ত্রিশঙ্কু বিধানসভা

Hung Assembly

প্রেক্ষাপট

সম্প্রতি ২০২৬ সালের তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল “ত্রিশঙ্কু বিধানসভা” এবং এর ফলে রাজ্যপালের ভূমিকা নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তামিলনাড়ুতে প্রতিষ্ঠিত দ্রাবিড় দলগুলোর পাশাপাশি টিভিকে (TVK) একটি শক্তিশালী পক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হওয়ায় এমন একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যেখানে কোনো একক দল বা প্রাক-নির্বাচনী জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি।

১. সংজ্ঞা

ত্রিশঙ্কু বিধানসভা হলো বহুদলীয় ব্যবস্থায় নির্বাচনের পরের এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে কোনো একক রাজনৈতিক দল বা প্রাক-নির্বাচনী জোট আইনসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা (অর্থাৎ মোট আসনের ৫০%-এর বেশি) লাভ করতে ব্যর্থ হয়। যদিও “ত্রিশঙ্কু বিধানসভা” শব্দটি ভারতের সংবিধানে সরাসরি সংজ্ঞায়িত করা হয়নি, তবে এটি একটি কার্যকর রাজনৈতিক অবস্থা যা রাষ্ট্রের প্রধানের (রাজ্য স্তরে রাজ্যপাল এবং কেন্দ্রীয় স্তরে রাষ্ট্রপতি) বিবেচনামূলক ক্ষমতাকে (Discretionary Powers) সক্রিয় করে তোলে।

২. সাংবিধানিক বিধান

  • ধারা ১৬৪(১): এতে বলা হয়েছে যে, মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যপাল কর্তৃক নিযুক্ত হবেন। স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতার ক্ষেত্রে এটি একটি আনুষ্ঠানিক কাজ; কিন্তু ত্রিশঙ্কু বিধানসভার ক্ষেত্রে এটি রাজ্যপালের একটি বিবেচনামূলক কাজে পরিণত হয়।
  • ধারা ১৬৩: এটি রাজ্যপালকে বিবেচনামূলক ক্ষমতা প্রদান করে। রাষ্ট্রপতির তুলনায় রাজ্যপালের পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা (Situational Discretion) অনেক বেশি, কারণ সংবিধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে— “যদি না তাকে… তার কার্যাবলি বা তাদের যেকোনো একটি নিজের বিবেচনায় সম্পাদন করতে হয়।”

৩. পছন্দের ক্রম (সরকারিয়া কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী)

যখন কোনো দলের স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে না, তখন একটি স্থিতিশীল সরকার নিশ্চিত করতে রাজ্যপালের উচিত পছন্দের একটি নির্দিষ্ট ক্রম অনুসরণ করা:

I. প্রাক-নির্বাচনী জোট (Pre-poll Alliance): যে দলগুলো একসাথে নির্বাচন লড়েছে।

II. একক বৃহত্তম দল (Single Largest Party): যে দল সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে এবং অন্যদের (স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ) সমর্থন দাবি করছে।

III. নির্বাচন-পরবর্তী মহাজোট (Post-poll Coalition): ফলাফল ঘোষণার পর গঠিত নতুন জোট, যেখানে সব অংশীদার সরকারে যোগ দেয়।

IV. নির্বাচন-পরবর্তী জোট (Post-poll Alliance): যেখানে কিছু দল সরকারে যোগ দেয় এবং অন্যরা বাইরে থেকে সমর্থন দেয়।

৪. বিচার বিভাগীয় এবং কমিটির নির্দেশিকা

  • এস.আর. বোম্মাই বনাম ভারত সরকার (১৯৯৪): সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল যে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা পরীক্ষার একমাত্র জায়গা হলো “বিধানসভার ফ্লোর” বা কক্ষ; রাজ্যপালের ব্যক্তিগত মতামত নয়।
  • পুঞ্ছি কমিশন (২০০৭): সুপারিশ করেছিল যে, নির্বাচন-পরবর্তী জোটের ক্ষেত্রে রাজ্যপাল তখনই সেই জোটকে আমন্ত্রণ জানাবেন যদি তাদের একজন নির্দিষ্ট নেতা এবং একটি নূন্যতম সাধারণ কর্মসূচি (Common Minimum Program) থাকে।
  • রামেশ্বর প্রসাদ মামলা (২০০৬): আদালত জানায় যে, রাজ্যপাল যদি নিশ্চিত হন যে কোনো দলই স্থিতিশীল সরকার গঠন করতে পারবে না, তবে তিনি বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার সুপারিশ করতে পারেন, তবে এই সিদ্ধান্তটি বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার (Judicial Review) আওতাভুক্ত।

৫. ফ্লোর টেস্ট (Floor Test)

রাজ্যপাল সাধারণত নিযুক্ত মুখ্যমন্ত্রীকে আস্থা ভোটের (Vote of Confidence) মাধ্যমে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা (প্রায়ই ১৫ থেকে ৩০ দিন) দেন। যদি মুখ্যমন্ত্রী ব্যর্থ হন, রাজ্যপাল পরবর্তী যোগ্য নেতাকে আমন্ত্রণ জানাতে পারেন অথবা ধারা ৩৫৬-এর অধীনে সাংবিধানিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কারণে রাষ্ট্রপতি শাসনের সুপারিশ করতে পারেন।

Q. ভারতীয় সংসদীয় ব্যবস্থায় 'ত্রিশঙ্কু বিধানসভা'র প্রেক্ষিতে নিচের বিবৃতিগুলো বিবেচনা করুন:
1. 'ত্রিশঙ্কু বিধানসভা' শব্দটি ভারতের সংবিধানের ১৬৪ ধারায় স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
2. এস.আর. বোম্মাই মামলা অনুযায়ী, কোনো দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাজ্যপালের মূল্যায়নই চূড়ান্ত এবং তা আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যায় না।
3. সরকারিয়া কমিশন পরামর্শ দিয়েছে যে, সরকার গঠনের সময় একক বৃহত্তম দলের চেয়ে প্রাক-নির্বাচনী জোটকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
ওপরের বিবৃতিগুলোর মধ্যে কোনটি/কোনগুলো সঠিক?
(a) কেবল 1 এবং 2
(b) কেবল 3
(c) কেবল 1 এবং 3
(d) 1, 2 এবং 3
উত্তর: (খ)
• বিবৃতি 1 ভুল: "ত্রিশঙ্কু বিধানসভা" একটি রাজনৈতিক কনভেনশন বা প্রথা এবং এটি সংবিধানের কোথাও সংজ্ঞায়িত নয়।
• বিবৃতি 2 ভুল: এস.আর. বোম্মাই রায় প্রতিষ্ঠা করেছে যে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা অবশ্যই বিধানসভার ফ্লোরে প্রমাণ করতে হবে এবং রাজ্যপালের পদক্ষেপ (বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি শাসনের সুপারিশ) বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার অধীন।
• বিবৃতি 3 সঠিক: সরকার গঠনের জন্য কোনো নেতাকে আমন্ত্রণ জানানোর ক্ষেত্রে সরকারিয়া কমিশন স্পষ্টভাবে প্রাক-নির্বাচনী জোটকে রাজ্যপালের প্রথম পছন্দ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।