের ক্ষেত্রে ওড়িশা অবিসংবাদিত নেতা, যেখানে পূর্বঘাট পর্বতমালা অঞ্চলে বিশাল সঞ্চয় রয়েছে।
• বিবৃতি ৩ সঠিক: 'পঞ্চায়েত (তপশিলি এলাকায় সম্প্রসারণ) আইন, ১৯৯৬' বা PESA আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, তপশিলি এলাকায় গৌণ খনিজের জন্য খনি ইজারা বা লাইসেন্স দেওয়ার আগে উপযুক্ত স্তরে গ্রামসভা বা পঞ্চায়েতের সুপারিশ বা সম্মতি প্রয়োজন। যদিও বক্সাইট একটি প্রধান খনিজ, তবুও এই অঞ্চলগুলোতে গ্রামসভার সাথে পরামর্শ করা শাসনের একটি মৌলিক ভিত্তি।