এই নিবন্ধটি পড়ার পর আপনি UPSC Mains-এর এই মডেল প্রশ্নটির উত্তর দিতে সক্ষম হবেন:
ভারতে বোতলজাত জলের ব্যবহারের দ্রুত বৃদ্ধি ‘নিরাপত্তার ধারণা’ এবং ‘উদ্যমান স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি’র মধ্যে এক কঠিন আপসকে তুলে ধরে। প্যাকেজজাত পানীয় জল শিল্পের চ্যালেঞ্জগুলি সমালোচনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করুন। সকলের জন্য পানীয় জলের টেকসই এবং নিরাপদ অ্যাক্সেস নিশ্চিত করতে একটি বহুমুখী (Multi-sectoral) কৌশলের পরামর্শ দিন। (২৫০ শব্দ, ১৫ নম্বর – GS-3, পরিবেশ)
প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষাপট
- বর্তমান ভারতে বোতলজাত পানীয় জল এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং একটি অপরিহার্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে পরিণত হয়েছে। মূলত পুরসভার সরবরাহ করা জলের ওপর আস্থার অভাব এবং “সিল করা প্লাস্টিকের জল মানেই নিরাপদ”—এই বদ্ধমূল ধারণাই এই পরিবর্তনের প্রধান কারণ।
- তবে সাম্প্রতিক বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ বলছে যে, বোতলজাত জল অণুজীবমুক্ত (Microbiological standards) হলেও, এর মধ্যে মিশে থাকা অদৃশ্য রাসায়নিক ও ভৌত দূষক মানবস্বাস্থ্য এবং পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদী ভারসাম্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।
বোতলজাত জলের ব্যবহারের কাঠামোগত বৃদ্ধি
ভারতের বোতলজাত জলের বাজার বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল ক্ষেত্র, যা ২০২৫-২০৩৫ সালের মধ্যে ৬.৫% হারে (CAGR) বৃদ্ধি পাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
ক. বোতলজাত পানীয় জলের প্রসারের কারণসমূহ
- ক্রমবর্ধমান নগরায়ণ, জরাজীর্ণ জনস্বাস্থ্য পরিকাঠামো, অনিয়মিত জল সরবরাহ এবং ভূগর্ভস্থ জলের দূষণের ফলে বোতলজাত জলের ব্যবহার বহুগুণ বেড়েছে।
- রেল স্টেশন, অফিস, হাসপাতাল এবং রেস্তোরাঁগুলোতে এই জল এখন দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
- অদৃশ্য দূষকগুলোর কথা বিবেচনা না করেই “সিল করা” জলকে “নিরাপদ” মনে করার একটি প্রবণতা জনমানসে তৈরি হয়েছে।
খ. প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়ন্ত্রণকারী কাঠামো
- FSSAI (Food Safety and Standards Authority of India) ২০০৬ সালের আইন অনুযায়ী এটি নিয়ন্ত্রণ করে।
- BIS (Bureau of Indian Standards) এর প্রযুক্তিগত মানদণ্ড নির্ধারণ করে।
- নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মূল নজর থাকে:
- ক্ষতিকারক অণুজীব বা ব্যাকটেরিয়া নিয়ন্ত্রণ।
- নির্দিষ্ট কিছু ভারী ধাতু ও রাসায়নিক অবশিষ্টাংশের মাত্রা পরীক্ষা করা।
- তবে বর্তমান সরকারি মানদণ্ডে মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং ন্যানোপ্লাস্টিক পরীক্ষার কোনো বাধ্যতামূলক নিয়ম নেই, যা একটি বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক ঘাটতি (Regulatory gap) হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক: এক অদৃশ্য হুমকি
৫ মিলিমিটারের কম দৈর্ঘ্যের মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং ১ মাইক্রোমিটারের চেয়েও ছোট ন্যানোপ্লাস্টিক বর্তমানে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ।
- ভারতীয় বাজারে ব্যাপকতা: নাগপুর, মুম্বাই এবং অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে গবেষণায় দেখা গেছে যে, পরীক্ষা করা ১০০% নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক বিদ্যমান (প্রতি লিটারে ৭২ থেকে ২১২টি কণা)।
- মান নিয়ন্ত্রণে বৈষম্য: জাতীয় ব্র্যান্ডের তুলনায় স্থানীয়ভাবে বোতলজাত জলে প্লাস্টিকের ঘনত্ব অনেক বেশি পাওয়া গেছে।
- ন্যানোপ্লাস্টিকের অনুপ্রবেশ: ন্যানোপ্লাস্টিক অত্যন্ত বিপজ্জনক কারণ এগুলো কোষের পর্দা, রক্ত-মস্তিষ্কের প্রতিবন্ধক (Blood-brain barrier) এবং গর্ভফুল (Placenta) অতিক্রম করে মানব সংবহনতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে প্রবেশ করতে পারে।
- প্যাথোফিজিওলজিক্যাল প্রভাব: এই কণাগুলো অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ এবং কোষের ক্ষতি করে। এছাড়া এগুলো ‘ট্রোজান হর্স’ হিসেবে কাজ করে শরীরে ভারী ধাতু ও জীবাণু বহন করে আনে।
- রাসায়নিক লিচিং (Leaching): থ্যালেটস, বিসফেনল এ (BPA) এবং অ্যান্টিমনির মতো উপাদান বোতল থেকে জলে মিশে যেতে পারে।
- পরিবেশগত প্রভাব: সরাসরি সূর্যের আলো এবং ভারতের গ্রীষ্মকালীন উচ্চ তাপমাত্রা প্লাস্টিকের রাসায়নিক ভাঙন ও লিচিংয়ের হারকে ত্বরান্বিত করে।
- দীর্ঘস্থায়ী বিষক্রিয়া: লিচ হওয়া এই রাসায়নিকগুলো এন্ডোক্রাইন ডিসরাপ্টর (হরমোন ব্যঘতকারী) হিসেবে কাজ করে, যা প্রজনন বা বিকাশে দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা তৈরি করতে পারে।
- নিয়ন্ত্রণমূলক সীমাবদ্ধতা: বর্তমান মানদণ্ডে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সাথে একাধিক রাসায়নিকের দীর্ঘমেয়াদী বিক্রিয়া বা ‘ককটেল ইফেক্ট’ মূল্যায়নের ব্যবস্থা নেই।
প্যাকেজজাত জল শিল্পের মূল সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ
- ভূগর্ভস্থ জলের অতি-উত্তোলন: এই শিল্প এমন সব জলস্তরের (Aquifers) ওপর নির্ভরশীল যা ইতিমধ্যেই সংকটাপন্ন। বৃষ্টির জল সংরক্ষণের মতো পুনর্ভরণ পদ্ধতিতে এদের বিনিয়োগ অত্যন্ত নগণ্য।
- খনিজ ঘাটতির ঝুঁকি: রিভার্স অসমোসিস (RO) প্রক্রিয়ায় ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের মতো অত্যাবশ্যকীয় খনিজ দূর হয়ে যায়, যা হৃদরোগসহ দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে (WHO-এর সতর্কতা অনুযায়ী)।
- পরিবেশগত প্রভাব: একবার ব্যবহারযোগ্য (Single-use) PET বোতল ভারতের প্লাস্টিক বর্জ্য সংকটকে ঘনীভূত করছে; যার মাত্র ১৩% কার্যকরভাবে রিসাইকেল হয়। বাকি অংশ মাটি ও খাদ্যশৃঙ্খলে মিশে বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করছে।
- তথ্যের অসামঞ্জস্যতা: গ্রাহকরা প্রায়ই ‘ন্যাচারাল মিনারেল ওয়াটার’ এবং সাধারণ ‘প্যাকেজড ড্রিঙ্কিং ওয়াটার’-এর মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন না, যা সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথে বাধা।
নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো এবং প্রধান ঘাটতিসমূহ
ভারতের প্যাকেজজাত জল শিল্প বর্তমানে FSSAI-এর অধীনে একটি বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
- ২০২৪-এর পরিবর্তন: লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ করতে FSSAI বাধ্যতামূলক BIS শংসাপত্র সরিয়ে নিয়েছে। এখন বোতলজাত জলকে “উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ খাদ্য বিভাগ” হিসেবে গণ্য করা হয়, যার জন্য বার্ষিক থার্ড-পার্টি অডিট বাধ্যতামূলক।
- পরীক্ষাগারের সীমাবদ্ধতা (IS 14543): বর্তমান মানদণ্ডে খনিজ ও ভারী ধাতু পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও, মাইক্রোপ্লাস্টিক বা ন্যানোপ্লাস্টিক পরীক্ষার কোনো প্রোটোকল নেই।
- তদারকি ঘাটতি: ক্ষুদ্রায়তন উৎপাদনকারী ইউনিটগুলোতে প্রায়ই কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ এবং ফ্লোরাইড দূষণ ধরা পড়ছে, যা নিয়ম পালনে উদাসীনতা প্রমাণ করে।
নিরাপদ জল ও প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনায় সরকারি উদ্যোগ
১. জল জীবন মিশন (JJM): পরিকাঠামো ও সুবিধা
২০১৯ সালে শুরু হওয়া এই মিশনের লক্ষ্য প্রতিটি গ্রামীণ পরিবারে ট্যাপের মাধ্যমে জল পৌঁছে দেওয়া (২০২৬ পর্যন্ত বর্ধিত লক্ষ্যমাত্রা)।
- ২০২৬-এর অগ্রগতি: ১৯.৩৬ কোটি গ্রামীণ পরিবারের মধ্যে ১৫.৮ কোটিরও বেশি (৮১.৬%) পরিবারে ট্যাপ সংযোগ দেওয়া হয়েছে।
- গুণমান নজরদারি: ২,৮০০টিরও বেশি ল্যাবরেটরি স্থাপন এবং ২৪ লক্ষেরও বেশি নারীকে ফিল্ড টেস্টিং কিট (FTK) ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
- উৎসের স্থায়িত্ব: ভূগর্ভস্থ জল পুনর্ভরণ এবং বৃষ্টির জল সংরক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
২. অমৃত (AMRUT) ২.০: নগর জল নিরাপত্তা
শহরগুলোকে “জল-সুরক্ষিত” (Water secure) করে তোলাই এর মূল লক্ষ্য।
- সর্বজনীন কভারেজ: ৪,৭০০টিরও বেশি সংবিধিবদ্ধ শহরে ১০০% জল সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্য।
- বৃত্তাকার অর্থনীতি: ব্যবহৃত জল পুনর্ব্যবহার (Recycle/Reuse) এবং জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ জলের ওপর চাপ কমানো।
৩. FSSAI-এর নতুন টেস্টিং স্কিম (২০২৬)
২০২৪-এ BIS শংসাপত্র সরানোর পর, ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে আরও কঠোর তদারকি ব্যবস্থা চালু হয়েছে।
- বাধ্যতামূলক পরীক্ষা: উৎপাদকদের প্রতি মাসে অণুজীব পরীক্ষা এবং প্রতি তিন মাস অন্তর ভারী ধাতু ও খনিজ পরীক্ষা করতে হবে।
- ডিজিটাল রেকর্ড: ‘ফুড বিজনেস অপারেটর’দের (FBO) ৫ বছরের ডিজিটাল পরিদর্শন রেকর্ড রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
৪. মাইক্রোপ্লাস্টিক মোকাবিলা: প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ম
২০২৪ ও ২০২৫ সালের সংশোধিত নিয়মগুলি সরাসরি মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণকে লক্ষ্য করে তৈরি।
- মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংজ্ঞা: ২০২৪-এর নিয়মে প্রথমবারের মতো মাইক্রোপ্লাস্টিককে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
- EPR (Extended Producer Responsibility): উৎপাদক ও ব্র্যান্ড মালিকরা তাদের উৎপাদিত প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও রিসাইকেল করতে আইনত বাধ্য।
- ডিজিটাল ট্র্যাকিং (২০২৫): উৎপাদন থেকে বর্জ্য অপসারণ পর্যন্ত নজরদারি চালাতে প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ে QR কোড বা বারকোড বাধ্যতামূলক।
- SUP নিষিদ্ধকরণ: একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক (Single-use Plastic) নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে যাতে তা ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত না হয়।
ভবিষ্যতের পন্থা: একটি বহুমুখী কৌশল
এই “অদৃশ্য সংকট” মোকাবিলায় সমন্বিত নীতি সংস্কার, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং আচরণের পরিবর্তন প্রয়োজন, যা ভারতের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
- নিরাপত্তার মানদণ্ড আধুনিকীকরণ: মাইক্রোপ্লাস্টিক, প্লাস্টিকাইজার (যেমন- থ্যালেটস) এবং ভারী ধাতু পরীক্ষার জন্য FSSAI প্রোটোকল বাধ্যতামূলক করা এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখতে পাবলিক ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে রিয়েল-টাইম তথ্য প্রকাশ করা।
- পুরসভার জল সরবরাহ শক্তিশালী করা: ‘জল জীবন মিশন’-এর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে ট্যাপের জলের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনা। এক্ষেত্রে পরিকাঠামো উন্নয়ন, থার্ড-পার্টি অডিট এবং গুণমান প্রকাশের জন্য অ্যাপ ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হবে যাতে বোতলজাত জলের ওপর নির্ভরতা কমে।
- টেকসই বিকল্পের প্রসার: ভর্তুকি এবং সচেতনতা অভিযানের মাধ্যমে বাড়িতে ব্যবহারের উপযোগী ফিল্টার (যেমন- UF+UV সিস্টেম) এবং কাঁচ বা স্টেইনলেস স্টিলের পুনর্ব্যবহারযোগ্য পাত্রের ব্যবহার উৎসাহিত করা।
- বৃত্তাকার অর্থনীতি (Circular Economy) ত্বরান্বিত করা: প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ম, ২০২২-এর অধীনে Extended Producer Responsibility (EPR) কঠোরভাবে প্রয়োগ করা, যাতে ১০০% PET বোতল সংগ্রহ, বাছাই এবং উচ্চমানের রিসাইক্লিং নিশ্চিত করা যায়।
উপসংহার
ভারতে বোতলজাত জলের ওপর এই নির্ভরতা মূলত জনপরিষেবার ঘাটতির একটি জটিল লক্ষণ। যদিও এটি সাময়িকভাবে জলের চাহিদা মেটায়, কিন্তু এর প্রচ্ছন্ন খরচ—মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ থেকে শুরু করে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর হ্রাস—প্রমাণ করে যে বর্তমান মডেলটি টেকসই নয়। ভারতের জন্য টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৬ (বিশুদ্ধ জল ও স্যানিটেশন) অর্জন করতে হলে বাণিজ্যিক সুবিধার চেয়ে একটি স্বচ্ছ এবং বিজ্ঞানসম্মত নিয়ন্ত্রক কাঠামোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে, যা নাগরিক এবং পরিবেশ—উভয়েরই দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেবে।