প্রেক্ষাপট
সম্প্রতি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) মধ্য আফ্রিকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ইবোলা প্রাদুর্ভাবকে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি ‘আন্তর্জাতিক উদ্বেগের পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি‘ (PHEIC) হিসেবে ঘোষণা করেছে। প্রধান প্রধান সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত এই জরুরি বৈশ্বিক ঘোষণার কারণ হলো, বিরল বুন্দিবুগিও ইবোলাভাইরাস স্ট্রেনের কারণে আক্রান্তের সংখ্যা তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যেহেতু এই বিশেষ স্ট্রেনটিতে মৃত্যুর হার অত্যন্ত বেশি (প্রায় ৫০% পর্যন্ত) এবং এটি বর্তমানে বাজারে থাকা ইবোলার সাধারণ ভ্যাকসিনগুলোকে পুরোপুরি ফাঁকি দিতে পারে, তাই ভারত সরকার তার নাগরিকদের আক্রান্ত অঞ্চলে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার জন্য একটি কঠোর নির্দেশিকা বা অ্যাডভাইজারি জারি করেছে।
১. ইবোলা এবং বর্তমান স্ট্রেনটি কী?
- ইবোলা ভাইরাস রোগ (EVD) হলো মানুষের একটি বিরল কিন্তু মারাত্মক এবং প্রায়শই প্রাণঘাতী অসুস্থতা, যা ‘অর্থোবোলাভাইরাস’ গণের একদল ভাইরাসের কারণে ঘটে থাকে।
- এই ভাইরাসের ছয়টি পরিচিত প্রজাতি বা স্ট্রেন রয়েছে, যার মধ্যে কেবল তিনটি—জাইরে (Zaire), সুদান (Sudan), এবং বুন্দিবুগিও (Bundibugyo)—সাধারণত মানুষের মধ্যে বড় এবং মারাত্মক প্রাদুর্ভাব ঘটায়।
- বর্তমান সক্রিয় প্রাদুর্ভাবটি ঘটছে বুন্দিবুগিও স্ট্রেন-এর কারণে। ঐতিহাসিকভাবে এই ভ্যারিয়েন্ট বা রূপটি আগে কম দেখা গেলেও, বর্তমানে এটি খুব দ্রুত ছড়াচ্ছে।
২. এটি কীভাবে ছড়ায়?
- পশু থেকে মানুষে: এই ভাইরাসটি প্রাকৃতিকভাবে বুনো বাদুড় (ফ্রুট ব্যাট)-এর শরীরে বাস করে। যখন কোনো মানুষ রেইনফরেস্টে অসুস্থ বা মৃত অবস্থায় পাওয়া সংক্রমিত বন্য প্রাণী (যেমন বাদুড়, বানর বা শিম্পাঞ্জি) হাত দিয়ে ধরে বা সেগুলোর মাংস খায়, তখন ভাইরাসটি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।
- মানুষ থেকে মানুষে: এই ভাইরাসটি কেবলমাত্র এমন কোনো ব্যক্তির রক্ত, বমি, মল বা ঘামের মতো শরীরের তরল পদার্থের সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়, যিনি ইতিমধ্যে এই রোগের লক্ষণ দেখাচ্ছেন বা যিনি এই রোগে মারা গেছেন।
- ইনকিউবেশন পিরিয়ড বা সুপ্তাবস্থার নিয়ম: একজন সংক্রমিত ব্যক্তি ভাইরাসের সুপ্তাবস্থায় (যা ২ থেকে ২১ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়) অন্যদের মধ্যে ভাইরাসটি ছড়াতে পারেন না; লক্ষণগুলো প্রকাশ পাওয়ার পরেই কেবল তারা সংক্রামক হয়ে ওঠেন।
৩. উপসর্গ এবং রোগ নির্ণয়ের চ্যালেঞ্জ
- এই রোগটি হুট করে অনেকটা ফ্লু বা সাধারণ জ্বরের মতো উপসর্গ নিয়ে শুরু হয়, যার মধ্যে রয়েছে আকস্মিক জ্বর, তীব্র দুর্বলতা, পেশী ব্যথা, মাথাব্যথা এবং গলা ব্যথা।
- অসুস্থতা বাড়ার সাথে সাথে রোগীরা বমি, ডায়রিয়া, কিডনি ও লিভারের কার্যক্ষমতা হারানো এবং শরীরের ভেতরে ও বাইরে তীব্র রক্তক্ষরণে (হেমোরেজ) ভোগেন।
- প্রাথমিক অবস্থায় এই রোগ নির্ণয় করা বেশ কঠিন, কারণ এর শুরুর দিকের লক্ষণগুলো ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড এবং ডেঙ্গুর মতো অন্যান্য সাধারণ ক্রান্তীয় বা ট্রপিক্যাল রোগের মতোই দেখায়।
৪. ভ্যাকসিনের সমস্যা: কোনো ক্রস-প্রোটেকশন বা পারস্পরিক সুরক্ষা নেই
- যদিও অতীতের প্রাদুর্ভাবের সময় বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত কার্যকর ভ্যাকসিন (যেমন Ervebo) তৈরি করতে সফল হয়েছিলেন, তবে সেই চিকিৎসাগুলো ছিল একচেটিয়াভাবে শুধুমাত্র জাইরে স্ট্রেন-কে লক্ষ্য করে তৈরি।
- চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য থেকে জানা যায় যে, বর্তমানে বাজারে থাকা এই ভ্যাকসিনগুলো বর্তমান সংকটের কারণ বুন্দিবুগিও স্ট্রেন-এর বিরুদ্ধে কোনো ‘ক্রস-প্রোটেকশন’ বা সুরক্ষা দিতে পারে না।
- এই বিশেষ ভ্যারিয়েন্টের জন্য অনুমোদিত কোনো ভ্যাকসিন বা নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ সম্পূর্ণভাবে না থাকার কারণে, চিকিৎসা ব্যবস্থাটি কেবল রোগীর শরীরে জলশূন্যতা রোধ করা এবং তীব্র লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণ করার মতো সহায়ক চিকিৎসার (সাপোর্টিভ থেরাপি) মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
৫. ভারতের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা
- ভারতে এখনও পর্যন্ত বুন্দিবুগিও ইবোলা স্ট্রেনের কোনো আক্রান্তের খবর পাওয়া যায়নি।
- ভাইরাসটি যাতে ভুলবশত দেশে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রক সমস্ত বড় বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কঠোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা স্ক্রিনিং ব্যবস্থা জোরদার করেছে। বিশেষ করে মধ্য আফ্রিকার ট্রানজিট রুট থেকে ফিরে আসা যাত্রীদের ওপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে।
Q. ইবোলা ভাইরাস রোগ (EVD)-এর প্রসঙ্গে নিচের বিবৃতিগুলো বিবেচনা করুন:
1. এই ভাইরাসে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি কোনো উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগে, অর্থাৎ ইনকিউবেশন পিরিয়ড বা সুপ্তাবস্থার সময়েও সহজেই অন্যদের মধ্যে এটি সংক্রমণ করতে পারেন।
2. ইবোলার জন্য বর্তমানে অনুমোদিত ভ্যাকসিনগুলো নির্দিষ্ট স্ট্রেন-ভিত্তিক এবং এগুলো বর্তমান সক্রিয় বুন্দিবুগিও ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে কোনো সুরক্ষা প্রদান করে না।
3. বুনো বাদুড় (ফ্রুট ব্যাট)-কে এই ভাইরাসের প্রাকৃতিক আধার বা 'ন্যাচারাল রিজার্ভার হোস্ট' হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা বন্য পরিবেশে এই ভাইরাসটিকে বহন ও টিকিয়ে রাখে।
ওপরের দেওয়া বিবৃতিগুলোর মধ্যে কোনগুলো সঠিক?
(a) কেবল একটি বিবৃতি
(b) কেবল দুটি বিবৃতি
(c) তিনটি বিবৃতিই সঠিক
(d) কোনো বিবৃতিই সঠিক নয়
সমাধান
সঠিক উত্তর: (b) কেবল দুটি বিবৃতি
• 1 নম্বর বিবৃতিটি ভুল: ইবোলায় আক্রান্ত ব্যক্তি ভাইরাসের সুপ্তাবস্থায় (২ থেকে ২১ দিন) সংক্রামক থাকেন না এবং ভাইরাস ছড়াতে পারেন না। আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে সক্রিয় এবং দৃশ্যমান লক্ষণ দেখা দেওয়ার পরেই কেবল সংক্রমণ হওয়া সম্ভব।
• 2 নম্বর বিবৃতিটি সঠিক: এরভেবো (Ervebo)-র মতো বিদ্যমান ভ্যাকসিনগুলো বিশেষভাবে ভাইরাসের জাইরে স্ট্রেনের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এগুলো নির্দিষ্ট স্ট্রেনের জন্যই কাজ করে এবং বর্তমান জরুরি অবস্থার কারণ বুন্দিবুগিও স্ট্রেনের বিরুদ্ধে কোনো সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়।
• 3 নম্বর বিবৃতিটি সঠিক: টেরোপোডিডি (Pteropodidae) পরিবারের বুনো বাদুড় বৈজ্ঞানিকভাবে ইবোলা ভাইরাসের প্রাকৃতিক আধার বা উৎস হিসেবে প্রমাণিত, যা নিজে অসুস্থ না হয়েও ভাইরাসটিকে শরীরে বহন করে।