প্রেক্ষাপট
- সম্প্রতি, ১৬ জুলাই ২০২৬ থেকে পুরীতে শুরু হওয়া রথযাত্রা উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু ভগবান জগন্নাথের প্রতি তাঁর আজীবনের ভক্তির কথা প্রকাশ করেন এবং এই উৎসবকে পুরীর সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ উৎসব হিসেবে বর্ণনা করেন।
- এই উপলক্ষে জগন্নাথ সংস্কৃতি এবং ওডিশার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আবারও জাতীয় স্তরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
১. দেবত্রয় ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
- দেবত্রয় (Triad): এই উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ভগবান জগন্নাথ (ভগবান বিষ্ণু/শ্রীকৃষ্ণের এক রূপ), তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বলভদ্র, কনিষ্ঠা ভগিনী সুভদ্রা, এবং সুদর্শন চক্র।
- মূর্তির উপাদান ও নবায়ন (Material & Renewal): অধিকাংশ হিন্দু মন্দিরের পাথর বা ধাতুর মূর্তির পরিবর্তে, জগন্নাথ মন্দিরের বিগ্রহগুলি পবিত্র নিমকাঠ (দারু ব্রহ্ম) দিয়ে নির্মিত হয়। প্রতি ১২ থেকে ১৯ বছর অন্তর নবকলেবর (Nabakalebara) নামে এক বিশেষ আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই বিগ্রহগুলি প্রতিস্থাপিত হয়।
- অনসর পর্ব (Anasara Period): বার্ষিক স্নানযাত্রা (Snana Yatra)-র পর দেবতারা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে বিশ্বাস করা হয়। ফলে ১৫ দিন তাঁদের জনসাধারণের দর্শনের বাইরে রাখা হয়। এই সময়ে তাঁদের পরিবর্তে অনসর পট্টি (Anasara Pattis) নামে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী ওড়িয়া কাপড়ের চিত্রে পূজা করা হয়।
২. রথসমূহ
- প্রতি বছর অক্ষয় তৃতীয়া থেকে তিনটি বিশাল কাঠের রথ নির্মাণের কাজ শুরু হয়।
- এই রথগুলি প্রতি বছর নতুন করে নির্মিত হয়।
- রথ নির্মাণে কোনও ধাতব পেরেক ব্যবহার করা হয় না; পরিবর্তে প্রাচীন কাঠ-সংযোজন (joinery) কৌশল অনুসরণ করা হয়।
| দেবতা | রথের নাম | রথের ছাউনি (রং) | চাকার সংখ্যা |
| ভগবান জগন্নাথ | নন্দিঘোষ (বা গরুড়ধ্বজ) | লাল ও হলুদ | ১৬টি |
| ভগবান বলভদ্র | তালধ্বজ | লাল ও সবুজ | ১৪টি |
| দেবী সুভদ্রা | দর্পদলন (বা দেবদলন) | লাল ও কালো | ১২টি |
৩. প্রধান আচার-অনুষ্ঠান
- ছেরা পাহানরা (Chhera Pahanra): রথযাত্রা শুরুর আগে পুরীর গজপতি মহারাজ একটি সোনার ঝাড়ু দিয়ে তিনটি রথ পরিষ্কার করেন। এই আচারটি বোঝায় যে, ঈশ্বরের সামনে সবাই সমান এবং রাজাও তাঁর বিনয়ী সেবক।
- গুণ্ডিচা যাত্রা ও বাহুড়া যাত্রা: রথযাত্রায় দেবতারা বড়দণ্ড (গ্র্যান্ড অ্যাভিনিউ) পথে গুণ্ডিচা মন্দিরে (যাকে দেবতাদের মাসির বাড়ি বলা হয়) যান। সেখানে নয় দিন অবস্থান করার পর তাঁরা বাহুড়া যাত্রা-র মাধ্যমে আবার শ্রীমন্দিরে ফিরে আসেন।
শ্রী জগন্নাথ মন্দির
- ঐতিহাসিক পটভূমি: ১২শ শতকে পূর্ব গঙ্গ রাজবংশের রাজা অনন্তবর্মণ চোড়গঙ্গ দেব এই মন্দির নির্মাণ শুরু করেন। পরে অনঙ্গভীম দেব তৃতীয় এর নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ করেন।
- স্থাপত্যশৈলী: এটি কলিঙ্গ স্থাপত্যশৈলীর একটি উৎকৃষ্ট নিদর্শন, যা উত্তর ভারতের নাগর শৈলীর একটি উপশাখা।
- মন্দিরের গঠন: মন্দিরটি পঞ্চরথ পরিকল্পনা অনুসারে একটি উঁচু বেদির ওপর নির্মিত। এতে চারটি প্রধান অংশ রয়েছে—
- বিমান (দেউল): এখানে মূল দেবদেবীর বিগ্রহ স্থাপিত।
- জগমোহন: ভক্তদের সমবেত হওয়ার স্থান।
- নাটমন্দির: নৃত্য ও ধর্মীয় উৎসবের জন্য ব্যবহৃত হয়।
- ভোগমণ্ডপ: দেবতার উদ্দেশ্যে ভোগ নিবেদনের স্থান।
·গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- অতীতে সমুদ্রপথে চলাচলকারী নাবিকরা এই মন্দিরকে “হোয়াইট প্যাগোডা (White Pagoda)” নামে চিনতেন। (অন্যদিকে কোনার্ক সূর্য মন্দির ছিল “ব্ল্যাক প্যাগোডা (Black Pagoda)” নামে পরিচিত।)
- এটি ভারতের চারধাম তীর্থ-এর অন্যতম। অন্য তিনটি হল বদ্রীনাথ, দ্বারকা ও রামেশ্বরম।
মন্দিরের চূড়ায় নীলচক্র (আটটি কাঁটাযুক্ত ধাতব চক্র) স্থাপিত রয়েছে এবং মন্দিরকে ঘিরে থাকা বাইরের সুরক্ষাপ্রাচীরের নাম মেঘনাদ পাচেরি।
পুরীর রথযাত্রা এবং জগন্নাথ মন্দিরের স্থাপত্য সম্পর্কে নিম্নলিখিত বক্তব্যগুলি বিবেচনা করুন:
I. প্রচলিত হিন্দু মন্দিরগুলির থেকে ভিন্নভাবে, জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার বিগ্রহ পবিত্র কাঠ দিয়ে তৈরি এবং নবকলেবর নামে পরিচিত একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় অন্তর নতুন বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা হয়।
II. ছেরা পাহানরা আচার-অনুষ্ঠানে গজপতি রাজা রথ পরিষ্কার করেন, যা ঈশ্বরের সামনে সকল মানুষের সমতার প্রতীক।
III. শ্রী জগন্নাথ মন্দির নাগর স্থাপত্যশৈলীর কলিঙ্গ উপশৈলীর একটি উৎকৃষ্ট নিদর্শন এবং এটি পূর্ব গঙ্গ রাজবংশের শাসকদের দ্বারা নির্মিত।
উপরের কোন বক্তব্যটি/গুলি সঠিক?
A) শুধুমাত্র I ও II
B) শুধুমাত্র II ও III
C) শুধুমাত্র I ও III
D) I, II ও III
সঠিক উত্তর: D) I, II ও III
ব্যাখ্যা
• বক্তব্য I সঠিক: জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার বিগ্রহ পবিত্র নিমকাঠ (দারু ব্রহ্ম) দিয়ে তৈরি। নির্দিষ্ট সময় অন্তর নবকলেবর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা অধিকাংশ পাথর বা ধাতুর মূর্তির থেকে ভিন্ন।
• বক্তব্য II সঠিক: ছেরা পাহানরা অনুষ্ঠানে পুরীর গজপতি রাজা সোনার ঝাড়ু দিয়ে রথ পরিষ্কার করেন। এই আচারটি বোঝায় যে ঈশ্বরের সামনে সবাই সমান, রাজাও তাঁর একজন সেবক মাত্র।
• বক্তব্য III সঠিক: শ্রী জগন্নাথ মন্দির নাগর স্থাপত্যশৈলীর কলিঙ্গ উপশৈলীর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এটি ১২শ শতকে পূর্ব গঙ্গ রাজবংশের রাজা অনন্তবর্মণ চোড়গঙ্গ দেব নির্মাণ শুরু করেন।