প্রেক্ষাপট
সম্প্রতি, ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ (ASI) মুম্বাইয়ের কাছে এলিফ্যান্টা দ্বীপে (যা ঘারাপুরী নামেও পরিচিত) মোরাবন্দর এলাকায় ১,৫০০ বছরের পুরনো একটি ধাপযুক্ত জলাধারের সন্ধান পেয়েছে। এই আবিষ্কারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি দ্বীপের বিখ্যাত পাথর-কাটা গুহাগুলোর চেয়ে আলাদা একটি উন্নত এবং ইঞ্জিনিয়ারড জল ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির পরিচয় দেয়। খননকার্যের ফলে কালচুরি শাসক কৃষ্ণরাজের রৌপ্য ও তামার মুদ্রা এবং আমদানিকৃত মৃৎপাত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা প্রাচীন বৈশ্বিক বাণিজ্য নেটওয়ার্কের সাথে এই দ্বীপের সংযোগের প্রমাণ দেয়।
১. আবিষ্কারের প্রত্নতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য
- কাঠামো: এটি একটি বিশাল T-আকৃতির ধাপযুক্ত জলাধার, যা প্রায় ১৪.৭ মিটার দীর্ঘ। এটি মূল ভূখণ্ড থেকে আনা পাথরের ব্লক নিখুঁতভাবে সাজিয়ে তৈরি করা হয়েছে।
- ইঞ্জিনিয়ারিং: দ্বীপের বর্তমান পাথর-কাটা কুয়োগুলোর তুলনায় এটি একটি নির্মিত কাঠামো (Built Structure)। এটি প্রাচীন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একটি পরিপক্ক পর্যায়কে নির্দেশ করে, যা দ্বীপের পাথুরে ভূখণ্ড এবং মিষ্টি জলের অভাব দূর করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল।
- অবস্থান: স্থানটি মোরাবন্দরে অবস্থিত, যা দ্বীপের তিনটি প্রাচীন বন্দর এলাকার মধ্যে একটি (অন্য দুটি হলো রাজবন্দর এবং শেঠবন্দর)।
- সংশ্লিষ্ট নিদর্শন: খননকার্যে কাপড়ের রঙ করার পাত্র (Dyeing vat), পোড়ামাটির মূর্তি, পাথরের নোঙ্গর এবং ৩,০০০-এরও বেশি মাটির পাত্রের টুকরো পাওয়া গেছে।
২. মাহিষ্মতীর কালচুরি রাজবংশ
- সময়কাল: তারা ৬ষ্ঠ এবং ৭ম শতাব্দীতে বর্তমান মহারাষ্ট্র, গুজরাট এবং মালওয়ার কিছু অংশে রাজত্ব করত।
- প্রধান শাসক (কৃষ্ণরাজ): এই রাজবংশের প্রথম পরিচিত শক্তিশালী রাজা। তিনি ‘পরম-মাহেশ্বর’ উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর মুদ্রাগুলো কোঙ্কণ অঞ্চল এবং এমনকি দক্ষিণ ভারতেও ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল।
- সাংস্কৃতিক অবদান: ধারণা করা হয় যে, এলিফ্যান্টা দ্বীপের বিখ্যাত শিব গুহা এবং হিন্দু গুহাগুলোর নির্মাণ কালচুরি রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু হয়েছিল।
৩. প্রাচীন বিশ্ব বাণিজ্যের প্রমাণ
- ভূমধ্যসাগরীয় সংযোগ: খননকার্যে ৩,০০০-এর বেশি অ্যামফোরা (Amphorae) বা সরু গলার পাত্রের টুকরো পাওয়া গেছে, যা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে ওয়াইন বা অলিভ অয়েল আমদানির প্রমাণ দেয়।
- পশ্চিম এশীয় সংযোগ: এখানে প্রচুর পরিমাণে টর্পেডো জার (Torpedo Jars) পাওয়া গেছে, যা মূলত মেসোপটেমিয়া বা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা বাণিজ্যের নির্দেশক।
- সামুদ্রিক কৌশল: এলিফ্যান্টা দ্বীপটি আরব সাগরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ঘাঁটি (Trade Hub) হিসেবে কাজ করত, যা আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক রুটগুলোকে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত করত।
৪. এলিফ্যান্টা গুহা (Elephanta Caves)
- ইউনেস্কো মর্যাদা (UNESCO Status): ১৯৮৭ সালে এটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান (World Heritage Site) হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
- স্থাপত্য: এটি প্রধানত ভগবান শিবের প্রতি উৎসর্গীকৃত পাথর-কাটা ব্যাসাল্ট (basalt) ভাস্কর্যের জন্য বিখ্যাত।
- মূর্তিশিল্প (Iconography): এখানকার উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্য হলো ত্রিমূর্তি সদাশিব (সৃজনকারী, পালনকারী এবং বিনাশকারী হিসেবে শিবের তিন মুখ বিশিষ্ট মূর্তি), নটরাজ এবং অর্ধনারীশ্বর।
- ঐতিহাসিক স্তর: এটি প্রধানত শৈব (৫টি হিন্দু গুহা) হলেও, দ্বীপে দুটি বৌদ্ধ গুহা রয়েছে।
- পর্তুগিজ প্রভাব: ১৫৩৪ সালে গুজরাটের সুলতান এটি পর্তুগিজদের কাছে হস্তান্তর করেন। দ্বীপের একটি উঁচু টিলায় অবস্থিত একটি বিশালাকার কালো পাথরের হাতির মূর্তির সম্মানার্থে পর্তুগিজরা এর নাম দিয়েছিল “এলিফ্যান্টা আইল্যান্ড”।
Q: এলিফ্যান্টা দ্বীপে সম্প্রতি আবিষ্কৃত ১,৫০০ বছরের পুরনো জলাধার সম্পর্কে নিচের বিবৃতিগুলো বিবেচনা করুন:
1. জলাধারটি ঘারাপুরী পাহাড়ের ব্যাসাল্ট শিলা কুঁদে তৈরি একটি পাথর-কাটা কুয়ো (rock-cut cistern)।
2. এখান থেকে প্রাপ্ত নিদর্শনের মধ্যে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের অ্যামফোরা (amphorae) পাওয়া গেছে, যা প্রাচীন সামুদ্রিক বাণিজ্যের ইঙ্গিত দেয়।
3. এই স্থান থেকে প্রাপ্ত মুদ্রাসংক্রান্ত তথ্য ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে কালচুরি রাজবংশের উপস্থিতির প্রমাণ দেয়।
উপরের কয়টি বিবৃতি সঠিক?
(a) মাত্র একটি
(b) মাত্র দুটি
(c) তিনটিই
(d) কোনটিই নয়
উত্তর: (b) মাত্র দুটি
সমাধান:
• বিবৃতি 1 ভুল: ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের মতে, এই নির্দিষ্ট জলাধারটি মূল ভূখণ্ড থেকে আনা পাথরের ব্লক দিয়ে তৈরি একটি নির্মিত কাঠামো (built structure), এটি পাথর-কাটা কুয়ো নয়।
• বিবৃতি 2 সঠিক: প্রত্নতাত্ত্বিকরা ৩,০০০-এর বেশি ভূমধ্যসাগরীয় অ্যামফোরা এবং পশ্চিম এশীয় টর্পেডো জারের টুকরো পেয়েছেন, যা দীর্ঘ দূরত্বের বাণিজ্যের প্রমাণ।
• বিবৃতি 3 সঠিক: কালচুরি শাসক কৃষ্ণরাজের (৬ষ্ঠ শতাব্দী) বেশ কিছু তামা ও রূপার মুদ্রা পাওয়া গেছে, যা 'বসা ষাঁড়' (seated bull) এবং রাজার নাম খোদাই করা দেখে শনাক্ত করা হয়েছে।