প্রসঙ্গ
- সম্প্রতি একটি বিক্ষোভ কর্মসূচি পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষে রূপ নেওয়ায় প্রতিবাদের সাংবিধানিক অধিকার, পুলিশের ক্ষমতার সীমা এবং ভারতে জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আইনি বিধান আবারও আলোচনায় এসেছে।
প্রতিবাদের অধিকার: সাংবিধানিক অবস্থান
- প্রতিবাদের অধিকার সংবিধানে পৃথকভাবে মৌলিক অধিকার হিসেবে উল্লেখ নেই। তবে এটি নিম্নলিখিত অনুচ্ছেদগুলির মাধ্যমে সুরক্ষিত—
- অনুচ্ছেদ ১৯(১)(a) – বাক্ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।
- অনুচ্ছেদ ১৯(১)(b) – শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হওয়ার অধিকার।
- অনুচ্ছেদ ১৯(১)(c) – সংঘ বা সমিতি গঠনের অধিকার।
- তবে এই অধিকারগুলি পরম (Absolute) নয় এবং নিম্নলিখিত অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যৌক্তিক বিধিনিষেধের অধীন—
- অনুচ্ছেদ ১৯(২) – বাক্ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর বিধিনিষেধ।
- অনুচ্ছেদ ১৯(৩) – শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারের উপর বিধিনিষেধ।
যৌক্তিক বিধিনিষেধের ভিত্তি
- অনুচ্ছেদ ১৯(২) ও ১৯(৩) অনুযায়ী, ভারতের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতা, আদালত অবমাননা, মানহানি এবং অপরাধে প্ররোচনা-র স্বার্থে রাষ্ট্র প্রতিবাদের অধিকারের উপর যৌক্তিক বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে।
কখন একটি বিক্ষোভ বেআইনি হয়ে উঠতে পারে?
ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS), ২০২৩ অনুযায়ী, কোনো বিক্ষোভ বেআইনি হতে পারে যদি তা—
- অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ বা সহিংসতায় জড়িত হয়।
- আইন প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি করে।
- বলপ্রয়োগ বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে কাউকে বাধ্য করে।
- জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করে বা জননিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে।
বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ক্ষমতা
পুলিশ নিম্নলিখিত উদ্দেশ্যে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে—
- জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা।
- সহিংসতা ও সরকারি/বেসরকারি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি প্রতিরোধ করা।
- জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
- যান চলাচল ও জরুরি পরিষেবা সচল রাখা।
BNSS, ২০২৩–এর অধীনে নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ
- ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (BNSS), ২০২৩-এর ধারা ১৬৩ অনুযায়ী, একজন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট জনউপদ্রব, মানবজীবনের ঝুঁকি, দাঙ্গা বা সংঘর্ষ প্রতিরোধের জন্য সাময়িকভাবে সমাবেশ, মিছিল বা বিক্ষোভে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারেন।
- এ ধরনের আদেশ প্রতিরোধমূলক (Preventive) এবং সাধারণত সীমিত সময়ের জন্য জারি করা হয়।
পুলিশের বলপ্রয়োগের সীমা
- পুলিশ কেবলমাত্র আইনসম্মততা (Legality), প্রয়োজনীয়তা (Necessity), সামঞ্জস্যতা (Proportionality) এবং সর্বনিম্ন বলপ্রয়োগের (Minimum Force) নীতি অনুসরণ করে প্রয়োজন হলে বলপ্রয়োগ করতে পারে।
- বলপ্রয়োগ ধাপে ধাপে, শান্তিপূর্ণ পদ্ধতি ব্যর্থ হওয়ার পর শেষ বিকল্প হিসেবে হতে হবে এবং তা বিচারিক পর্যালোচনার অধীন থাকবে।
গুরুত্বপূর্ণ সুপ্রিম কোর্টের রায়
Mazdoor Kisan Shakti Sangathan (MKSS) বনাম Union of India (2018)
- সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে, প্রতিবাদের অধিকার একটি সাংবিধানিক অধিকার, তবে তা অন্য নাগরিকদের অধিকারের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে প্রয়োগ করতে হবে।
Amit Sahni বনাম Commissioner of Police (Shaheen Bagh মামলা), 2020
- জনসাধারণের রাস্তা বা জনপরিসর অনির্দিষ্টকালের জন্য দখল করে রাখা যায় না।
- প্রতিবাদের অধিকার এমনভাবে প্রয়োগ করতে হবে যাতে সাধারণ মানুষের অযৌক্তিক ভোগান্তি না হয়।
প্রশ্ন: ভারতে প্রতিবাদের অধিকার সম্পর্কে নিম্নলিখিত বিবৃতিগুলি বিবেচনা করুন—
1. প্রতিবাদের অধিকার সংবিধানে পৃথকভাবে একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।
2. শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হওয়ার অধিকার অনুচ্ছেদ ১৯(১)(খ)-এর অধীনে নিশ্চিত করা হয়েছে।
3. জনশৃঙ্খলার স্বার্থে রাষ্ট্র জনসমাবেশের উপর যৌক্তিক বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে।
4. ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (BNSS), ২০২৩-এর ধারা ১৬৩ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষকে সমাবেশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা প্রদান করে।
উপরের কোন বিবৃতিগুলি সঠিক?
A. শুধুমাত্র ২, ৩ এবং ৪
B. শুধুমাত্র ১ এবং ২
C. শুধুমাত্র ১, ৩ এবং ৪
D. শুধুমাত্র ২ এবং ৪
উত্তর: A
• বিবৃতি ১: ভুল। সংবিধানে "প্রতিবাদের অধিকার" পৃথক মৌলিক অধিকার হিসেবে উল্লেখ নেই; এটি অনুচ্ছেদ ১৯ থেকে উদ্ভূত।
• বিবৃতি ২: সঠিক। অনুচ্ছেদ ১৯(১)(খ) শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করে।
• বিবৃতি ৩: সঠিক। অনুচ্ছেদ ১৯(৩) অনুযায়ী জনশৃঙ্খলাসহ অন্যান্য সাংবিধানিক কারণে যৌক্তিক বিধিনিষেধ আরোপ করা যায়।
• বিবৃতি ৪: সঠিক। BNSS, ২০২৩-এর ধারা ১৬৩ জনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে সমাবেশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা প্রদান করে।