ভারতের গ্রিন অ্যামোনিয়া পথের মাধ্যমে শক্তির পরিবর্তন

প্রেক্ষাপট : ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আয়োজিত উদ্বোধনী ইন্ডিয়া এনার্জি উইক (IEW)-এ ভারত সরকার জ্বালানি নিরাপত্তা থেকে জ্বালানি স্বাধীনতার দিকে এক বড় পরিবর্তনের ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে জ্বালানি ক্ষেত্রে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের সুযোগ বিশ্বের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।

এই কৌশলের মূল ভিত্তি হলো স্বচ্ছ জ্বালানি, যেখানে গ্রিন হাইড্রোজেন (Green Hydrogen) একটি প্রধান স্তম্ভ। সার (Fertilizers), পরিচ্ছন্ন শক্তি এবং সামুদ্রিক জ্বালানির মতো ক্ষেত্রগুলিকে কার্বনমুক্ত করার জন্য গ্রিন অ্যামোনিয়া (Green Ammonia) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

১. গ্রিন অ্যামোনিয়া সম্পর্কে

গ্রিন অ্যামোনিয়া বা নবায়নযোগ্য অ্যামোনিয়া (Renewable Ammonia) হলো এমন একটি জ্বালানি যা নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস ব্যবহার করে তৈরি করা হয়। এটি শিল্প এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব ও নির্গমন-মুক্ত (Emission-free) বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রথাগত ‘গ্রে’ (Grey) অ্যামোনিয়া তৈরির জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করা হয়, কিন্তু গ্রিন অ্যামোনিয়া থেকে শূন্য কার্বন (Zero Carbon) নির্গত হয়, যা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত টেকসই।

২. উৎপাদন ও প্রযুক্তি (Production and Technology)

প্রক্রিয়া:

  • জলের তড়িৎ বিশ্লেষণ (Water Electrolysis): প্রথমে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করে জলকে ভেঙে হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেনে পরিণত করা হয়, যার ফলে গ্রিন হাইড্রোজেন তৈরি হয়।
  • পরিচ্ছন্ন শক্তির উৎস: পুরো প্রক্রিয়াটিকে কার্বন-মুক্ত রাখতে সৌর বা বায়ু শক্তির মতো পরিষ্কার শক্তির উৎসের ওপর নির্ভর করা হয়।
  • হেবার-বোশ পদ্ধতি (Haber-Bosch Process): এরপর উচ্চ চাপ, তাপমাত্রা এবং অনুঘটকের উপস্থিতিতে এই হাইড্রোজেনকে বায়ুমণ্ডলীয় নাইট্রোজেনের সাথে মেশানো হয়।
  • এর ফলস্বরূপ সম্পূর্ণ গ্রিন হাইড্রোজেন এবং নাইট্রোজেন থেকে তৈরি হয় গ্রিন অ্যামোনিয়া

৩. গ্রিন অ্যামোনিয়ার মূল ব্যবহার ও গুরুত্ব (Main Uses/Importance)

  • হাইড্রোজেনের দক্ষ বাহক: গ্রিন অ্যামোনিয়া নাইট্রোজেন এবং গ্রিন হাইড্রোজেনের সংমিশ্রণে তৈরি হয়। হাইড্রোজেন গ্যাসের তুলনায় অ্যামোনিয়ার ভলিউমেট্রিক এনার্জি ডেনসিটি (একক আয়তনে শক্তির পরিমাণ) অনেক বেশি, যা বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহারের জন্য হাইড্রোজেন সঞ্চয় এবং পরিবহনের এক চমৎকার মাধ্যম করে তোলে।
  • বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি: এটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে পোড়ানো যেতে পারে, যা থেকে খুব কম ক্ষতিকারক গ্যাস নির্গত হয়।
  • সামুদ্রিক জ্বালানি: জাহাজ ও শিপিং শিল্পের জন্য এটি একটি উদীয়মান শূন্য-কার্বন জ্বালানি বিকল্প।
  • শিল্প কারখানার কার্বন হ্রাস: রাসায়নিক, ইস্পাত এবং অন্যান্য ভারি শিল্পে এটি কার্বন নির্গমন কমাতে সাহায্য করে।
  • সহজ সঞ্চয় ও পরিবহন: হাইড্রোজেন গ্যাস হ্যান্ডেল করা কঠিন কারণ এর জন্য অত্যন্ত উচ্চ চাপ বা অতি-শীতল তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। কিন্তু অ্যামোনিয়া তুলনামূলক কম চাপ এবং তাপমাত্রায় তরল অবস্থায় রাখা যায়, তাই বিদ্যমান পরিকাঠামো ব্যবহার করেই এটি সঞ্চয় ও পরিবহন করা অনেক সহজ।

৪. প্রকারভেদের তুলনা: ব্লু অ্যামোনিয়া বনাম গ্রিন অ্যামোনিয়া

বৈশিষ্ট্য (Feature)ব্লু অ্যামোনিয়া (Blue Ammonia)গ্রিন অ্যামোনিয়া (Green Ammonia)
হাইড্রোজেনের উৎসপ্রাকৃতিক গ্যাস (জীবাশ্ম জ্বালানি)জল (তড়িৎ বিশ্লেষণ)
শক্তির উৎসজীবাশ্ম জ্বালানি + কার্বন ক্যাপচার (CCS)নবায়নযোগ্য শক্তি (সৌর/বায়ু)
কার্বন স্থিতিস্বল্প-কার্বন (কার্বন ক্যাপচার করা হয়)শূন্য-কার্বন
খরচগ্রিন-এর তুলনায় খরচ কম; বিদ্যমান পরিকাঠামো ব্যবহার করা যায়বর্তমানে উৎপাদন খরচ বেশি

৫. ভারতের গ্রিন অ্যামোনিয়া নিলাম মডেল

বাস্তবায়নকারী সংস্থা: ন্যাশনাল গ্রিন হাইড্রোজেন মিশনের অধীনে সোলার এনার্জি কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া (SECI)

৬. চ্যালেঞ্জসমূহ

  • খরচ: বর্তমানে প্রথাগত অ্যামোনিয়ার চেয়ে গ্রিন অ্যামোনিয়া তৈরিতে খরচ বেশি, তবে প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে তা কমছে।
  • শক্তি-নিবিড় প্রক্রিয়া: তড়িৎ বিশ্লেষণ এবং হেবার-বোশ পদ্ধতিতে প্রচুর পরিমাণে শক্তির প্রয়োজন হয়।
  • পরিকাঠামোর অভাব: বড় আকারে সঞ্চয়, পরিবহন এবং হ্যান্ডলিং করার জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধার অভাব রয়েছে।
  • সুরক্ষা বিষয়ক উদ্বেগ: অ্যামোনিয়া বিষাক্ত, তাই এটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োজন।
Q. পরিচ্ছন্ন-জ্বালানি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গ্রিন অ্যামোনিয়া মূলত কোন কারণে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়? 

1. এটি হাইড্রোজেনের একটি দক্ষ বাহক হিসেবে কাজ করতে পারে।
2. এটি স্বল্প-কার্বন সামুদ্রিক জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
3. হাইড্রোজেন গ্যাসের তুলনায় এটি সঞ্চয় এবং পরিবহন করা সহজ।

বিকল্পসমূহ:

A) শুধুমাত্র
B) শুধুমাত্র 1 এবং 2
C) শুধুমাত্র 2 এবং 3
D) 1, 2 এবং 3

উত্তর: D) 1, 2 এবং 3

ব্যাখ্যা:
• 1 নম্বর বিবৃতিটি সঠিক: হাইড্রোজেনের দক্ষ বাহক: নাইট্রোজেনের সাথে গ্রিন হাইড্রোজেন মিশ্রিত করে গ্রিন অ্যামোনিয়া তৈরি করা হয় । হাইড্রোজেন গ্যাসের তুলনায় অ্যামোনিয়ার ভলিউমেট্রিক এনার্জি ডেনসিটি (একক আয়তনে শক্তির পরিমাণ) অনেক বেশি, যা বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহারের জন্য হাইড্রোজেন সঞ্চয় এবং মুক্ত করার একটি চমৎকার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে ।
• 2 নম্বর বিবৃতিটি সঠিক: স্বল্প-কার্বন সামুদ্রিক জ্বালানি: গ্রিন অ্যামোনিয়ার বহুমুখী ব্যবহারের মধ্যে সামুদ্রিক জ্বালানি (Marine Fuel) অন্যতম । যেহেতু এটি কার্বন-নিবিড় জীবাশ্ম জ্বালানি ছাড়াই উৎপাদিত হয়, তাই এটি বিশ্বব্যাপী জাহাজ শিল্পকে কার্বনমুক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার ।
• 3 নম্বর বিবৃতিটি সঠিক: সঞ্চয় এবং পরিবহনের সহজলভ্যতা: হাইড্রোজেন গ্যাস হ্যান্ডেল করা কঠিন কারণ এর জন্য অত্যন্ত উচ্চ চাপ বা অতি-শীতল (cryogenic) তাপমাত্রার প্রয়োজন হয় । কিন্তু অ্যামোনিয়াকে অনেক কম চাপ এবং স্বাভাবিকের কাছাকাছি তাপমাত্রায় তরল করা যায়, যার ফলে বিদ্যমান পরিকাঠামো ব্যবহার করেই এটি সঞ্চয় এবং পরিবহন করা অনেক সহজ । এই সুবিধাজনক বৈশিষ্ট্যের কারণেই বিশ্ববাজারে গ্রিন অ্যামোনিয়ার চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে ।

Practice Today’s MCQs