প্রেক্ষাপট:
সম্প্রতি ওড়িশা হাইকোর্ট পুরীর শ্রী জগন্নাথ মন্দিরের ভিতর রত্নভাণ্ডারে (অভ্যন্তরীণ কক্ষ) সঞ্চিত মূল্যবান সামগ্রীর তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছে। ১৯৭৮ সালের পর (দীর্ঘ ৪৮ বছর পর) এটিই প্রথম এই ধরনের উদ্যোগ। স্বর্ণকার, আরবিআই (RBI) প্রতিনিধি এবং মন্দিরের পুরোহিতদের একটি দল থ্রি–ডি ম্যাপিং (3D mapping) এবং রঙ-ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতি ব্যবহার করে এই প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করছেন।
১. ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যিক প্রেক্ষাপট
- নির্মাণকাল: শ্রী জগন্নাথ মন্দির দ্বাদশ শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছিল।
- রাজবংশীয় সংযোগ: এটি পূর্ব গঙ্গা রাজবংশের রাজা অনন্তবর্মণ চোড়গঙ্গ দেব কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল।
- স্থাপত্য শৈলী: এটি কলিঙ্গ স্থাপত্যের একটি ধ্রুপদী উদাহরণ, যা মূলত রেখা দেউল (Rekha Deul) বা বক্ররেখাকার শিখর বিশিষ্ট গর্ভগৃহ শৈলীতে নির্মিত।
- দেবদেবী: মন্দিরটি ভগবান জগন্নাথ, ভগবান বলভদ্র এবং দেবী সুভদ্রার উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত। প্রথাগত পাথরের মূর্তির পরিবর্তে এগুলি কাষ্ঠনির্মিত এবং নবকলেবর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় অন্তর আচার মেনে প্রতিস্থাপন করা হয়।
- চার ধাম: এটি হিন্দুধর্মের চারটি পবিত্রতম তীর্থস্থানের (চার ধাম) মধ্যে অন্যতম।
- সংশ্লিষ্ট ভক্তি সন্ত: চৈতন্য মহাপ্রভু, রামানুজাচার্য, মধ্বাচার্য, নিম্বার্কাচার্য, বল্লভাচার্য এবং রামানন্দের মতো অনেক মহান বৈষ্ণব সন্ত এই মন্দিরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন।
২. রত্নভাণ্ডার এবং তালিকাভুক্তকরণ প্রক্রিয়া
- ভিতর রত্নভাণ্ডার: এটি কোষাগারের অভ্যন্তরীণ কক্ষ, যা মন্দিরের অব্যবহৃত অলঙ্কার এবং প্রাচীন মূল্যবান সামগ্রী সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হয়।
- তত্ত্বাবধান: নথিবদ্ধকরণের কাজটি স্বর্ণকার, ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক এবং মন্দিরের পুরোহিতদের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।
- আধুনিক প্রযুক্তি: আইটেমগুলি নথিবদ্ধ করার জন্য প্রথমবারের মতো থ্রি–ডি ম্যাপিং, পদ্ধতিগত ওজন পরিমাপ এবং ক্যাটালগিং প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হচ্ছে।
- কালার–কোডিং সিস্টেম: সংরক্ষণের জন্য একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়—স্বর্ণালঙ্কারগুলি হলুদ মখমলে মোড়ানো হয় এবং রূপা ও মূল্যবান পাথরগুলি সাদা ও লাল কাপড়ে রাখা হয়।
৩. কলিঙ্গ মন্দির স্থাপত্য: মূল বৈশিষ্ট্য
- রেখা দেউল (প্রধান মন্দির): এটি একটি লম্বা, উল্লম্ব এবং অনেকটা ‘সুগার-লোফ’ আকৃতির ভবন যা গর্ভগৃহকে আবৃত করে রাখে; এটি দেখতে অনেকটা পর্বতশৃঙ্গের মতো। (উদাহরণ: লিঙ্গরাজ ও কোণার্ক সূর্য মন্দিরের প্রধান শিখর)।
- পিঢ়া দেউল (অ্যাসেম্বলি হল): এটি একটি আয়তাকার বা বর্গাকার হল যার ছাদ পিরামিড আকৃতির এবং অনুভূমিক ধাপে (পিঢ়া) তৈরি। এটি সাধারণত জগমোহন (দর্শক হল) হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
- খাকরা দেউল (শক্তি মন্দির): এটি একটি বিরল আয়তাকার কাঠামো যার ছাদটি পিপা-ভল্টেড বা ড্রাম আকৃতির (কুমড়ো বা লাউয়ের মতো দেখতে)। এটি সাধারণত শক্তি দেবীদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয় (যেমন: বৈতাল মন্দির)।
৪. জগন্নাথ মন্দিরের গুরুত্বপূর্ণ উৎসবসমূহ
| উৎসব | তাৎপর্য |
| রথযাত্রা | বার্ষিক রথ শোভাযাত্রা; তিনটি বিশাল রথে দেবতারা বাইরে আসেন— নন্দীঘোষ (জগন্নাথ), তালধ্বজ (বলভদ্র), দর্পদলন (সুভদ্রা)। |
| স্নানযাত্রা | জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমা তিথিতে দেবতাদের স্নান উৎসব। |
| নবকলেবর | কাষ্ঠনির্মিত মূর্তির (দারু ব্রহ্ম) শাস্ত্রীয় প্রতিস্থাপন—প্রতি ৮, ১২ বা ১৯ বছর অন্তর ঘটে। |
| চন্দনযাত্রা | নৌকা শোভাযাত্রা সংবলিত ৪২ দিনের দীর্ঘ উৎসব। |
| বাহুড়া যাত্রা | রথযাত্রা শেষে দেবতাদের মন্দিরে ফিরে আসার যাত্রা। |
৫. ইউনেস্কো এবং ঐতিহ্যগত মর্যাদা
- জগন্নাথ মন্দির পুরী হেরিটেজ করিডোর প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত।
- পুরীকে একটি ঐতিহ্যবাহী স্মার্ট সিটি (Heritage Smart City) হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।
- কোণার্কের সূর্য মন্দির (ওড়িশার পূর্ব গঙ্গা রাজবংশের নির্মিত) একটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট।
- ওড়িশার তিনটি প্রধান মন্দির— জগন্নাথ (পুরী), লিঙ্গরাজ (ভুবনেশ্বর) এবং কোণার্ক (সূর্য মন্দির) কলিঙ্গ স্থাপত্যের সর্বোচ্চ শিখরকে প্রতিনিধিত্ব করে।
Q. জগন্নাথ মন্দিরের ধর্মীয় তাৎপর্যের প্রেক্ষিতে, নিম্নলিখিত বিবৃতিগুলি বিবেচনা করুন:
1. এটি হিন্দুধর্মের 'চার ধাম' (Char Dham) তীর্থস্থানগুলির মধ্যে একটি।
2. এটি চৈতন্য মহাপ্রভুর মতো বেশ কয়েকজন ভক্তি আন্দোলনের সন্তদের সাথে যুক্ত।
উপরে দেওয়া বিবৃতিগুলির মধ্যে কোনটি/কোনগুলি সঠিক?
(a) 1 only
(b) 2 only
(c) Both 1 and 2
(d) Neither 1 nor 2
উত্তর: C
ব্যাখ্যা:
Statement 1 সঠিক: পুরীর শ্রী জগন্নাথ মন্দির হিন্দুধর্মের চারটি পবিত্রতম তীর্থস্থানের অন্যতম, যা 'চার ধাম' নামে পরিচিত। অন্য তিনটি স্থান হলো বদ্রীনাথ (উত্তর), দ্বারকা (পশ্চিম) এবং রামেশ্বরম (দক্ষিণ)। ভারতের বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলকে একটি অভিন্ন আধ্যাত্মিক পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য অষ্টম শতাব্দীর দার্শনিক ও সন্ত আদি শঙ্করচার্য ঐতিহ্যগতভাবে এই স্থানগুলিকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন।
Statement 2 সঠিক: ভক্তি আন্দোলনের সাথে এই মন্দিরের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এটি পঞ্চদশ শতাব্দীর সন্ত এবং গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রতিষ্ঠাতা চৈতন্য মহাপ্রভুর সাথে বিশেষভাবে যুক্ত, যিনি তাঁর জীবনের শেষ ১৮ বছর পুরীতে ভগবান জগন্নাথের উপাসনা করে কাটিয়েছিলেন। মন্দিরের সাথে যুক্ত অন্যান্য বিশিষ্ট ভক্তি আন্দোলনের ব্যক্তিত্বদের মধ্যে রয়েছেন রামানুজাচার্য এবং জয়দেব (গীতগোবিন্দের রচয়িতা)।