প্রেক্ষাপট
সম্প্রতি, প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া (PTI)-এর একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, ২০২৬-২৭ রবি বিপণন মরসুমে ভারতের গম সংগ্রহ ১৭% বৃদ্ধি পেয়ে ৩৫ মিলিয়ন টন (MT) ছাড়িয়ে গেছে। এটি সরকারের নির্ধারিত ৩৪.৫ মিলিয়ন টনের লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে এবং আগের বছরের ৩০ মিলিয়ন টন সংগ্রহের রেকর্ডকেও পেছনে ফেলেছে। এই বাম্পার সংগ্রহের মূল কারণ ছিল দেশের ১২০.৬৫ মিলিয়ন টনের শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ উৎপাদন—যা অসময়ের বৃষ্টি এবং শিলাবৃষ্টির কারণে কিছু স্থানীয় ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও বজায় ছিল। এর ফলে বাজারের মান্ডি বা পাইকারি দর ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের (MSP) নিচে নেমে আসে। রাজ্যভিত্তিক তথ্যে দেখা গেছে যে, পাঞ্জাব ১২.১ মিলিয়ন টন সংগ্রহ করে শীর্ষে রয়েছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রদেশে সংগ্রহ একলাফে ১০.৪ মিলিয়ন টনে পৌঁছেছে। এর ফলে ফুড কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া (FCI)-এর কাছে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পর্যাপ্ত মজুত গড়ে উঠেছে।
গম চাষের জন্য প্রয়োজনীয় আবহাওয়া ও জলবায়ু
গম ভারতের অন্যতম প্রধান খাদ্যশস্য এবং চালের পর এটি দেশের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্য হিসেবে গণ্য হয়। এটি মূলত একটি রবি শস্য, যার অর্থ হলো এটি শীতের শুরুতে বোনা হয় এবং বসন্তকালে কাটা হয়।
১. তাপমাত্রা এবং আবহাওয়ার পরিস্থিতি
- বীজ বপন বা শুরুর স্তর: গমের চারা বৃদ্ধির প্রাথমিক পর্যায়ে ঠান্ডা এবং আর্দ্র আবহাওয়ার প্রয়োজন হয়। এই সময়ে আদর্শ তাপমাত্রা ১০° সেলসিয়াস থেকে ১৫° সেলসিয়াসের মধ্যে হওয়া উচিত।
- পাকা এবং কাটার স্তর: গম পাকা এবং কাটার সময়ে গরম, রোদ ঝলমলে এবং শুষ্ক আবহাওয়ার প্রয়োজন হয়। এই সময়ে আদর্শ তাপমাত্রা ২১° সেলসিয়াস থেকে ২৬° সেলসিয়াসের মধ্যে থাকা দরকার।
- কুয়াশা এবং আবহাওয়ার ঝুঁকি: দানা পুষ্ট হওয়ার সময়ে হঠাৎ তাপমাত্রা বৃদ্ধি বা তাপ্রবাহ (হিটওয়েভ) গমের জীবনচক্রকে সংকুচিত করে দিতে পারে, যার ফলে দানা শুকিয়ে বা কুঁচকে যায়। অন্যদিকে, ফুল ফোটার সময়ে অতিরিক্ত কুয়াশা বা তুষারপাত ফলনের ক্ষতি করতে পারে।
২. বৃষ্টিপাত এবং সেচ ব্যবস্থা
- পানির প্রয়োজনীয়তা: গম চাষের জন্য বছরে মাঝারি ধরনের অর্থাৎ ৫০ সেমি থেকে ৭৫ সেমি বৃষ্টিপাতের প্রয়োজন হয়, যা ফসল বৃদ্ধির পুরো সময়ে সমানভাবে হওয়া উচিত।
- গুরুত্বপূর্ণ সেচ সময়: কম বৃষ্টিপাত হওয়া অঞ্চলেও গম সফলভাবে চাষ করা সম্ভব, যদি সময়মতো সেচ দেওয়া যায়—বিশেষ করে গমের শিকড় গজানোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যা ক্রাউন রুট ইনিশিয়েশন (CRI) স্তর নামে পরিচিত।
- শীতকালীন বৃষ্টি: ভারতের উত্তর-পশ্চিম সমভূমি অঞ্চলে পশ্চিমী ঝামেলার (Western Disturbances) কারণে যে হালকা শীতকালীন বৃষ্টি হয়, তা গমের চারা বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত উপকারী।
৩. মাটির ধরণ
- আদর্শ মাটি: জল নিষ্কাশনের ভালো ব্যবস্থাযুক্ত দোআঁশ, মেটেল-দোআঁশ বা পলি মাটি গম চাষের জন্য সবচেয়ে ভালো, কারণ এই মাটির জল ধরে রাখার ক্ষমতা বেশি থাকে।
- অনুপযুক্ত মাটি: ভারী কালো মাটি বা অতিরিক্ত বেলে মাটি, যা থেকে জল সহজে বের হতে পারে না, তা গমের শিকড় বৃদ্ধিতে বাধা দেয় এবং জমিতে জল জমিয়ে দেয়। এটি গমের স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি করে।
ভারতে উৎপাদন এবং ভৌগোলিক বণ্টন
বিশ্বে চীন-এর পরেই ভারত দ্বিতীয় বৃহত্তম গম উৎপাদনকারী দেশ এবং দেশের মোট খাদ্যশস্য উৎপাদনের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে এই গম।
প্রধান উৎপাদনকারী অঞ্চলসমূহ
- সিন্ধু-গাঙ্গেয় সমভূমি: ভারতের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম অংশ জুড়ে বিস্তৃত উর্বর পলি মাটির অঞ্চলটি দেশের প্রধান “গমের পাত্র” (Wheat Bowl) হিসেবে পরিচিত।
- শীর্ষস্থানীয় রাজ্যসমূহ: ব্যাপক সেচ ব্যবস্থার কারণে পাঞ্জাব উৎপাদনশীলতা এবং হেক্টর প্রতি ফলনে ক্রমাগত শীর্ষে রয়েছে। এর পরেই প্রধান উৎপাদনকারী রাজ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ এবং রাজস্থান।
- সংগ্রহের চিত্র: খাদ্য ও পাবলিক ডিস্ট্রিবিউশন বিভাগের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক গম সংগ্রহ অভিযানে কেন্দ্রীয় ভাণ্ডারে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে পাঞ্জাব এবং মধ্যপ্রদেশ। এর মধ্যে মধ্যপ্রদেশের সংগ্রহ একলাফে ১০.৪ মিলিয়ন টনে গিয়ে পৌঁছেছে।
সরকারি নিয়ন্ত্রণ, সংগ্রহ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা
দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং দেশীয় চাষিদের বাজারের চরম দামের ওঠানামা থেকে রক্ষা করতে সরকার গমের সরবরাহ শৃঙ্খলকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করে।
১. ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (MSP)
- দামের নিশ্চয়তা: কৃষি খরচ ও মূল্য কমিশন (CACP)-এর সুপারিশের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় সরকার রবি শস্য বোনার মরসুম শুরুর আগেই গমের জন্য ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (MSP) ঘোষণা করে।
- খরচের কাঠামো: সারা ভারতের গড় উৎপাদন খরচের (যা A2+FL খরচ সূত্র দ্বারা পরিমাপ করা হয়) ওপর যাতে কৃষকরা কমপক্ষে ৫০ শতাংশ লাভ পান, তা নিশ্চিত করার নীতি বজায় রেখেই CACP এই মূল্যের সুপারিশ করে।
২. সংগ্রহ এবং বাফার নিয়ম
- বাস্তবায়নকারী সংস্থা: ফুড কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া (FCI) এবং রাজ্যগুলির নির্ধারিত সরকারি সংস্থাগুলি নির্দিষ্ট ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে (MSP) উন্মুক্ত বাজার থেকে গম সংগ্রহ করে।
- খাদ্য নিরাপত্তার দায়িত্ব: সংগৃহীত গম কেন্দ্রীয় ভাণ্ডারে (Central Pool) রাখা হয় যাতে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা আইন (NFSA), প্রধানমন্ত্রী গরীব কল্যাণ অন্ন যোজনা (PMGKAY) এবং অন্যান্য জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলির চাহিদা পূরণ করা যায়।
- জরুরি মজুত বা বাফার স্টকের অবস্থা: জরুরি ঘাটতি মোকাবিলার জন্য সরকার প্রতি ত্রৈমাসিকে বাফার স্টকের নিয়ম মেনে চলে। জুলাই মাসের শুরুতে নির্ধারিত আইনি প্রয়োজনীয়তা ২৭৫.৮০ লক্ষ মেট্রিক টনের চেয়ে বর্তমান মজুত অনেক বেশি রয়েছে।
৩. বাণিজ্য এবং রপ্তানি কাঠামো
- নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থান: দেশের বাজারের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং খুচরা বাজারে মূল্যস্ফীতি (মুদ্রাস্ফীতি) রোধ করতে ভারত বৈদেশিক বাণিজ্য নীতির “নিষিদ্ধ” (Prohibited) ক্যাটাগরির অধীনে একটি কঠোর গম রপ্তানি নীতি বজায় রাখছে।
- বিশেষ ছাড়: বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখতে ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ ফরেন ট্রেড (DGFT) সময়ে সময়ে বিশেষ অনুমতি দেয়। যেমন—সরকার-টু-সরকার (G2G) চুক্তির অধীনে বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলিতে নির্দিষ্ট কোটায় গম রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হয়।
প্রশ্ন: ভারতে গম চাষ এবং সংগ্রহের বিষয়ে নিচের বিবৃতিগুলি বিবেচনা করুন:
বিবৃতি I: ভারতের উত্তর সমভূমিতে পশ্চিমী ঝামেলার (Western Disturbances) ফলে হওয়া হালকা শীতকালীন বৃষ্টি গম ফসলের বৃদ্ধিতে দারুণ সাহায্য করে।
বিবৃতি II: গমের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (MSP) জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা আইন (NFSA) দ্বারা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক এবং এটি কৃষি খরচ ও মূল্য কমিশন (CACP) দ্বারা ঘোষণা করা হয়।
উপরের বিবৃতিগুলির প্রেক্ষিতে নিচের কোনটি সঠিক?
(a) বিবৃতি I এবং বিবৃতি II উভয়ই সঠিক এবং বিবৃতি II হলো বিবৃতি I-এর সঠিক ব্যাখ্যা।
(b) বিবৃতি I and বিবৃতি II উভয়ই সঠিক কিন্তু বিবৃতি II হলো বিবৃতি I-এর সঠিক ব্যাখ্যা নয়।
(c) বিবৃতি I সঠিক কিন্তু বিবৃতি II ভুল।
(d) বিবৃতি I ভুল কিন্তু বিবৃতি II সঠিক।
সমাধান
সঠিক উত্তর: (c)
• বিবৃতি I সঠিক: পশ্চিমী ঝামেলা বা ওয়েস্টার্ন ডিস্টারবেন্স ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে তৈরি হয় এবং রবি মরসুমে উত্তর-পশ্চিম ভারতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শীতকালীন বৃষ্টিপাত নিয়ে আসে। এই বৃষ্টিপাত গমের চারা বৃদ্ধির সময়ে সঠিক আর্দ্রতা জোগায়, যা দানার গুণমান এবং মোট ফলন বাড়াতে দারুণ সাহায্য করে।
• বিবৃতি II ভুল: ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (MSP) হলো একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা যা কৃষি খরচ ও মূল্য কমিশন (CACP)-এর পরামর্শমূলক সুপারিশের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত ক্যাবিনেট কমিটি (CCEA) দ্বারা ঘোষিত হয়। এটি জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা আইন (NFSA) দ্বারা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়, এবং CACP এটি সরাসরি ঘোষণাও করে না; CACP শুধুমাত্র সুপারিশ করে এবং CCEA চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।