প্রেক্ষাপট
সম্প্রতি, নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ রবিবার সংসদে জানিয়েছেন যে, নেপালও অনেক জায়গায় ভারতের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে। নেপালের কোনো সরকার প্রধানের পক্ষ থেকে এই প্রথমবার এমন কোনো স্বীকারোক্তি দেওয়া হলো। বিতর্কিত কালাপানি অঞ্চল নিয়ে একজন সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে তিনি এই মন্তব্য করেন, যা নেপালী কংগ্রেস এবং নেপালী কমিউনিস্ট পার্টির মতো বিরোধী দলগুলোর মধ্যে একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক শোরগোল ফেলে দিয়েছে। ভারত লিপুলেখ রুট দিয়ে কৈলাশ মানসসরোবর যাত্রা তীর্থভ্রমণ পুনরায় শুরু করার ঘোষণা দেওয়ার পর, লিপুলেখ, লিম্পিয়াধুরা এবং কালাপানি নিয়ে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধটি আবার সামনে চলে আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে নেপাল ভারত ও চীন উভয় দেশকেই কূটনৈতিক বার্তা (diplomatic notes) পাঠিয়েছে, যেখানে ভারত স্পষ্ট জানিয়েছে যে এই অঞ্চলগুলো উত্তরাখণ্ড-এর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সীমান্তের ঐতিহাসিক উৎপত্তি
- সুগৌলি চুক্তি (১৮১৬): ১৮১৪-১৮১৬ সালের ইঙ্গ-নেপাল যুদ্ধের পর নেপাল রাজ্য এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যে এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যা নেপালের আধুনিক আঞ্চলিক সীমানা নির্ধারণ করে।
- সীমান্তবর্তী নদী: এই চুক্তির মাধ্যমে কালী নদী (মহাকালী)-কে ভারতের সাথে নেপালের পশ্চিম সীমানা এবং মেচী নদী-কে পূর্ব সীমানা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
- মূল কারণ: চুক্তির মূল পাঠ্যে কোনো সুনির্দিষ্ট মানচিত্র অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি এবং কালী নদীর নিখুঁত ভৌগোলিক উৎসস্থলটি পরিষ্কার করা হয়নি। এর ফলে মানচিত্রের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি হয়।
প্রধান বিতর্কিত অঞ্চলসমূহ
১. উত্তর-পশ্চিম ত্রি-সীমান্ত সংযোগস্থল (The Northwestern Tri-Junction: কালাপানি, লিপুলেখ, লিম্পিয়াধুরা)
- লিম্পিয়াধুরা: নেপালের দাবি অনুযায়ী, কালী নদীর উৎপত্তি আরও উত্তর-পশ্চিমে লিম্পিয়াধুরায় হয়েছে। তাই এই জলধারার পূর্ব দিকের সমস্ত জমি তাদের নিজস্ব ভূখণ্ড।
- কালাপানি: ভারত মনে করে যে, এই নদীটি কালাপানির একটি ভিন্ন ঝর্ণা থেকে উৎপন্ন হয়েছে। ফলে এই ঝর্ণাগুলোর পূর্ব দিকের পর্বতশৃঙ্গ লাইন (ridge line) বরাবর সীমান্ত অবস্থিত।
- লিপুলেখ গিরিপথ: এই কৌশলগত উচ্চ-উচ্চতার গিরিপথটি ভারতের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং এটি তিব্বতের সাথে বাণিজ্য ও তীর্থযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। তবে নেপাল এটিকে তাদের অঞ্চলের অংশ বলে দাবি করে।
২. সুস্তা অঞ্চল
- অবস্থান: সুস্তা অঞ্চলটি বিহার ও নেপাল সীমান্তের মাঝে দক্ষিণ তেরাই সমভূমি এলাকায় অবস্থিত।
- বিরোধ: এই সীমানাটি মূলত গণ্ডক নদী (নারায়ণী)-এর গতিপথ অনুযায়ী নির্ধারিত হয়েছিল। কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে বন্যার কারণে নদীটি দক্ষিণ দিকে তার গতিপথ পরিবর্তন করে, যার ফলে জেগে ওঠা নতুন জমি নিয়ে উভয় দেশের মধ্যে পরস্পরবিরোধী দাবির সৃষ্টি হয়েছে।
ভারত ও নেপালের ভিন্ন অবস্থান
- নেপালের অবস্থান: কাঠমান্ডু কঠোরভাবে ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তির পাঠ্যকে ভিত্তি হিসেবে মানে। ২০২০ সালে নেপাল একটি সাংবিধানিক সংশোধনী পাস করে একটি নতুন রাজনৈতিক মানচিত্র গ্রহণ করে, যেখানে কালাপানি, লিপুলেখ এবং লিম্পিয়াধুরাকে তাদের সীমানার ভেতরে দেখানো হয়েছে।
- ভারতের অবস্থান: নয়া দিল্লি ১৮৬০ সালের পর তৈরি ব্রিটিশ প্রশাসনিক জরিপ মানচিত্রের ওপর নির্ভর করে, যেখানে কালাপানিকে ভারতীয় ভূখণ্ডের ভেতরে দেখানো হয়েছে। এই অঞ্চলে ভারতের ক্রমাগত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি রয়েছে এবং ভারত একতরফা মানচিত্র পরিবর্তনকে প্রত্যাখ্যান করে।
সমাধানের উপায়সমূহ
- যৌথ প্রযুক্তিগত স্তরের সীমান্ত কমিটি (JTB): এই সংস্থাটি সফলভাবে ১,৮৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের প্রায় ৯৭% মানচিত্র তৈরি ও একমত হতে পেরেছে, কেবল কালাপানি এবং সুস্তা অঞ্চলের সমাধান বাকি রয়েছে।
- স্থির সীমানা নীতি (Fixed Boundary Principle): গণ্ডক এবং মেচী নদীর গতিপথ পরিবর্তনের সমস্যা মোকাবেলার জন্য, উভয় দেশই ঐতিহাসিক জরিপের ওপর ভিত্তি করে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক (coordinates) অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণে সম্মত হয়েছে। এর ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হলেও সার্বভৌমত্বের অধিকার পরিবর্তন হবে না।
প্রশ্ন: ভারত ও নেপালের মধ্যকার সীমান্ত বিন্যাস সম্পর্কিত নিচের বিবৃতিগুলো বিবেচনা করুন:
• বিবৃতি I: ১৮১৬ সালে নেপাল রাজ্য এবং ব্রিটিশ ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত সুগৌলি চুক্তি কালী নদীকে নেপালের স্বাভাবিক পশ্চিম সীমানা হিসেবে নির্ধারণ করেছিল।
• বিবৃতি II: দক্ষিণ সমভূমির সুস্তা অঞ্চল নিয়ে সাম্প্রতিক আঞ্চলিক বিরোধের প্রধান কারণ হলো গত কয়েক দশক ধরে মেচী নদীর গতিপথ পরিবর্তন।
উপরের বিবৃতিগুলোর প্রেক্ষিতে নিচের কোনটি সঠিক?
(a) বিবৃতি I এবং বিবৃতি II উভয়ই সঠিক এবং বিবৃতি II হলো বিবৃতি I-এর সঠিক ব্যাখ্যা
(b) বিবৃতি I এবং বিবৃতি II উভয়ই সঠিক কিন্তু বিবৃতি II হলো বিবৃতি I-এর সঠিক ব্যাখ্যা নয়
(c) বিবৃতি I সঠিক কিন্তু বিবৃতি II ভুল
(d) বিবৃতি I ভুল কিন্তু বিবৃতি II সঠিক
সমাধান ও ব্যাখ্যা (Solution & Explanation)
সঠিক উত্তর: (c)
• বিবৃতি I সঠিক: ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে ইঙ্গ-নেপাল যুদ্ধের অবসান ঘটায় এবং কালী নদীকে নেপালের পশ্চিম আন্তর্জাতিক সীমানা হিসেবে নির্ধারণ করে, যা এটিকে ভারতের কুমাওন অঞ্চল থেকে পৃথক করেছে।
• বিবৃতি II ভুল: সুস্তা অঞ্চলের আঞ্চলিক বিরোধটি গণ্ডক নদী (যা নারায়ণী নদী নামেও পরিচিত)-এর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে হয়েছে, মেচী নদীর কারণে নয়। মেচী নদী নেপালের পূর্ব সীমান্তের একটি অংশ নির্ধারণ করে, যেখানে সুস্তা অঞ্চলটি বিহারের সংলগ্ন দক্ষিণে অবস্থিত।