জিন ড্রাইভ প্রযুক্তি এবং ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ

Gene Drive Technology & Malaria Control

প্রেক্ষাপট

সম্প্রতি, ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন এবং তানজানিয়ার ইফাকারা হেলথ ইনস্টিটিউটের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত “ট্রান্সমিশন জিরো” (Transmission Zero) প্রকল্পটি একটি বড় সাফল্য অর্জন করেছে । তারা প্রমাণ করেছে যে, জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত মশা বাস্তব পরিবেশেও ম্যালেরিয়া পরজীবীর সংক্রমণ রুখে দিতে সক্ষম । এটি গবেষণাগারের সাফল্যকে ছাড়িয়ে বাস্তবে CRISPR-Cas9 জিন ড্রাইভ ব্যবহার করে জনসংখ্যা পরিবর্তনের (Population Modification) প্রয়োগের পথ প্রশস্ত করেছে ।

১. জিন ড্রাইভ প্রযুক্তি কী?

  • সংজ্ঞা: এটি এমন এক জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রযুক্তি যা প্রথাগত মেন্ডেলীয় উত্তরাধিকার (Mendelian inheritance) সূত্রকে উপেক্ষা করে কোনো নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য পরবর্তী প্রজন্মের প্রায় ১০০% বংশধরের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া নিশ্চিত করে (সাধারণত যা থাকে ৫০%) ।
  • কার্যপদ্ধতি: এটি CRISPR-Cas9 সিস্টেম ব্যবহার করে বংশবিস্তারের সময় সঙ্গী ক্রোমোজোমে একটি পরিবর্তিত জিনকে “কপি এবং পেস্ট” করে দেয় ।
  • লক্ষ্য: কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যকে পুরো বন্য প্রজাতির মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া ।

২. তানজানিয়া গবেষণার মূল দিকগুলো

  • আফ্রিকার জন্য প্রথম: এটি প্রমাণ করেছে যে পরিবর্তিত মশা কেবল ল্যাবরেটরিতে নয়, বরং বাস্তব জগতের সংক্রমণ থেকেও ম্যালেরিয়া পরজীবীকে দমন করতে পারে ।
  • স্থানীয় প্রকৌশল: তানজানিয়ার বাগামোয়োতে একটি উচ্চ-সুরক্ষিত গবেষণাগারে স্থানীয় অ্যানোফিলিস গাম্বিয়া (Anopheles gambiae) মশা ব্যবহার করে এই গবেষণা চালানো হয় ।
  • ইফেক্টর মলিকিউল (Effector Molecules): পরিবর্তিত মশাগুলো রক্ত খাওয়ার পর তাদের অন্ত্রে দুটি অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল পেপটাইড তৈরি করে, যা প্লাজমোডিয়াম (Plasmodium) পরজীবীকে মশার লালা গ্রন্থিতে পৌঁছাতে বাধা দেয় ।
  • সুরক্ষা ব্যবস্থা: বিজ্ঞানীরা “সেলফ-লিমিটিং” (Self-limiting) ড্রাইভ এবং “অফ-সুইচ” (Off-switches) নিয়ে কাজ করছেন যাতে প্রয়োজনে এই জিনের বিস্তার থামানো বা উল্টে দেওয়া যায় ।

৩. CRISPR-Cas9 ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের প্রধান কৌশলসমূহ

  • জনসংখ্যা দমন (Population Suppression): CRISPR-Cas9 ব্যবহার করে স্ত্রী মশার প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় জিন (যেমন- AGAP005958) নষ্ট করে দেওয়া হয় । এর ফলে মশার সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে যায় এবং সংক্রমণ হ্রাস পায় ।
  • জনসংখ্যা পরিবর্তন বা প্রতিস্থাপন (Population Modification/Replacement): এখানে মশাকে এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে তারা ম্যালেরিয়া পরজীবী বহনে অক্ষম হয় (যেমন- FREP1 জিন নকআউট করা), ফলে তারা আর রোগ ছড়াতে পারে না ।
  • প্রিসিশন-গাইডেড স্টেরাইল ইনসেক্ট টেকনিক (pgSIT): এটি একটি বিশেষ CRISPR পদ্ধতি যেখানে পরিবেশে বন্ধ্যা পুরুষ মশা ছাড়া হয় । এটি জিন ড্রাইভের মতো স্ব-স্থায়ী নয়, তবে জনসংখ্যা কমাতে কার্যকর ।

৪. তুলনামূলক বিশ্লেষণ: ম্যালেরিয়া বনাম ডেঙ্গু

বৈশিষ্ট্যম্যালেরিয়া (Malaria)ডেঙ্গু (Dengue)
রোগ সৃষ্টিকারী উপাদানপ্রোটোজোয়া (প্লাজমোডিয়াম প্রজাতি)ভাইরাস (ফ্ল্যাভিভাইরাস – DENV 1, 2, 3, 4)
প্রধান বাহকস্ত্রী অ্যানোফিলিস মশাএডিশ ইজিপ্টি (এবং এডিশ অ্যালবোপিকটাস)
কামড়ানোর সময়মূলত রাতে (সন্ধ্যা থেকে ভোর)মূলত দিনে (ভোরবেলা এবং শেষ বিকেল)
প্রজনন স্থানপরিষ্কার স্থির জল (ডোবা, পুকুর)কৃত্রিম পাত্রে জমা জল (কুলার, টায়ার, টব)
সুপ্তিকালদীর্ঘ (সাধারণত ১০-১৫ দিন)স্বল্প (সাধারণত ৩-১৪ দিন)
প্রধান উপসর্গকাঁপুনি দিয়ে তীব্র জ্বর, নির্দিষ্ট সময় অন্তর জ্বর আসা।তীব্র জ্বর, হাড় ভাঙার মতো ব্যথা, চোখের পিছনে ব্যথা, র‍্যাশ।
প্রধান জটিলতাসেলেব্রাল ম্যালেরিয়া, মারাত্মক রক্তাল্পতা।ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার (DHF), প্লাটিলেট কমে যাওয়া।
নির্ণয় পদ্ধতিব্লাড স্মিয়ার (অণুবীক্ষণ যন্ত্র) বা RDT।NS1 অ্যান্টিজেন টেস্ট, IgM/IgG অ্যান্টিবডি টেস্ট।
ভ্যাকসিন বা টিকাRTS,S এবং R21/Matrix-Mডেঙ্গভ্যাক্সিয়া (সীমিত ব্যবহার), কিউডেঙ্গা (Qdenga)।

৫. কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

  • ম্যালেরিয়া সচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছর ২৫শে এপ্রিল ‘বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস’ পালিত হয় ।
  • ম্যালেরিয়া একটি প্রাণঘাতী রোগ যা সংক্রামিত স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশার কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায় ।
  • WHO-এর E-2025 উদ্যোগ: ২০২৫ সালের মধ্যে ২৫টি চিহ্নিত দেশ থেকে ম্যালেরিয়া নির্মূল করার লক্ষ্য নিয়ে ২০২১ সালে এটি শুরু হয় ।
  • ২০২১ সালের অক্টোবরে, WHO শিশুদের জন্য RTS,S/AS01 (Mosquirix) ভ্যাকসিনের ব্যাপক ব্যবহারের সুপারিশ করেছে ।
প্রশ্ন: নিচের কোন বক্তব্যটি ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের প্রেক্ষাপটে 'প্রিসিশন-গাইডেড স্টেরাইল ইনসেক্ট টেকনিক' (pgSIT)-এর ধারণাকে সবচেয়ে ভালোভাবে প্রতিফলিত করে?
(ক) মানুষের শরীরে ম্যালেরিয়া পরজীবীকে সরাসরি মারার জন্য জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত মশা ছাড়া হয়।
(খ) বন্য পরিবেশে বন্ধ্যা পুরুষ মশা ছাড়া হয় যাতে তারা স্ত্রী মশার সাথে মিলিত হয় এবং এর ফলে কোনো বংশধর জীবিত না থাকে।
(গ) জেনেটিক পরিবর্তনের মাধ্যমে মশাকে মানুষের আবাসস্থল থেকে স্থায়ীভাবে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়।
(ঘ) স্ত্রী মশাকে এমনভাবে জেনেটিক্যালি পরিবর্তন করা হয় যাতে তাদের লালায় ম্যালেরিয়া প্রতিষেধক টিকা তৈরি হয়।
উত্তর: (খ)
ব্যাখ্যা: pgSIT প্রযুক্তি CRISPR-ভিত্তিক জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যবহার করে বন্ধ্যা পুরুষ মশা তৈরি করে ।
এই পুরুষ মশাগুলো বন্য স্ত্রী মশার সাথে প্রজনন করে, কিন্তু কোনো বংশধর বেঁচে থাকে না, যার ফলে সময়ের সাথে সাথে মশার সংখ্যা কমে যায় ।
জিন ড্রাইভ সিস্টেমের মতো এটি স্ব-স্থায়ী (self-sustaining) নয় ।