প্রেক্ষাপট
সাম্প্রতিক সময়ে মহাকাশের সামরিকীকরণ নিয়ে আলোচনা বেশ জোরালো হয়েছে। এর প্রধান কারণ হলো সামরিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট বা উপগ্রহের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতা। বর্তমানের আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোতে এই বিষয়টি একটি “আইনি সীমাবদ্ধতা” তৈরি করেছে। বর্তমানের কক্ষপথীয় সংঘাতগুলো এখন আর কেবল সরাসরি ধ্বংসলীলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি সিগন্যাল হারিয়ে ফেলা বা ভুল পথে চালিত করার মতো অদৃশ্য সাইবার-হস্তক্ষেপের দিকে মোড় নিচ্ছে, যা সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে দেখা যাচ্ছে।
১. মহাকাশে দ্বৈত–ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি
সংজ্ঞা: দ্বৈত–ব্যবহারযোগ্য (Dual-use) স্যাটেলাইট হলো সেইসব উপগ্রহ যা একই সাথে বেসামরিক এবং সামরিক উভয় ক্ষেত্রকেই পরিষেবা প্রদান করে।
উদাহরণ: বেসামরিক নেভিগেশনের জন্য ব্যবহৃত GPS নেটওয়ার্ক যেমন সাধারণ মানুষকে পথ দেখায়, তেমনি এটি নিখুঁতভাবে মিসাইল হামলার স্থানাঙ্কও প্রদান করে। আবার Starlink-এর মতো ব্রডব্যান্ড পরিষেবাগুলো দুর্গম এলাকায় ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও সহায়তা করে।
কৌশলগত অস্পষ্টতা: যেহেতু এই সম্পদগুলো একই সাথে স্কুল-হাসপাতাল এবং সামরিক আক্রমণ—উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়, তাই আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অধীনে “পার্থক্যকরণের নীতি” (Principle of Distinction) প্রয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
২. কক্ষপথে সাইবার–যুদ্ধের কৌশল
- জ্যামিং (Jamming): রেডিও সিগন্যাল আটকে দেওয়া বা এতে বাধা সৃষ্টি করার প্রক্রিয়া, যার ফলে স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশনের সাথে যোগাযোগ করতে পারে না।
- স্পুফিং (Spoofing): স্যাটেলাইট বা এর ব্যবহারকারীদের কাছে ভুল তথ্য পাঠানো। যেমন— GPS সিগন্যাল পরিবর্তন করে কোনো জাহাজ বা বিমানকে ভুল পথে চালিত করা।
- গ্রাউন্ড স্টেশন হ্যাকিং: স্যাটেলাইট পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত ভূপৃষ্ঠের পরিকাঠামো বা কন্ট্রোল রুমের নিয়ন্ত্রণ অবৈধভাবে দখল করা।
৩. আইনি কাঠামো এবং চ্যালেঞ্জ
- আউটার স্পেস ট্রিটি বা মহাকাশ চুক্তি (১৯৬৭): এটি আন্তর্জাতিক মহাকাশ আইনের মূল ভিত্তি, যা নির্দেশ দেয় যে মহাকাশকে কেবল শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে হবে।
- পার্থক্যকরণের নীতি: যুদ্ধের সময় বিবদমান পক্ষগুলোকে বেসামরিক বস্তু এবং সামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে পার্থক্য করতে হয়। দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য স্যাটেলাইটের ক্ষেত্রে এই নিয়মটি প্রয়োগ করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।
- রাষ্ট্রসংঘের সনদের অনুচ্ছেদ ২(৪): এটি “শক্তির ব্যবহার“ নিষিদ্ধ করে। তবে, কোনো ভৌত ধ্বংস ছাড়াই সাইবার আক্রমণের মাধ্যমে একটি স্যাটেলাইট অকেজো করে দেওয়া এই অনুচ্ছেদের লক্ষ্য কি না, তা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে।
- শনাক্তকরণের ঘাটতি (Attribution Gap): ডিজিটাল মাধ্যমে প্রক্সি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে হামলা চালানো হয় বলে অপরাধীকে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে, যা প্রচলিত বিচার প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে।
৪. ভারতের অবস্থান ও উদ্যোগ
- CERT-In/SIA-India নির্দেশিকা: ভারত মহাকাশ ব্যবস্থার জন্য একটি “সিকিউর–বাই–ডিজাইন“ নীতি গ্রহণ করেছে, যাতে একটি স্যাটেলাইটের তৈরির শুরু থেকেই সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
- সক্ষমতা বৃদ্ধি: ভারত কক্ষপথে তার উপস্থিতি বাড়াচ্ছে যাতে রিয়েল-টাইমে সাইবার আক্রমণ শনাক্ত করা, উৎস খুঁজে বের করা এবং তার মোকাবিলা করা সম্ভব হয়।
Q '১৯৬৭ সালের মহাকাশ চুক্তি' এবং আধুনিক মহাকাশ নিরাপত্তার প্রসঙ্গে নিচের বিবৃতিগুলো বিবেচনা করুন:
1. এই চুক্তিটি পৃথিবীর কক্ষপথে প্রথাগত মিসাইলসহ সব ধরণের অস্ত্র রাখা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করে।
2. আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অধীনে 'পার্থক্যকরণের নীতি' অনুযায়ী স্যাটেলাইটকে হয় কেবল বেসামরিক অথবা কেবল সামরিক কাজে ব্যবহার করতে হবে; অর্থাৎ দ্বৈত-ব্যবহার নিষিদ্ধ।
3. 'শনাক্তকরণের ঘাটতি' বা 'Attribution Gap' বলতে একটি স্যাটেলাইটের বিরুদ্ধে সাইবার-হস্তক্ষেপের ঘটনায় অপরাধীকে আইনত শনাক্ত করার অসুবিধা বোঝায়।
উপরের বিবৃতিগুলোর মধ্যে কয়টি সঠিক?
A) মাত্র একটি
B) মাত্র দুটি
C) তিনটিই
D) কোনটিই নয়
উত্তর: A) মাত্র একটি
সমাধান:
• বিবৃতি ১ ভুল: যদিও এই চুক্তিটি কক্ষপথে গণবিধ্বংসী অস্ত্র (WMDs) রাখা এবং চাঁদ বা অন্য গ্রহে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন নিষিদ্ধ করে, তবে এটি পৃথিবীর কক্ষপথে সমস্ত ধরণের প্রথাগত অস্ত্র রাখা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করে না।
• বিবৃতি ২ ভুল: পার্থক্যকরণের নীতি যুদ্ধের সময় বেসামরিক এবং সামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে তফাৎ করতে বলে, কিন্তু এটি দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি তৈরি বা ব্যবহার নিষিদ্ধ করে না।
• বিবৃতি ৩ সঠিক: শনাক্তকরণের ঘাটতি একটি বড় প্রযুক্তিগত এবং আইনি চ্যালেঞ্জ, যেখানে সাইবার আক্রমণের অদৃশ্য প্রকৃতির কারণে কে আক্রমণ করেছে তা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।