প্রেক্ষাপট
বিশ্ব যখন কার্বন নিঃসরণ কমানোর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন নবায়নযোগ্য শক্তি প্রযুক্তির চাহিদা—যেমন বায়ুকল (Wind turbines), সৌর প্যানেল এবং ইলেকট্রিক ব্যাটারি—ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে, এই “সবুজ” সমাধানগুলো লিথিয়াম, কোবাল্ট এবং বিরল মৃত্তিকা উপাদানের (Rare-earth elements) মতো সসীম ও অনবায়নযোগ্য সম্পদের উত্তোলনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এটি একটি বিশ্বব্যাপী বিতর্কের জন্ম দিয়েছে যে, খনন বা খনির কাজ (যা মূলত একটি নিষ্কাশন প্রক্রিয়া) কি আদৌ কখনও সত্যিকারের “টেকসই” বা “সাসটেইনেবল” হতে পারে।
১. টেকসই খনন: একটি অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত স্ববিরোধিতা?
I. সহজাত দ্বন্দ্ব
সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান অনুযায়ী খনন কাজ মূলত একটি অ–টেকসই প্রক্রিয়া, কারণ এটি এমন সসীম সম্পদ উত্তোলন করে যা আর পুনরুৎপাদন করা যায় না। এর পরিবেশগত প্রভাব অত্যন্ত গভীর, যার ফলে সাধারণত ঘটে:
- দূষণ: সম্পদ উত্তোলনের সময় বায়ু, জল এবং মাটির দূষণ ঘটে।
- ভূ–প্রকৃতির পরিবর্তন: পৃথিবীর উপরিভাগের স্থায়ী পরিবর্তন হয়।
- জীববৈচিত্র্য ধ্বংস: আদিম বাস্তুসংস্থান এবং রেইনফরেস্টের এমন ক্ষতি হয় যা কোনো প্রযুক্তি দিয়েই পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
II. “দুর্বল স্থায়িত্বের” (Weak Sustainability) ধারণা
খনিজ সম্পদের প্রয়োজনীয়তার সাথে পরিবেশগত লক্ষ্যের সমন্বয় করতে রাষ্ট্রসংঘ (UN) এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) ‘দুর্বল স্থায়িত্ব‘ বা ‘উইক সাসটেইনেবলিটি’-র ধারণাটি সামনে এনেছে।
- মূল যুক্তি: খনন কাজকে তখন ‘টেকসই’ বলা যেতে পারে যদি উত্তোলিত সম্পদ থেকে তৈরি হওয়া মূল্য (যেমন—শিক্ষা ও পরিকাঠামোর মাধ্যমে তৈরি হওয়া মানব পুঁজি) খনির আয়ুষ্কালের চেয়ে বেশি সময় স্থায়ী হয়।
- অনিবার্যতা: বিশেষজ্ঞরা যুক্তি দেন যে, যেহেতু সবুজ প্রযুক্তির জন্য এই খনিজগুলো অপরিহার্য, তাই কার্বন নিঃসরণ কমানোর ভবিষ্যতের জন্য খনন কাজ একটি অনিবার্য প্রয়োজন।
III. “দায়িত্বশীল খনন” (Responsible Mining) পরিকাঠামো
খনন শিল্পের তাৎক্ষণিক প্রভাব কমাতে শিল্পক্ষেত্রগুলো এখন ক্রমশ “দায়িত্বশীল খনন“ পদ্ধতি গ্রহণ করছে। এর মূল স্তম্ভগুলো হলো:
- সবুজ শক্তির ব্যবহার: খনির যন্ত্রপাতি ও ট্রাক চালাতে গ্রিন হাইড্রোজেন, সৌর বা বায়ু শক্তি ব্যবহার করা।
- জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ: কাজ শুরু করার আগে স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে স্পষ্ট অনুমতি নেওয়া।
- লভ্যাংশ ভাগ করা: খনি থেকে আয়ের একটি অংশ সরাসরি স্থানীয় বাসিন্দাদের কল্যাণে ব্যয় করা।
IV. পুনঃচক্রায়নের বাধা (The Recycling Bottleneck)
একটি বৃত্তাকার খনিজ অর্থনীতি (Circular mineral economy) গড়ে তোলার পথে প্রধান বাধা হলো বর্তমান পুনঃচক্রায়ন (Recycling) হার।
- বর্তমান হার: অনেক সংকটপূর্ণ খনিজের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী পুনঃচক্রায়নের হার বর্তমানে বড় জোর মাত্র ৫%।
- ভবিষ্যতের লক্ষ্য: নতুন করে খনন কাজের ওপর নির্ভরতা কমাতে, খনিজ সম্পদগুলো একবার আহরণ ও ব্যবহারের পর সেগুলোকে অনির্দিষ্টকাল ধরে পুনঃচক্রায়ন করতে হবে।
২. দেশ অনুযায়ী প্রধান খনিজ উৎপাদন
| খনিজ সম্পদ | শীর্ষ উৎপাদক | অন্যান্য প্রধান উৎপাদক |
| আকরিক লোহা | অস্ট্রেলিয়া | ব্রাজিল, চীন, ভারত |
| সোনা | চীন | অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, কানাডা |
| অ্যালুমিনিয়াম | চীন | ভারত, রাশিয়া, কানাডা |
| রুপো | মেক্সিকো | চীন, পেরু, চিলি |
| নিকেল | ইন্দোনেশিয়া | ফিলিপাইন, রাশিয়া, নিউ ক্যালেডোনিয়া |
| কয়লা | চীন | ভারত, ইন্দোনেশিয়া, আমেরিকা |
৩. খনিজ অনুযায়ী ভারতের শীর্ষস্থানীয় রাজ্যসমূহ
| খনিজ সম্পদ | শীর্ষ রাজ্য | উল্লেখযোগ্য অঞ্চল/খনি |
| আকরিক লোহা | ওড়িশা | ময়ূরভঞ্জ, কেউনঝড় (জোড়া-বারবিল অঞ্চল) |
| কয়লা | ছত্তিশগড় / ওড়িশা | কোরবা (ছত্তিশগড়), তালচের (ওড়িশা), ঝরিয়া (ঝাড়খণ্ড) |
| বক্সাইট (অ্যালুমিনিয়াম) | ওড়িশা | কালাহান্ডি, কোরাপুট (পঞ্চপতমালি) |
| ম্যাঙ্গানিজ | মধ্যপ্রদেশ | বালাঘাট (ভারভেলি খনি) |
| তামা | মধ্যপ্রদেশ | মালাসখণ্ড (বৃহত্তম ওপেন-কাস্ট তামার খনি) |
| ক্রোমাইট | ওড়িশা | সুকিন্দা উপত্যকা (ভারতের প্রায় ৯৫% সরবরাহ করে) |
| চুনাপাথর | রাজস্থান | চিতোরগড়, যোধপুর |
| সোনা | কর্ণাটক | কোলার গোল্ড ফিল্ডস (KGF), হুট্টি খনি |
সংকটপূর্ণ খনিজ সম্পদের (Critical minerals) পরিপ্রেক্ষিতে নীচের বিবৃতিগুলি বিবেচনা করুন:
1. এগুলি নবায়নযোগ্য সম্পদ যা স্বাভাবিকভাবেই পুনরায় পূরণ করা যায়।
2. ইলেকট্রিক ব্যাটারি এবং সৌর প্যানেলের মতো প্রযুক্তির জন্য এগুলি অপরিহার্য।
3. এগুলি উত্তোলনের কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবেশগত প্রভাব নেই।
ওপরের বিবৃতিগুলির মধ্যে কোনটি সঠিক?
(a) কেবল 2
(b) 1 এবং 2
(c) 2 এবং 3
(d) 1, 2 এবং 3
উত্তর: (a)
ব্যাখ্যা:
• 1 নং বিবৃতি ভুল: লিথিয়াম, কোবাল্ট এবং তামার মতো সংকটপূর্ণ খনিজগুলো সসীম ও অনবায়নযোগ্য সম্পদ। একবার মাটি থেকে তুলে নিলে এগুলি আর জন্মায় না। নতুন খনন ছাড়া সরবরাহ বজায় রাখতে এগুলিকে অনির্দিষ্টকাল পুনঃচক্রায়ন করতে হবে।
• 2 নং বিবৃতি সঠিক: কার্বন নিঃসরণ কমানোর ভবিষ্যৎ এই খনিজগুলোর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বায়ুকল, সৌর প্যানেল এবং ব্যাটারির কার্যকারিতার জন্য লিথিয়াম, কোবাল্ট এবং বিরল মৃত্তিকা উপাদানের মতো নির্দিষ্ট উপাদান প্রয়োজন।
• 3 নং বিবৃতি ভুল: সংকটপূর্ণ খনিজ উত্তোলনের পরিবেশগত প্রভাব অনেক। এই প্রক্রিয়া পরিবেশকে দূষিত করে, জীববৈচিত্র্য নষ্ট করে এবং ভূ-প্রকৃতির স্থায়ী ক্ষতি করে। রেইনফরেস্টের মতো আদি বাস্তুসংস্থান ধ্বংস হলে তা আর আগের অবস্থায় ফেরানো যায় না।