প্রেক্ষাপট:
২০২৬ সাল হলো রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভি (RIN) বা নৌ-বিদ্রোহের ৮০তম বার্ষিকী। এটি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, যা ধর্মীয় বিভেদকে ছাপিয়ে গিয়েছিল এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
১. বিদ্রোহের সূত্রপাত
১৯৪৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বোম্বের (মুম্বাই) HMIS Talwar নামক উপকূলীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে এই বিদ্রোহ শুরু হয়। নৌ-সেনাদের (Naval Ratings) একটি ক্ষুধা ধর্মঘট দিয়ে যা শুরু হয়েছিল, তা দ্রুত একটি ব্যাপক গণঅভ্যুত্থানের রূপ নেয়। এর প্রধান কারণগুলো ছিল:
- অমানবিক পরিস্থিতি: নিম্নমানের খাবার এবং কম বেতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।
- বর্ণবৈষম্য: ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের দ্বারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে করা খারাপ ব্যবহার।
- রাজনৈতিক প্রভাব: ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’ (INA)-এর বন্দিদের বিচার এবং সুভাষচন্দ্র বসুর ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বের প্রভাব।
২. বিদ্রোহের পরিধি ও বিস্তার
এই অভ্যুত্থান কেবল স্থানীয় কোনো “দাঙ্গা” ছিল না, বরং এটি ছিল নৌ-সেনা ও সাধারণ মানুষের একটি সুসংগঠিত প্রতিরোধ:
- ভৌগোলিক বিস্তার: এটি বোম্বে থেকে করাচি, মাদ্রাজ, কোচিন, বিশাখাপত্তনম এবং কলকাতা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
- অংশগ্রহণ: প্রায় ২০,০০০ নৌ-সেনা, ৭৮টি জাহাজ এবং ২০টি উপকূলীয় স্থাপনা এতে যুক্ত ছিল।
- প্রতীকী ঐক্য: নৌ-সেনারা জাহাজের মাস্তুলে একই সাথে কংগ্রেস, মুসলিম লীগ এবং কমিউনিস্ট পার্টির পতাকা উত্তোলন করেন, যা ছিল অভূতপূর্ব সাম্প্রদায়িক ঐক্যের নিদর্শন।
- সেন্ট্রাল স্ট্রাইক কমিটি: এম. এস. খানের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটি রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি এবং ইন্দোনেশিয়া ও মিশর থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের দাবি জানায়।
৩. সাধারণ মানুষের সংহতি
এই বিদ্রোহ বোম্বের সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশেষ করে শিল্পাঞ্চলগুলোতে (কামাঠিপুরা এবং মদনপুরা) ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
- হিন্দু-মুসলিম ঐক্য: উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ মিলে হরতাল পালন করে এবং ব্রিটিশদের মেশিনগানের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যায়।
- হতাহত: ব্রিটিশরা এই বিদ্রোহ দমনে সাঁজোয়া যান ও ভারী অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করলে ২০০-র বেশি সাধারণ মানুষ নিহত হন।
- আত্মসমর্পণ: সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এবং মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর আশ্বাসে (যদিও পরে সেই আশ্বাস রক্ষা করা হয়নি), নৌ-সেনারা ১৯৪৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি আত্মসমর্পণ করেন।
৪. ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও উত্তরাধিকার
- ব্রিটিশ শাসনের ওপর প্রভাব: এই বিদ্রোহ ব্রিটিশদের বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে তারা আর ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর ওপর ভরসা করতে পারবে না।
- ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান: এটি ক্ষমতার হস্তান্তরের বিষয়ে আলোচনার জন্য ভারতে ক্যাবিনেট মিশন পাঠানোর প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছিল।
Q: ১৯৪৬ সালের রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভি (RIN) বিদ্রোহের প্রেক্ষিতে নিচের বিবৃতিগুলো বিবেচনা করুন:
I. এই অভ্যুত্থান প্রাথমিকভাবে HMIS Talwar-এ বর্ণবৈষম্য এবং খাবারের খারাপ মানের প্রতিবাদ হিসেবে শুরু হয়েছিল।
II. 'নেভাল সেন্ট্রাল স্ট্রাইক কমিটি' বি. সি. দত্তের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল এবং তারা শুধুমাত্র চাকরির শর্তাবলির উন্নতির দাবি জানিয়েছিল।
III. এই বিদ্রোহে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের পূর্ণ সমর্থন ছিল এবং তারা নৌ-সেনাদের ধর্মঘট চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করেছিলেন।
IV. এই বিদ্রোহটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক বিরল নিদর্শন ছিল, যেখানে প্রতিবাদকারীরা কংগ্রেস, মুসলিম লীগ এবং কমিউনিস্ট পার্টির পতাকা একসাথে উত্তোলন করেছিলেন।
উপরের বিবৃতিগুলোর মধ্যে কোনগুলো সঠিক?
(a) শুধুমাত্র I এবং II
(b) শুধুমাত্র I এবং IV
(c) শুধুমাত্র II এবং III
(d) শুধুমাত্র I, II এবং IV
উত্তর: B
ব্যাখ্যা:
• বিবৃতি I সঠিক: বিদ্রোহটি ১৯৪৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বোম্বের HMIS Talwar-এ শুরু হয়েছিল।
• বিবৃতি II ভুল: বি. সি. দত্ত শুরুর দিকের একজন নায়ক হলেও সেন্ট্রাল স্ট্রাইক কমিটির প্রধান ছিলেন এম. এস. খান। এছাড়া তাদের দাবি কেবল চাকরির শর্তে সীমাবদ্ধ ছিল না, তাতে রাজনৈতিক দাবিও ছিল।
• বিবৃতি III ভুল: কংগ্রেস (সর্দার প্যাটেল) এবং মুসলিম লীগ (জিন্নাহ) বিদ্রোহের হিংসাত্মক পথ সমর্থন করেননি এবং তাদের আত্মসমর্পণের পরামর্শ দিয়েছিলেন।
• বিবৃতি IV সঠিক: ১৯৪৬-এর বিদ্রোহে তেরঙা, অর্ধচন্দ্র এবং হাতুড়ি-কাস্তে খচিত পতাকা একসাথে ওড়ার মাধ্যমে প্রবল সাম্প্রদায়িক ঐক্য দেখা গিয়েছিল।