প্রেক্ষাপট
সম্প্রতি ভারতীয় টাকার মান ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে গেছে। 31 মার্চ প্রতি মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার 94.80 ছাড়িয়ে গেছে। এই দর পতনের প্রধান কারণ হলো ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি এবং পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার ফলে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি। এই অর্থবছরে টাকার মানের উল্লেখযোগ্য পতন লক্ষ্য করা গেছে, যা ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংককে (RBI) বাজারে হস্তক্ষেপ করতে এবং মুদ্রার অত্যধিক অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করতে বাধ্য করেছে।
1. টাকার অবমূল্যায়ন বা ‘ডেপ্রিসিয়েশন‘ কী?
টাকার অবমূল্যায়ন বা ডেপ্রিসিয়েশন বলতে কোনো বিদেশি মুদ্রার (সাধারণত মার্কিন ডলার) তুলনায় ভারতীয় টাকার মান কমে যাওয়াকে বোঝায়। এটি সাধারণত ফ্লোটিং এক্সচেঞ্জ রেট সিস্টেমে (যেখানে বাজারের ওপর বিনিময় হার নির্ভর করে) ঘটে থাকে।
- বাজার–চালিত: এটি মূলত বাজারের চাহিদা এবং জোগানের ওপর ভিত্তি করে ঘটে। যদি ভারতীয় বাজারে ডলারের চাহিদা ডলারের জোগানের চেয়ে বেশি হয়, তবে টাকার মান দুর্বল হয়ে পড়ে।
- অবমূল্যায়ন (Depreciation) বনাম মুদ্রাহ্রাস (Devaluation):
- Depreciation (ডেপ্রিসিয়েশন): এটি বাজার-নির্ধারিত ব্যবস্থায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটে।
- Devaluation (ডিভ্যালুয়েশন): এটি ফিক্সড এক্সচেঞ্জ রেট সিস্টেমে সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্বারা ইচ্ছাকৃতভাবে মুদ্রার মান কমিয়ে দেওয়া।
2. অবমূল্যায়নের প্রধান কারণসমূহ
বর্তমান এই পরিস্থিতির পেছনে দেশীয় এবং বৈশ্বিক উভয় কারণ দায়ী:
- অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি: ভারত তার প্রয়োজনীয় তেলের 80%-এর বেশি আমদানি করে। তেলের দাম বাড়লে সেই দাম মেটানোর জন্য ডলারের চাহিদা বাড়ে, যা টাকাকে দুর্বল করে দেয়।
- মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের নীতি: যখন আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক (US Fed) সুদের হার বাড়ায়, তখন বিনিয়োগকারীরা ভারতসহ উদীয়মান বাজারগুলো থেকে তাদের পুঁজি তুলে নেয় (বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ বা FPI প্রত্যাহার) এবং আমেরিকায় বেশি ও নিরাপদ রিটার্নের আশায় বিনিয়োগ করে।
- বাণিজ্য ঘাটতি: যখন রপ্তানির চেয়ে আমদানির পরিমাণ ক্রমাগত বেশি থাকে, তখন দেশ থেকে বিদেশি মুদ্রা বেশি বেরিয়ে যায়।
- নিরাপদ আশ্রয়ের চাহিদা: বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক সংকট চললে বিনিয়োগকারীরা “নিরাপদ” হিসেবে মার্কিন ডলারের দিকে ঝুঁকে পড়ে, যার ফলে অন্যান্য সব মুদ্রার তুলনায় ডলার শক্তিশালী হয় (DXY ইনডেক্স বৃদ্ধি)।
3. ভারতীয় অর্থনীতির ওপর প্রভাব
টাকার মান কমে যাওয়া একটি দুইধারী তলোয়ারের মতো:
| প্রভাবের ক্ষেত্র | অবমূল্যায়নের ফলাফল |
| আমদানি | আমদানি করা পণ্য আরও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। এর ফলে তেল, ইলেকট্রনিক্স এবং সারের দাম বেড়ে যায়, যাকে “আমদানিকৃত মুদ্রাস্ফীতি” (Imported Inflation) বলা হয়। |
| রপ্তানি | আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় পণ্য আরও প্রতিযোগিতামূলক (সস্তা) হয়ে ওঠে, যা মূলত IT, টেক্সটাইল এবং ফার্মা খাতের জন্য সুফল বয়ে আনে। |
| বৈদেশিক ঋণ | যেসব ভারতীয় কোম্পানির বৈদেশিক বাণিজ্যিক ঋণ (ECBs) আছে, তাদের জন্য ঋণ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ প্রতি ডলারের বিপরীতে তাদের এখন আগের চেয়ে বেশি টাকা দিতে হয়। |
| রেমিট্যান্স | প্রবাসী ভারতীয়রা (NRIs) দেশে টাকা পাঠালে তাদের বিদেশি আয় আগের চেয়ে বেশি টাকায় রূপান্তরিত হয়, যা তাদের পরিবারকে সহায়তা করে। |
| কারেন্ট অ্যাকাউন্ট | শুরুতে আমদানির খরচ বাড়ার কারণে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতি (CAD) আরও বাড়তে পারে। |
4. নিয়ন্ত্রণে RBI-এর ভূমিকা
ভারত একটি “ম্যানেজড ফ্লোট“ ব্যবস্থা অনুসরণ করে। RBI টাকার কোনও নির্দিষ্ট হার লক্ষ্য করে চলে না, তবে মুদ্রার মানে “অত্যধিক অস্থিরতা” রোধ করতে হস্তক্ষেপ করে।
- ফরেক্স হস্তক্ষেপ: RBI তার সঞ্চয় থেকে ডলার বিক্রি করে এবং বাজার থেকে টাকা কিনে নেয় যাতে টাকার অতিরিক্ত জোগান কমানো যায়।
- আর্থিক নীতি: সুদের হার বাড়ালে ভারতীয় বন্ড বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, যা দেশে বিদেশি মুদ্রার প্রবাহ বাড়াতে সাহায্য করে।
- সহজ নিয়মাবলী: অর্থনীতিতে আরও ডলার আনার জন্য ECB এবং অনিবাসী ভারতীয়দের (NRI) আমানত সংক্রান্ত নিয়মগুলো শিথিল করা।
Q. ভারতীয় অর্থনীতির প্রেক্ষিতে টাকার অবমূল্যায়ন সংক্রান্ত নিচের বিবৃতিগুলো বিবেচনা করুন:
1. টাকার ক্রমাগত অবমূল্যায়ন সাধারণত ভারতীয় কোম্পানিগুলোর জন্য বৈদেশিক বাণিজ্যিক ঋণের (ECB) বোঝা কমিয়ে দেয়।
2. যদি টাকার রিয়েল এফেক্টিভ এক্সচেঞ্জ রেট (REER) বৃদ্ধি পায়, তবে তা নির্দেশ করে যে ভারতের রপ্তানি আরও প্রতিযোগিতামূলক হচ্ছে।
3. টাকার দ্রুত অবমূল্যায়ন হলে রিজার্ভ ব্যাংক সাধারণত বাজার থেকে ডলার কিনে হস্তক্ষেপ করে।
4. মুদ্রার অবমূল্যায়ন 'আমদানিকৃত মুদ্রাস্ফীতি' ঘটাতে পারে, বিশেষ করে সেই দেশে যা প্রয়োজনীয় পণ্যের নিট আমদানিকারক।
ওপরের কতগুলো বিবৃতি সঠিক?
(a) মাত্র একটি
(b) মাত্র দুটি
(c) মাত্র তিনটি
(d) চারটিই
সঠিক উত্তর: (a) মাত্র একটি
ব্যাখ্যা:
• বিবৃতি 1 ভুল: অবমূল্যায়নের ফলে ঋণের বোঝা বাড়ে, কারণ একই পরিমাণ ডলার পরিশোধ করতে কোম্পানিগুলোকে এখন আরও বেশি টাকা দিতে হয়।
• বিবৃতি 2 ভুল: REER বেড়ে যাওয়ার অর্থ হলো মুদ্রাটি অন্যান্য বাণিজ্যিক অংশীদারদের তুলনায় অধিক মূল্যায়িত (overvalued) হয়ে গেছে, যা রপ্তানিকে কম প্রতিযোগিতামূলক করে তোলে।
• বিবৃতি 3 ভুল: টাকাকে শক্তিশালী করতে RBI ডলার বিক্রি করে (যাতে বাজারে ডলারের জোগান বাড়ে) এবং টাকা কেনে। ডলার কিনলে টাকার মান আরও কমে যাবে।
• বিবৃতি 4 সঠিক: এটি আমদানিকৃত মুদ্রাস্ফীতির সাধারণ সংজ্ঞা; টাকার মান কমলে অপরিশোধিত তেলের মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি খরচ বেড়ে যায়, যা দেশের অভ্যন্তরে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়।