প্রেক্ষাপট
কেন্দ্রীয় উপজাতি বিষয়ক মন্ত্রক ওড়িশা সরকারের ফরেস্ট রাইটস অ্যাক্ট (FRA) সেল বা বন অধিকার আইন সেলগুলি বন্ধ করার সিদ্ধান্তের বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে। ২০০৬ সালের ঐতিহাসিক বন অধিকার আইনের বাস্তবায়নকে ত্বরান্বিত করার জন্য রাজ্য ও কেন্দ্রীয় প্রকল্পের অধীনে এই সেলগুলি স্থাপন করা হয়েছিল। সম্প্রতি রাজ্য সরকার ৫০টি মহকুমা স্তরে সমস্ত FRA সেল বিলুপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছে এবং ২০২৬ সালের মার্চের শেষের মধ্যে সমস্ত বকেয়া দাবি নিষ্পত্তি করার আদেশ দিয়েছে।
১. বন অধিকার আইন ২০০৬–এর ঐতিহাসিক পটভূমি
- শতাব্দীকাল ধরে অরণ্যবাসী সম্প্রদায়রা বনের সাথে মিলেমিশে বসবাস করে আসছে এবং জীবনধারণ ও সংস্কৃতির জন্য বনের ওপর নির্ভর করে।
- ঔপনিবেশিক আইন যেমন ইন্ডিয়ান ফরেস্ট অ্যাক্ট ১৮৭৮ এবং ১৯২৭ বনের নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে তুলে দেয়, যা আদিবাসীদের অধিকার ও প্রথাকে সীমিত করে ফেলে।
- স্বাধীনতার পর, ১৯৫০ পরবর্তী বন নীতিগুলি বাণিজ্যিক বনায়নের পক্ষে থাকায় বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে আদিবাসীদের উচ্ছেদ এবং প্রতিবাদ শুরু হয়।
- এই ঐতিহাসিক অবিচার দূর করতে, ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে বন অধিকার আইন পাস করা হয় এবং ১ জানুয়ারি ২০০৮ থেকে এটি কার্যকর হয়।
২. বন অধিকার আইন (FRA), ২০০৬
- মূল উদ্দেশ্য: আদিবাসী (ST) এবং অন্যান্য প্রথাগত বনবাসীদের সেই বনভূমির ওপর অধিকার দেওয়া, যেখানে তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করছে এবং জীবিকা নির্বাহ করছে।
- নোডাল মন্ত্রক: কেন্দ্রীয় উপজাতি বিষয়ক মন্ত্রক।
- অধিকারের ধরণ: এই আইনটি নিম্নলিখিত অধিকারগুলিকে স্বীকৃতি দেয়:
- ব্যক্তিগত বন অধিকার (IFR): জীবিকার জন্য বনভূমি চাষের অধিকার (সর্বোচ্চ ৪ হেক্টর)। তবে এই আইনের অধীনে বনভূমির অধিকার হস্তান্তর বা বিক্রি করা যায় না।
- সামুদায়িক বন অধিকার (CFR): চারণভূমি, জলাশয়, গৌণ বনজ সম্পদ (MFP) এবং সামুদায়িক বন সম্পদের ওপর অধিকার।
- আবাসস্থল অধিকার (Habitat Rights): বিশেষ করে বিপন্ন আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর (PVTGs) জন্য বিশেষ অধিকার।
- পুনর্বাসন ও উন্নয়নের অধিকার: যথাযথ পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ থেকে সুরক্ষা।
- যোগ্যতা: যারা ১৩ ডিসেম্বর ২০০৫-এর আগে অন্তত তিন প্রজন্ম (৭৫ বছর) ধরে বনে বসবাস করছেন, তারাই এই অধিকার দাবি করতে পারেন।
- সংকটপূর্ণ বন্যপ্রাণী আবাসস্থল: জাতীয় উদ্যান এবং অভয়ারণ্যের সংকটপূর্ণ এলাকাগুলি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য সুরক্ষিত রাখা আবশ্যক।
- বিশেষ দ্রষ্টব্য: সংকটপূর্ণ বাঘ সংরক্ষণ এলাকা বা কোর এরিয়া (Critical Tiger Habitats) বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন (WLPA), ১৯৭২-এর অধীনে তৈরি করা হয়।
৩. বন অধিকার আইন ২০০৬–এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া
- গ্রামসভা: ব্যক্তিগত এবং সামুদায়িক বন অধিকারের ধরণ ও পরিধি চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া শুরু করার ক্ষমতা গ্রামসভার হাতে থাকে।
- মহকুমা স্তরের কমিটি (SDLC): গ্রামসভা কর্তৃক জমাকৃত প্রস্তাবগুলি পর্যালোচনা ও যাচাই করার জন্য রাজ্য সরকার এটি গঠন করে।
- জেলা স্তরের কমিটি (DLC): বন অধিকার মঞ্জুর করার ক্ষেত্রে এটিই চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করে।
৪. বন অধিকার আইন ২০০৬–এর সাংবিধানিক কাঠামো
- ধারা ৪৬: তফশিলি উপজাতি এবং দুর্বল শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার জন্য রাষ্ট্রকে নির্দেশ দেয়।
- ধারা ৪৮এ: বন, হ্রদ, নদী এবং বন্যপ্রাণীসহ প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা ও উন্নতির জন্য রাষ্ট্রকে সক্রিয় পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে।
- ধারা ৫১এ(জি): প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক কর্তব্য।
- ধারা ২৪৪: তফশিলি এলাকা এবং উপজাতি এলাকার প্রশাসনের ব্যবস্থা করে।
৫. ওড়িশায় বাস্তবায়নের বর্তমান পরিস্থিতি
- সাফল্যের র্যাঙ্ক: ছত্তিশগড়ের পর ওড়িশা ভারতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক বন অধিকারের শংসাপত্র (Title) প্রদান করেছে।
- বকেয়া হার: উচ্চ সাফল্য সত্ত্বেও, বকেয়া দাবির হারের দিক থেকে এই রাজ্যটি দেশে ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে।
৬. চ্যলেঞ্জ বা প্রতিকূলতা (জাজা/Xaxa কমিটির মতে):
- স্পষ্ট কারণ ছাড়াই খেয়ালখুশি মতো দাবি প্রত্যাখ্যান করা।
- দাবি নিষ্পত্তি করার জন্য কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকা।
- উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কারণে উচ্ছেদ হওয়া মানুষের বন অধিকার আজও অস্বীকৃত।
- জটিল আইনি প্রক্রিয়া এবং উপভোক্তাদের মধ্যে সচেতনতার অভাব।
৭. জড়িত প্রধান প্রকল্পসমূহ
- DA-JGUA (ধরতি আবা জনজাতীয় গ্রাম উৎকর্ষ অভিযান): ২০২৪ সালে শুরু হওয়া এই কেন্দ্রীয় প্রকল্পের লক্ষ্য হলো দেশের ৬৩,০০০-এর বেশি গ্রামের ৫ কোটিরও বেশি আদিবাসী মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং জীবিকার অভাব দূর করা।
- PM-JANMAN: আদিবাসী সম্প্রদায়কে মূলধারায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে উপজাতি বিষয়ক মন্ত্রক এবং রাজ্যগুলোর মাধ্যমে এটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
Q: বন অধিকার আইন (FRA), ২০০৬ সম্পর্কে নিচের বিবৃতিগুলো বিবেচনা করুন:
I. এই আইনটি বনবাসী তফশিলি উপজাতি (STs) এবং অন্যান্য প্রথাগত বনবাসীদের (OTFDs) অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়।
II. এটি চাষাবাদের জন্য প্রতি পরিবারকে সর্বোচ্চ ৪ হেক্টর পর্যন্ত ব্যক্তিগত বনভূমির অধিকার দেয়।
III. মহকুমা স্তরের কমিটির কাছে বন অধিকার নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু করার ক্ষমতা রয়েছে।
IV. এটি বাঁশকে 'গৌণ বনজ সম্পদ' (Minor Forest Produce) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
ওপরের বিবৃতিগুলোর মধ্যে কোনগুলো সঠিক?
(a) শুধুমাত্র I এবং II
(b) শুধুমাত্র I, II এবং IV
(c) শুধুমাত্র II, III এবং IV
(d) I, II, III এবং IV
উত্তর: (b) ব্যাখ্যা:
• বিবৃতি I সঠিক: এই আইনের লক্ষ্য হলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বনে বসবাসকারী আদিবাসী এবং অন্যান্য প্রথাগত বনবাসীদের অধিকার নিশ্চিত করা।
• বিবৃতি II সঠিক: ব্যক্তিগত বন অধিকারের ক্ষেত্রে পরিবার পিছু সর্বোচ্চ ৪ হেক্টর জমি চাষাবাদের জন্য দেওয়া হয়।
• বিবৃতি III ভুল: বন অধিকার নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু করার ক্ষমতা গ্রামসভার হাতে থাকে, মহকুমা স্তরের কমিটির হাতে নয়। কমিটিগুলো কেবল যাচাই ও অনুমোদনের কাজ করে।
• বিবৃতি IV সঠিক: এই আইন অনুযায়ী বাঁশ, ঝোপঝাড়, কঞ্চি, মধু, মোম, কেন্দু পাতা ইত্যাদি সমস্ত অপ্রধান বনজ সম্পদ 'গৌণ বনজ সম্পদ' বা MFP-র অন্তর্ভুক্ত।