প্রেক্ষাপট
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে কারণ বিভিন্ন বিতর্ক এবং প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জের মাঝে বিরোধী দলগুলোর পদত্যাগের দাবি সত্ত্বেও মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে পদত্যাগ করতে অস্বীকার করেছেন। এই ঘটনাটি ধারা ১৬৪-এর অধীনে মুখ্যমন্ত্রীর কার্যকাল এবং রাজ্যপালের ভূমিকা নিয়ে একটি সাংবিধানিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, এই ধারায় বলা হয়েছে যে মন্ত্রীরা রাজ্যপালের “সন্তুষ্টির” (pleasure of the Governor) ওপর নির্ভর করে পদে বহাল থাকেন এবং বিধানসভার প্রতি যৌথ দায়বদ্ধতা (collective responsibility) বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
১. মন্ত্রীদের নিয়োগ (ধারা ১৬৪(১))
- মুখ্যমন্ত্রী: রাজ্যপাল মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়োগ করেন। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, রাজ্যপাল বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দলের নেতাকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানান।
- অন্যান্য মন্ত্রী: রাজ্যপাল শুধুমাত্র মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শের ভিত্তিতে অন্যান্য মন্ত্রীদের নিয়োগ করেন।
- রাজ্যপালের সন্তুষ্টি: মন্ত্রীরা রাজ্যপালের “সন্তুষ্টির” ওপর ভিত্তি করে পদে বহাল থাকেন। তবে, এই “সন্তুষ্টি” খেয়ালখুশিমতো নয়; যতক্ষণ পর্যন্ত মন্ত্রীপরিষদ (CoM) বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখে, ততক্ষণ রাজ্যপাল কোনো মন্ত্রীকে বরখাস্ত করতে পারেন না।
- উপজাতি কল্যাণের জন্য বিশেষ বিধান: ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, মধ্যপ্রদেশ এবং ওড়িশা রাজ্যে উপজাতি কল্যাণের দায়িত্বে একজন মন্ত্রী থাকতে হবে। (দ্রষ্টব্য: ২০০৬ সালের ৯৪তম সংশোধনী আইনের মাধ্যমে বিহারকে এই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল)।
২. মন্ত্রীপরিষদের সদস্য সংখ্যা
- সর্বোচ্চ সীমা: কোনো রাজ্যের মন্ত্রীপরিষদে মুখ্যমন্ত্রীসহ মোট মন্ত্রীর সংখ্যা ওই রাজ্যের বিধানসভার মোট আসন সংখ্যার ১৫%-এর বেশি হবে না।
- সর্বনিম্ন সীমা: মুখ্যমন্ত্রীসহ মন্ত্রীর সংখ্যা ১২ জনের কম হওয়া উচিত নয়।
- উৎপত্তি: রাজনৈতিক তোষণ করার জন্য “জাম্বো ক্যাবিনেট” বা বিশাল মন্ত্রীসভা তৈরির প্রথা বন্ধ করতে ২০০৩ সালের ৯১তম সংবিধান সংশোধনী আইনের মাধ্যমে এই সীমাগুলো যুক্ত করা হয়েছিল।
৩. অযোগ্যতা এবং কার্যকাল
- দলত্যাগ বিরোধী আইন: রাজ্য আইনসভার কোনো সদস্য যদি দশম তফসিলের (দলত্যাগ বিরোধী আইন) অধীনে অযোগ্য বলে বিবেচিত হন, তবে তিনি মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রেও অযোগ্য হবেন।
- আইনসভার সদস্য না হয়েও মন্ত্রী হওয়া (ধারা ১৬৪(৪)): রাজ্য আইনসভার সদস্য নন এমন ব্যক্তিকেও মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করা যেতে পারে। তবে, তাকে নিয়োগের পর টানা ছয় মাসের মধ্যে আইনসভার সদস্য (নির্বাচন বা মনোনয়নের মাধ্যমে) হতে হবে। এটি করতে ব্যর্থ হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার মন্ত্রিত্ব চলে যাবে।
৪. দায়বদ্ধতা এবং শপথ
- যৌথ দায়বদ্ধতা (ধারা ১৬৪(২)): মন্ত্রীপরিষদ সম্মিলিতভাবে রাজ্যের বিধানসভার কাছে দায়ী থাকে। এর অর্থ হলো ক্যাবিনেট “একসাথে ভাসবে বা একসাথে ডুববে।” যদি অনাস্থা প্রস্তাব পাস হয়, তবে পুরো মন্ত্রীপরিষদকে পদত্যাগ করতে হবে।
- শপথ (ধারা ১৬৪(৩)): দায়িত্ব গ্রহণের আগে, রাজ্যপাল তৃতীয় তফসিলে বর্ণিত নিয়ম অনুযায়ী মন্ত্রীদের পদ ও গোপনীয়তার শপথ বাক্য পাঠ করান।
- বেতন (ধারা ১৬৪(৫)): মন্ত্রীদের বেতন ও ভাতাসমূহ রাজ্য আইনসভা দ্বারা নির্ধারিত হয়।
Q: ভারতের সংবিধানের ধারা ১৬৪-এর প্রেক্ষিতে নিচের বিবৃতিগুলো বিবেচনা করুন:
বিবৃতি I: রাজ্যপালের কাছে যে কোনো সময় একজন মুখ্যমন্ত্রীকে বরখাস্ত করার সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে, কারণ মন্ত্রীরা রাজ্যপালের সন্তুষ্টির ওপর ভিত্তি করে পদে বহাল থাকেন।
বিবৃতি II: মন্ত্রীপরিষদ সম্মিলিতভাবে রাজ্যের বিধানসভার কাছে দায়ী।
উপরের বিবৃতিগুলোর প্রেক্ষিতে নিচের কোনটি সঠিক?
a) বিবৃতি I এবং বিবৃতি II উভয়ই সঠিক এবং বিবৃতি II হলো বিবৃতি I-এর সঠিক ব্যাখ্যা।
b) বিবৃতি I এবং বিবৃতি II উভয়ই সঠিক কিন্তু বিবৃতি II হলো বিবৃতি I-এর সঠিক ব্যাখ্যা নয়।
c) বিবৃতি I সঠিক কিন্তু বিবৃতি II ভুল।
d) বিবৃতি I ভুল কিন্তু বিবৃতি II সঠিক।
সমাধান: (d)
বিবৃতি I ভুল: যদিও "সন্তুষ্টির" নীতিটি বিদ্যমান, এটি নিরঙ্কুশ নয়। রাজ্যপাল এমন একজন মুখ্যমন্ত্রীকে বরখাস্ত করতে পারেন না যার বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। রাজ্যপালের "সন্তুষ্টি" হাউসে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থনের সাথে যুক্ত।
বিবৃতি II সঠিক: ধারা ১৬৪(২) স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে মন্ত্রীপরিষদ সম্মিলিতভাবে রাজ্যের বিধানসভার কাছে দায়বদ্ধ থাকবে। এটি ক্যাবিনেট ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতার মূল প্রক্রিয়া।