আমেরিকা থেকে ভারতের প্রাচীন নিদর্শন ও প্রত্নসম্পদ প্রত্যর্পণ

Repatriation of Indian Antiquities from the U.S.

প্রেক্ষাপট

মার্কিন কর্তৃপক্ষ ভারতের হাতে ৬৫৭টি প্রাচীন নিদর্শন ফিরিয়ে দিয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ১৪ মিলিয়ন ডলার। সুভাষ কাপুর এবং ন্যান্সি উইনারের মতো কুখ্যাত আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে তদন্ত চালিয়ে এই অমূল্য সম্পদগুলো উদ্ধার করা হয়েছে।

ফিরিয়ে আনা প্রত্নসম্পদগুলোর মূল আকর্ষণ

১. লাল বেলেপাথরের বুদ্ধ মূর্তি

  • গুরুত্ব: এর বাজারমূল্য প্রায় ৭.৫ মিলিয়ন ডলার
  • মূর্তি শিল্প (আইকনোগ্রাফি): মূর্তিটি অভয় মুদ্রায় (সুরক্ষা বা নির্ভীকতার ভঙ্গি) প্রদর্শিত।
  • বর্তমান অবস্থা: এর পেছনের জ্যোতির্বলয় (halo) ভাঙা এবং হাঁটু থেকে পায়ের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত, যা লুণ্ঠিত বা চুরি হওয়া প্রত্নসম্পদের একটি সাধারণ লক্ষণ।
  • উৎস: এটি উত্তর ভারত থেকে উদ্ভূত বলে মনে করা হয় (লাল বেলেপাথরের ব্যবহারের কারণে সম্ভবত মথুরা ঘরানার)।
বুদ্ধের বিভিন্ন মুদ্রা (ভঙ্গি) ভূমিস্পর্শ মুদ্রা (পৃথিবীকে সাক্ষী রাখা): ডান হাত দিয়ে মাটিকে স্পর্শ করা হয় এবং হাতের তালু ভেতরের দিকে থাকে। এটি বুদ্ধের জ্ঞানলাভ এবং মার-এর (প্রলোভন) ওপর তাঁর বিজয়ের প্রতীক। ধ্যান মুদ্রা (মেডিটেশন): দুই হাত কোলের ওপর রাখা থাকে, বাম হাতের ওপর ডান হাত এবং দুই বৃদ্ধাঙ্গুলি একে অপরকে স্পর্শ করে। এটি একাগ্রতা এবং মানসিক শান্তির প্রতীক। অভয় মুদ্রা (নির্ভীকতা): ডান হাত কাঁধ পর্যন্ত তোলা এবং তালু সামনের দিকে থাকে। এটি সুরক্ষা, শান্তি এবং ভয় দূর করার প্রতীক। বরদা মুদ্রা (দান বা করুণা): ডান হাত নিচের দিকে প্রসারিত এবং তালু সামনের দিকে থাকে। এটি উদারতা এবং বর প্রদানের প্রতীক। বিতর্ক মুদ্রা (শিক্ষা বা আলোচনা): বৃদ্ধাঙ্গুলি এবং তর্জনী একত্রে একটি বৃত্ত তৈরি করে এবং অন্য আঙুলগুলো উপরের দিকে থাকে। এটি জ্ঞান বিতরণ এবং ধর্ম শিক্ষার প্রতীক। ধর্মচক্র মুদ্রা (চাকা ঘোরানো): দুই হাত বুকের কাছে থাকে এবং তর্জনী ও বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে বৃত্ত তৈরি করা হয়। এটি বুদ্ধের প্রথম ধর্মোপদেশের প্রতীক। অঞ্জলি মুদ্রা (অভিবাদন বা ভক্তি): দুই হাতের তালু বুকের কাছে জোড় করা থাকে। এটি শ্রদ্ধা এবং ভক্তির প্রতীক।  

২. ব্রোঞ্জ নির্মিত অবলোকিতেশ্বর

  • মূর্তি শিল্প: এটি একটি খোদাই করা দ্বি-পদ্ম ভিত্তি (double-lotus base) এবং সিংহের অলংকরণ যুক্ত সিংহাসনের ওপর উপবিষ্ট।
  • শিল্পী ও স্থান: মূর্তির খোদাই লিপি অনুযায়ী এর কারিগর হলেন শিরপুরের দ্রোণাদিত্য (ছত্তিশগড়ের বর্তমান রায়পুরের কাছে)।
  • ঐতিহাসিক সংযোগ: ১৯৩৯ সালে লক্ষ্মণ মন্দিরের কাছে আবিষ্কৃত একটি বিশাল ব্রোঞ্জ ভাণ্ডারের অংশ ছিল এই মূর্তিটি।
শিরপুর সম্পর্কে তথ্য: ছত্তিশগড়ের প্রাচীন শিরপুর (শ্রীপুর) মহানদী তীরে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান (৬ষ্ঠ-৮ম শতাব্দী)। এটি বৌদ্ধ, হিন্দু এবং জৈন স্থাপত্যের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং এটি পরিদর্শন করেছিলেন। এখানকার ৭ম শতাব্দীর ইটের তৈরি লক্ষ্মণ মন্দির বিশ্বখ্যাত।

৩. আইনি কাঠামো

I. ভারতের আইনি ব্যবস্থা
  • প্রাচীন নিদর্শন ও শিল্প সম্পদ আইন, ১৯৭২: এটি ভারতের প্রধান আইন। এর আওতায় সরকার বা অনুমোদিত সংস্থা ছাড়া অন্য কারো পক্ষে প্রাচীন নিদর্শন বিদেশে রপ্তানি করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
  • ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ (ASI): এটি ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা এবং বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ ফিরিয়ে আনার মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা।
II. আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা
  • ইউনেস্কো কনভেনশন ১৯৭০ (UNESCO Convention 1970): এটি সাংস্কৃতিক সম্পদের অবৈধ আমদানি, রপ্তানি এবং মালিকানা হস্তান্তর নিষিদ্ধ করে।
  • সাংস্কৃতিক সম্পত্তি চুক্তি (CPA): সম্প্রতি (জুলাই ২০২৪) ভারত ও আমেরিকা একটি চুক্তি সই করেছে যাতে চুরি হওয়া প্রত্নসম্পদ দ্রুত ফিরিয়ে আনা এবং পাচার রোধ করা সহজ হয়।
ভারতীয় প্রত্নসম্পদ প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত নিচের বিবৃতিগুলো বিবেচনা করুন:
১. ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ (ASI) হলো ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা ও তা ফিরিয়ে আনার মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা।
২. ১৯৭০ সালের ইউনেস্কো কনভেনশন সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সাংস্কৃতিক সম্পদের অবাধ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সহায়তা ও উৎসাহ দেয়।
নিচের কোনটি সঠিক?
ক) শুধুমাত্র ১ সঠিক
খ) শুধুমাত্র ২ সঠিক
গ) ১ এবং ২ উভয়ই সঠিক
ঘ) কোনোটিই সঠিক নয়
উত্তর: ক
ব্যাখ্যা:
• ১ নং বিবৃতিটি সঠিক: সংস্কৃতি মন্ত্রকের অধীনস্থ ASI ভারতের সাংস্কৃতিক সম্পদ রক্ষা এবং বিদেশ থেকে তা ফিরিয়ে আনার জন্য মূল কাজ করে। বিদেশ থেকে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারে এরা বিদেশ মন্ত্রক এবং সিবিআই (CBI)-এর সাথে সমন্বয় বজায় রাখে।
• ২ নং বিবৃতিটি ভুল: ১৯৭০ সালের ইউনেস্কো কনভেনশন অবাধ বাণিজ্যের জন্য নয়, বরং সাংস্কৃতিক সম্পদের অবৈধ চলাচল এবং পাচার রোধ করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।

Latest Articles